পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মানবপুত্র কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আধুনিক গদ্যরীতির পথপ্রদর্শক কাব্যগ্রন্থ ‘পুনশ্চ’-এর অন্যতম তীব্র মানবতাবাদী, বিবেকনাড়া দেওয়া ও যুদ্ধবিরোধী কবিতা হলো ‘মানবপুত্র’। যিশুখ্রিস্টের আত্মত্যাগের শত শত বছর পরেও ধর্ম ও বিজ্ঞানের অপব্যবহারে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধোন্মাদনা এবং খ্রিস্টের নামেই নরহত্যার যে নারকীয় ভণ্ডামি আধুনিক বিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—এ কবিতায় যিশুর ক্রুশবিদ্ধ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তির রূপকে তা তীব্র যন্ত্রণায় ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামমানবপুত্র
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও যুদ্ধবিরোধী মানবিক লিরিক (Anti-war / Humanist Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতায় মুক্ত গদ্যরীতির এক বৈপ্লবিক দিগন্ত উন্মোচন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপে সভ্যতার স্বঘোষিত ধ্বজাধারীদের রক্তলোলুপতা ও ধর্মকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রিস্ট তাঁর আত্মদানের মাধ্যমে মানবজাতিকে পাপ ও হিংসা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে কবি দেখলেন, বিজ্ঞানের গবেষণাগার ও কলকারখানায় তৈরি হচ্ছে আরও ভয়াবহ মারণাস্ত্র, আর ধর্মের পুরোহিতরা সেই অস্ত্রের গায়ে খ্রিস্টেরই পবিত্র নামাঙ্কিত ছাপ লাগিয়ে সৈন্যদের মানুষ হত্যা করতে প্ররোচিত করছে। ধর্মের এই চরম অবক্ষয়ে ক্রুশের ওপর উচ্চারিত খ্রিস্টের অন্তিম আর্তি—”Eli, Eli, lama sabachthani” (ঈশ্বর, কেন আমাকে ত্যাগ করলে)—পুনরায় ধ্বনিত হয়।

সম্পূর্ণ কবিতা:

মৃত্যুর পাত্রে খৃস্ট যেদিন মূত্যুহীন প্রাণ উৎসর্গ করলেন

               রবাহূত অনাহূতের জন্যে,

                   তার পরে কেটে গেছে বহু শত বৎসর।

আজ তিনি একবার নেমে এলেন নিত্যধাম থেকে মর্তধামে।

                   চেয়ে দেখলেন,

সেকালেও মানুষ ক্ষতবিক্ষত হত যে-সমস্ত পাপের মারে–

        যে উদ্ধত শেল ও শল্য, যে চতুর ছোরা ও ছুরি,

যে ক্রূর কুটিল তলোয়ারের আঘাতে–

           বিদ্যুদ্‌বেগে আজ তাদের ফলায় শান দেওয়া হচ্ছে

        হিস্‌হিস্‌ শব্দে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে

               বড়ো বড়ো মসীধূমকেতন কারখানাঘরে।

কিন্তু দারুণতম যে মৃত্যুবাণ নূতন তৈরি হল,

        ঝক্‌ঝক্‌ করে উঠল নরঘাতকের হাতে,

           পূজারি তাতে লাগিয়েছে তাঁরই নামের ছাপ

               তীক্ষ্ণ নখে আঁচড় দিয়ে।

           খৃস্ট বুকে হাত চেপে ধরলেন;

বুঝলেন শেষ হয় নি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মুহূর্ত,

        নূতন শূল তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞানশালায়–

           বিঁধছে তাঁর গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে।

সেদিন তাঁকে মেরেছিল যারা

           ধর্মমন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে,

    তারাই আজ নূতন জন্ম নিল দলে দলে,

        তারাই আজ ধর্মমন্দিরের বেদীর সামনে থেকে

           পূজামন্ত্রের সুরে ডাকছে ঘাতক সৈন্যকে–

               বলছে “মারো মারো’।

        মানবপুত্র যন্ত্রণায় বলে উঠলেন ঊর্ধ্বে চেয়ে,

           “হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর,

                   কেন আমাকে ত্যাগ করলে।’

