কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের আকাঙ্ক্ষা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ ‘কড়ি ও কোমল’-এর একটি সুমধুর, আকুল ও অতৃপ্ত যৌবনের প্রণয়গীতি হলো ‘আকাঙ্ক্ষা’। শরতের স্নিগ্ধ প্রভাতে প্রকৃতির অজস্র সৌন্দর্যের মাঝেও অন্তরের এক অলক্ষ্য অভাববোধ, অদেখা মানসীর জন্য অনির্দিষ্ট তৃষ্ণা এবং প্রাণ উজাড় করে দেওয়ার ব্যাকুলতা এ কবিতায় এক বিষাদমধুর গীতিময়তায় রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামআকাঙ্ক্ষা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকড়ি ও কোমল
প্রকাশের বছর১৮৮৬ (১২৯৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক গীতি-কবিতা ও রাগপ্রধান প্রণয়-লিরিক (Lyric of Yearning)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থে তরুণ রবীন্দ্রনাথ মানবদেহের লাবণ্য, যৌবনের অনুভূতির উন্মেষ এবং পার্থিব জগতের প্রতি এক তীব্র অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। ‘আকাঙ্ক্ষা’ কবিতাটি মূলত সুর ও ছন্দের মেলবন্ধনে এক অতৃপ্ত আবেগের প্রকাশ (মূল পাঠের সূচনায় ‘যোগিয়া বিভাস–একতাল’-এর সুর-নির্দেশনা রয়েছে)। শরতের রোদে ও শিউলির সুবাসে যখন পৃথিবী আলোকময়, তখনো কবির মনে হয়—কেউ যেন নেই, কোথাও যেন শূন্যতা রয়ে গেছে। এই না-পাওয়া অস্পষ্ট মানসীকে ঘিরে কবির হৃদয়ে জেগে ওঠে গান বাঁধার, মালা গাঁথার এবং নিঃশেষে আত্মদানের প্রবল আকুলতা; অথচ যোগ্য পাত্রের অভাবে সেই দান যাতে ব্যর্থ বা অনাদৃত না হয়, সেই মধুর শঙ্কাও কবিতাটিকে এক চিরন্তন রূপ দিয়েছে।

আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ কবিতা (বাংলা):

আজি কোন আজি কোন যোগিয়া বিভাস–একতাল।।

শরত তপনে প্রভাত স্বপনে কি জানি পরাণ কি যে চায় !

শেফালির শাখে কি বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী কি যে গায়!

মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে রঙ্গে না আবাসে মন হায় !

কুসুমের আশে, কোন ফুল বাসে সুনীল আকাশে মন ধায় !

কে যেন গো নাই এ প্রভাতে তাই জীবন বিফল হয় গো!

চারিদিকে চায় মন কেঁদে গায় “এ নহে, এ হে, নয় গো !”

স্বপনের দেশে আছে এলোকেশে, কোন ছায়াময়ী অমরায় !

মাজি আমি আমি আমি সদা আকা-ঙ্ক্ষা ।

ᎼᎭᏬ কোন উপবনে বিরহ বেদনে আমারি কারণে কেঁদে যায় !

যদি গাথি গান অথির পরাণ সে গান শুনাব কারে আর ।

যদি গাথি মালা লক্ষয় ফুল ডাল৷ কাহারে পরাব ফুলহার !

আমার এ প্রাণ যদি করি দান দিব প্রাণ তবে কার পায় ।

ভয় হয় মনেপাছে অযতনে  মনে মনে কেহ ব্যথা পায় !

Akanksha — Shompurno Kobita (Romanized Version)

Aji kon aji kon jogiya Bibhas–Ektal.।

Shorot topone probhat shopone ki jani poran ki je chay!

Shefalir shakhe ki boliya dake bihog bihogi ki je gay!

Modhur batase hridoy udashe range na abase mon hay!

Kusumer ashe, kon phool base shunil akashe mon dhay!

Ke jeno go nai e probhate tai jibon bifol hoy go!

Charidike chay mon kende gay “E nohe, e he, noy go!”

Shopner deshe achhe elokeshe, kon chhayamoyi omoray!

Maji ami ami ami shoda aka-anksha.

ᎼᎭᏬ kon upobone biroho bedone amari karone kende jay!

Jodi gathi gaan athir poran se gaan shunab kare ar.

Jodi gathi mala lokkhoy phool dal৷ kahare porab phulhar!

Amar e pran jodi kori dan dib pran tobe kar pay.

Bhoy hoy monepache oyotone mone mone keho byatha p

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রকৃতির রূপ ও অন্তরের শূন্যতা:
    “শরৎ-তপনে প্রভাত-স্বপনে কি জানি পরাণ কি যে চায়! / … কে যেন গো নাই এ প্রভাতে তাই জীবন বিফল হয় গো! / চারিদিকে চায়, মন কেঁদে গায়— ‘এ নহে, এ নহে, নয় গো!'”
    — শরতের স্নিগ্ধ রোদ, শিউলির সুবাস আর পাখির কলকাকলির মাঝেও কবি-হৃদয়ে এক গভীর অপ্রাপ্তি জেগে থাকে। চোখের সামনে যা আছে, মন তাকে মেনে নিতে পারে না; এক অদৃশ্য ও অপূর্ণ সত্তার অভাবে সমগ্র প্রভাতই যেন অপূর্ণ মনে হয়।
  • ছায়াময়ী অমরা ও বিরহীর কল্পনা:
    “স্বপনের দেশে আছে এলোকেশে কোন্‌ ছায়াময়ী অমরায়! / কোন্‌ উপবনে বিরহবেদনে আমারি কারণে কেঁদে যায়!”
    — রোমান্টিক কল্পনার চিরায়ত রূপকল্পে কবি এক দূরবর্তী, অদেখা মানসীর অস্তিত্ব অনুভব করেন। সে যেন কোনো কল্পলোকের অমরাবতীতে বসে কবির জন্যই বিরহবেদনায় চোখের জল ফেলছে। দুই অচেনা আত্মার এই অদৃশ্য টানই আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে।
  • আত্মদানের ব্যাকুলতা ও অযতনের শঙ্কা:
    “যদি গাঁথি মালা, লক্ষ ফুলডালা, কাহারে পরাব ফুলহার! / আমার এ প্রাণ যদি করি দান, দিব প্রাণ তবে কার পায়! / ভয় হয় মনে পাছে অযতনে মনে মনে কেহ ব্যথা পায়!”
    — প্রেমের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা আত্মত্যাগে। কিন্তু কবি দ্বিধান্বিত—তাঁর গান, মালা ও প্রাণের চরম অর্ঘ্য তিনি কাকে নিবেদন করবেন? যাকে দেওয়া হবে, সে যদি এর মূল্য না বোঝে বা অযত্ন করে, তবে সেই পবিত্র অনুভূতির যে অবমাননা ঘটবে—সেই আশঙ্কাই তরুণ কবির সংবেদনশীল হৃদয়কে দোলা দেয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, পাঠভেদ সংশোধন ও রাগ-তাল নির্দেশনাসহ তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন