বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত সংহত, গভীর ও রূপকাশ্রিত বিরহের লিরিক কবিতা হলো ‘বিচ্ছেদ’। মিলনরাত্রির অবসানে বিদায়লগ্নে প্রিয়ার বিরহের বাঁশি উপহার দেওয়া এবং সেই শূন্য বাঁশির সাথে প্রেমিকের কণ্ঠের গানের চিরকালীন হাহাকার ও অপূর্ণতাকে কবি মাত্র আট চরণে নিখুঁত ব্যঞ্জনায় মূর্ত করেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | বিচ্ছেদ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক বিরহ-লিরিক ও রূপকাশ্রিত প্রণয়-কবিতা (Allegorical Elegy / Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের মিলন ও বিচ্ছেদের চিরন্তন দ্বন্দ্ব এক অতল রূপকসৌন্দর্যে ধরা দিয়েছে। মিলনরাত্রির শেষে বিদায়বেলায় প্রেমিক তার কণ্ঠের যাবতীয় সুর ও গান প্রিয়তমাকে উৎসর্গ করে। বিনিময়ে প্রিয়তমা মৃদু হেসে প্রেমিকের হাতে রেখে যায় তার অন্তরের ‘বিরহের বাঁশি’। কিন্তু সুরহীন শূন্য বাঁশি আর গায়কবিহীন গানের যে চিরন্তন দূরত্ব, তা-ই হয়ে ওঠে সারা পৃথিবীর রোদন। বসন্তে ও শরতে বিশ্বপ্রকৃতির যে বিষাদময় সৌন্দর্য, কবি তাকে এই গান ও বাঁশির বিচ্ছেদের হাহাকার রূপেই অনুভব করেছেন।
সম্পূর্ণ কবিতা:
রাত্রি যবে সাঙ্গ হল, দূরে চলিবারে
দাঁড়াইলে দ্বারে।
আমার কণ্ঠের যত গান
করিলাম দান।
তুমি হাসি
মোর হাতে দিলে তব বিরহের বাঁশি।
তার পরদিন হতে
বসন্তে শরতে
আকাশে বাতাসে উঠে খেদ,
কেঁদে কেঁদে ফিরে বিশ্বে বাঁশি আর গানের বিচ্ছেদ।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ratri jobe shango holo, dure cholibare
Darayle dware.
Amar konther joto gan
Korilam dan.
Tumi hashi
Mor hate dile tobo biroher banshi.
Tar porodinto hote
Boshonte shorote
Akashe batase uthe khed,
Kende kende phire bisshe banshi ar ganer bichchhed.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বিদায়লগ্নের নিঃশব্দ প্রতিদান:“আমার কণ্ঠের যত গান / করিলাম দান। / তুমি হাসি / মোর হাতে দিলে তব বিরহের বাঁশি।”— প্রেমিকের ছিল কেবল কণ্ঠের গান, যা সে প্রিয়ার যাত্রাপথে উজাড় করে নিবেদন করেছে। বিপরীতে প্রিয়া দিয়ে গেল একটি বাঁশি—যা মিলনের নয়, অনন্ত বিরহের প্রতীক। মৃদু হাসির আবরণে এই বিষাদের উপহার বিচ্ছেদের গভীরতাকে আরো মর্মস্পর্শী করে তোলে।
- যন্ত্র ও সুরের শাশ্বত দূরত্ব:“কেঁদে কেঁদে ফিরে বিশ্বে বাঁশি আর গানের বিচ্ছেদ।”— বাঁশি একা বাজে না, তার চাই প্রাণস্পর্শী গান; আবার গানও আকার পেতে চায় বাঁশির সুরে। কিন্তু যখন গান একজনের অন্তরে থেকে যায় আর বাঁশি পড়ে থাকে অন্যের হাতে, তখন সুরের পূর্ণতা চিরকালের মতো হারিয়ে যায়। সৃষ্টির অন্তরে সুর ও বাদ্যের এই অসমাপ্তিই প্রেমের চরম বিচ্ছেদ।
- প্রকৃতিতে অনুভূতির বিশ্বজনীন রূপ:“তার পরদিন হতে / বসন্তে শরতে / আকাশে বাতাসে উঠে খেদ,”— ব্যক্তিগত দুই হৃদয়ের বিচ্ছেদ কেবল ব্যক্তিসীমানায় থেমে থাকে না। বসন্তের চঞ্চল হাওয়া কিংবা শরতের নীল আকাশের বিষাদমাধুর্যে কবি যেন নিখিল বিশ্বের এক অলক্ষ্য ক্রন্দন শুনতে পান। দুই সত্তার বিরহ সমগ্র নিসর্গের হাহাকারে পরিণত হয়।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।