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Mrittyur patre Khrishto jedin mrittyuhin pran utshorgo korlen
Robahuto onahuter jonnye,
Tar pore kete gechhe bohu shoto botshor.
Aj tini ekbar neme elen nittyodham theke mortyodhame.
Cheye dekhlen,
Shekalo manush khotobikkhoto hoto je-shomosto paper mare–
Je uddhoto shel o shollo, je chotur chhora o chhuri,
Je krur kutil tolowarer aghate–
Biddudbege aj tader pholay shan dewa hochchhe
Hish-hish shobde sphulinggo chhoriye
Boro boro moshidhumketon karkhanaghore.
Kintu daruntomo je mrittyuban nuton toiri holo,
Jhok-jhok kore uthlo noroghatoker hate,
Pujari tate lagiyechhe tari namer chhap
Tikkhno nokhe anchhor diye.
Khrishto buke hat chepe dhorlen;
Bujhlen shesh hoy ni tar nirobchhinno mrittyur muhurto,
Nuton shul toiri hochchhe bigganshalay–
Bindhchhe tar gronthite gronthite.
Shedin take merechhilo jara
Dhormomondirer chhayay dariye,
Tarai aj nuton jonmo nilo dole dole,
Tarai aj dhormomondirer bedir shamne theke
Pujamontrer shure dakchhe ghatok shoilloke–
Bolchhe “Maro maro’.
Manobputro jontronay bole uthlen urdhwe cheye,
“He Ishwor, he manusher Ishwor,
Keno amake tyag korle.’

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • যন্ত্রসভ্যতা ও আধুনিক হিংস্রতা:
    “সেকালেও মানুষ ক্ষতবিক্ষত হত যে-সমস্ত পাপের মারে– / … বিদ্যুদ্‌বেগে আজ তাদের ফলায় শান দেওয়া হচ্ছে / হিস্‌হিস্‌ শব্দে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে / বড়ো বড়ো মসীধূমকেতন কারখানাঘরে।”
    — প্রাচীন কালের হিংস্রতা আধুনিক যুগে শেষ তো হয়ইনি, বরং বিজ্ঞানের শক্তিতে তা আরও যান্ত্রিক, ধ্বংসাত্মক ও গণবিধ্বংসী রূপ নিয়েছে। কলকারখানার কালো ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের লোভ ও হিংসা নতুন অস্ত্রশস্ত্রে শান দিচ্ছে।
  • ধর্মের ভণ্ডামি ও দ্বিতীয় ক্রুশারোহণ:
    “দারুণতম যে মৃত্যুবাণ নূতন তৈরি হল, / … পূজারি তাতে লাগিয়েছে তাঁরই নামের ছাপ / তীক্ষ্ণ নখে আঁচড় দিয়ে। / খৃস্ট বুকে হাত চেপে ধরলেন; / বুঝলেন শেষ হয় নি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মুহূর্ত,”
    — সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো—প্রেম ও ক্ষমার প্রতীক যিশুখ্রিস্টের নামেই নরঘাতক অস্ত্রকে পবিত্র বলে চালানো হচ্ছে। যাজকশ্রেণি যুদ্ধ ও রক্তপাতকে ধর্মীয় বৈধতা দিচ্ছে। ফলে যিশুর মৃত্যু কোনো অতীত ইতিহাস নয়; আধুনিক বিজ্ঞানাগারে তৈরি প্রতিটি অস্ত্রের আঘাতে তিনি আজও প্রতিনিয়ত ক্রুশবিদ্ধ হচ্ছেন।
  • ধর্মনেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি ও অন্তিম হাহাকার:
    “সেদিন তাঁকে মেরেছিল যারা / ধর্মমন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে, / তারাই আজ নূতন জন্ম নিল দলে দলে, / … মানবপুত্র যন্ত্রণায় বলে উঠলেন ঊর্ধ্বে চেয়ে, / ‘হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর, / কেন আমাকে ত্যাগ করলে।'”
    — প্রাচীন জেরুজালেমের মন্দিরের গোঁড়া পুরোহিতরা যেভাবে হিংসা ও পরশ্রীকাতরতায় যিশুকে হত্যা করেছিল, আজকের ধর্মনেতারাও একই ভূমিকা নিয়ে সৈন্যদের “মারো মারো” বলে মানুষ নিধনে পাঠাচ্ছে। মানুষের এই আত্মঘাতী পতন দেখে ব্যথিত ‘মানবপুত্র’ পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে আত্মিক নিঃসঙ্গতা ও হতাশার চরম হাহাকার প্রকাশ করেছেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (বানান সংশোধন: ‘মৃত্যুর পাত্রে’ ও ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ অনুসৃত), বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন