Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | মানবপুত্র |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও যুদ্ধবিরোধী মানবিক লিরিক (Anti-war / Humanist Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
মৃত্যুর পাত্রে খৃস্ট যেদিন মূত্যুহীন প্রাণ উৎসর্গ করলেন
রবাহূত অনাহূতের জন্যে,
তার পরে কেটে গেছে বহু শত বৎসর।
আজ তিনি একবার নেমে এলেন নিত্যধাম থেকে মর্তধামে।
চেয়ে দেখলেন,
সেকালেও মানুষ ক্ষতবিক্ষত হত যে-সমস্ত পাপের মারে–
যে উদ্ধত শেল ও শল্য, যে চতুর ছোরা ও ছুরি,
যে ক্রূর কুটিল তলোয়ারের আঘাতে–
বিদ্যুদ্বেগে আজ তাদের ফলায় শান দেওয়া হচ্ছে
হিস্হিস্ শব্দে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে
বড়ো বড়ো মসীধূমকেতন কারখানাঘরে।
কিন্তু দারুণতম যে মৃত্যুবাণ নূতন তৈরি হল,
ঝক্ঝক্ করে উঠল নরঘাতকের হাতে,
পূজারি তাতে লাগিয়েছে তাঁরই নামের ছাপ
তীক্ষ্ণ নখে আঁচড় দিয়ে।
খৃস্ট বুকে হাত চেপে ধরলেন;
বুঝলেন শেষ হয় নি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মুহূর্ত,
নূতন শূল তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞানশালায়–
বিঁধছে তাঁর গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে।
সেদিন তাঁকে মেরেছিল যারা
ধর্মমন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে,
তারাই আজ নূতন জন্ম নিল দলে দলে,
তারাই আজ ধর্মমন্দিরের বেদীর সামনে থেকে
পূজামন্ত্রের সুরে ডাকছে ঘাতক সৈন্যকে–
বলছে “মারো মারো’।
মানবপুত্র যন্ত্রণায় বলে উঠলেন ঊর্ধ্বে চেয়ে,
“হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর,
কেন আমাকে ত্যাগ করলে।’
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- যন্ত্রসভ্যতা ও আধুনিক হিংস্রতা:“সেকালেও মানুষ ক্ষতবিক্ষত হত যে-সমস্ত পাপের মারে– / … বিদ্যুদ্বেগে আজ তাদের ফলায় শান দেওয়া হচ্ছে / হিস্হিস্ শব্দে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে / বড়ো বড়ো মসীধূমকেতন কারখানাঘরে।”— প্রাচীন কালের হিংস্রতা আধুনিক যুগে শেষ তো হয়ইনি, বরং বিজ্ঞানের শক্তিতে তা আরও যান্ত্রিক, ধ্বংসাত্মক ও গণবিধ্বংসী রূপ নিয়েছে। কলকারখানার কালো ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের লোভ ও হিংসা নতুন অস্ত্রশস্ত্রে শান দিচ্ছে।
- ধর্মের ভণ্ডামি ও দ্বিতীয় ক্রুশারোহণ:“দারুণতম যে মৃত্যুবাণ নূতন তৈরি হল, / … পূজারি তাতে লাগিয়েছে তাঁরই নামের ছাপ / তীক্ষ্ণ নখে আঁচড় দিয়ে। / খৃস্ট বুকে হাত চেপে ধরলেন; / বুঝলেন শেষ হয় নি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মুহূর্ত,”— সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো—প্রেম ও ক্ষমার প্রতীক যিশুখ্রিস্টের নামেই নরঘাতক অস্ত্রকে পবিত্র বলে চালানো হচ্ছে। যাজকশ্রেণি যুদ্ধ ও রক্তপাতকে ধর্মীয় বৈধতা দিচ্ছে। ফলে যিশুর মৃত্যু কোনো অতীত ইতিহাস নয়; আধুনিক বিজ্ঞানাগারে তৈরি প্রতিটি অস্ত্রের আঘাতে তিনি আজও প্রতিনিয়ত ক্রুশবিদ্ধ হচ্ছেন।
- ধর্মনেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি ও অন্তিম হাহাকার:“সেদিন তাঁকে মেরেছিল যারা / ধর্মমন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে, / তারাই আজ নূতন জন্ম নিল দলে দলে, / … মানবপুত্র যন্ত্রণায় বলে উঠলেন ঊর্ধ্বে চেয়ে, / ‘হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর, / কেন আমাকে ত্যাগ করলে।'”— প্রাচীন জেরুজালেমের মন্দিরের গোঁড়া পুরোহিতরা যেভাবে হিংসা ও পরশ্রীকাতরতায় যিশুকে হত্যা করেছিল, আজকের ধর্মনেতারাও একই ভূমিকা নিয়ে সৈন্যদের “মারো মারো” বলে মানুষ নিধনে পাঠাচ্ছে। মানুষের এই আত্মঘাতী পতন দেখে ব্যথিত ‘মানবপুত্র’ পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে আত্মিক নিঃসঙ্গতা ও হতাশার চরম হাহাকার প্রকাশ করেছেন।