বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও ভাবগম্ভীর কবিতা হলো ‘হে লক্ষ্মী, তোমার আজি নাই অন্তঃপুর’। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণোত্তর স্মৃতিচারণে পার্থিব গৃহকোণের গৃহলক্ষ্মীর রূপটি কীভাবে মৃত্যুর পর দেশ-কালের সীমা পেরিয়ে সর্বজনীন সরস্বতীরূপে এবং নিখিল বিশ্বের অনন্ত কল্যাণে ব্যাপ্ত হয়ে গেছে—এ কবিতায় তারই এক মহিমান্বিত রূপ ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | হে লক্ষ্মী, তোমার আজি নাই অন্তঃপুর (স্মরণ কাব্যের অন্তর্গত) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | স্মরণ (অনলাইন অনুলিপিতে উল্লিখিত ১৯৬১ সালটি মূলত রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের বিশেষ প্রকাশনার; মূল কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৯০৩ সালে) |
| রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ | ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রয়াণচেতনার শোক-লিরিক ও অধ্যাত্ম-ভাবাপন্ন স্মৃতি-গাথা (Elegiac Lyric of Transfiguration) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর অকালপ্রয়াণ ঘটে। এই শোকের পটভূমিতে রচিত ‘স্মরণ’ কাব্যে কবি কেবল বিচ্ছেদের আহাজারি করেননি, বরং প্রিয়তমার সীমাবদ্ধ সত্তা কীভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি লাভ করেছে তা অনুধাবন করেছেন। জীবিতকালে তিনি ছিলেন গৃহকোণের অন্তঃপুরবাসিনী ‘লক্ষ্মী’—পারিবারিক সীমা ও প্রাত্যহিক সেবায় আবদ্ধ। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর সেই রূপ অন্তঃপুরের দেয়াল ভেঙে সঙ্গীতের পদ্মফুলে অধিষ্ঠিত অমল ‘সরস্বতী’ রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর চিত্তসৌন্দর্য আর কোনো বাধার সম্মুখীন নয়; তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সমস্ত আলো, আনন্দ ও মঙ্গলের মাঝে। গৃহবধূর স্নেহাতুর হৃদয় ও মঙ্গলের কঙ্কণ নিখিল নারীর চিত্তে সঞ্চারিত হয়ে কবির অন্তরে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর যুগল মহিমায় এক পূর্ণরূপ ধারণ করেছে।
সম্পূর্ণ কবিতা:
হে লক্ষ্মী, তোমার আজি নাই অন্তঃপুর
সরস্বতীরূপ আজি ধরেছ মধুর,
দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদলদলে।
মানসসরসী আজি তব পদতলে
নিখিলের প্রতিবিম্বে রঞ্জিছে তোমায়।
চিত্তের সৌন্দর্য তব বাধা নাহি পায়–
সে আজি বিশ্বের মাঝে মিশিছে পুলকে
সকল আনন্দে আর সকল আলোকে
সকল মঙ্গল-সাথে। তোমার কঙ্কণ
কোমল কল্যাণপ্রভা করেছে অর্পণ
সকল সতীর করে। স্নেহাতুর হিয়া
নিখিল নারীর চিত্তে গিয়েছে লাগিয়া।
সেই বিশ্বমূর্তি তব আমারি অন্তরে
লক্ষ্মী-সরস্বতী-রূপে পূর্ণরূপ ধরে।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
He lokkhi, tomar aji nai ontopur
Shorosshotirup aji dhorechho modhur,
Danrayechho shonggiter shotodolodole.
Manosh-shoroshi aji tobo podotole
Nikhiler protibimbe ronjichhe tomay.
Chitter shoundorjo tobo badha nahi pay–
She aji bissher majhe mishichhe puloke
Shokol anonde ar shokol aloke
Shokol monggol-shathe. Tomar kongkon
Komol kollanprobha korechhe orpon
Shokol shotir kore. Snehatur hiya
Nikhil narir chitte giyechhe lagiya.
Shei bisshomurti tobo amari ontore
Lokkhi-shorosshoti-rupe purnorup dhore.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- গৃহলক্ষ্মী থেকে সরস্বতী রূপে রূপান্তর:“হে লক্ষ্মী, তোমার আজি নাই অন্তঃপুর / সরস্বতীরূপ আজি ধরেছ মধুর, / দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদলদলে।”— মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কবিপত্নীর পার্থিব গৃহসীমার অবসান ঘটেছে। গৃহের ‘লক্ষ্মী’ এখন আর চারদেয়ালের অন্তঃপুরে বন্দি নন; তিনি শিল্প, কাব্য ও অনুভূতির শাশ্বত দেবী ‘সরস্বতী’ রূপে সঙ্গীতের শতদলে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
- বিশ্বচেতনায় চিত্তসৌন্দর্যের বিস্তৃতি:“চিত্তের সৌন্দর্য তব বাধা নাহি পায়– / সে আজি বিশ্বের মাঝে মিশিছে পুলকে / সকল আনন্দে আর সকল আলোকে / সকল মঙ্গল-সাথে।”— পার্থিব প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় তাঁর অন্তরের কল্যাণময় রূপটি এখন সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্ম। নিখিলের প্রতিটি আলো, আনন্দ ও কল্যাণপ্রভায় তিনি নিজেকে ব্যাপ্ত করে দিয়েছেন।
- সর্বজনীন মাতৃত্ব ও অন্তরের পূর্ণরূপ:“তোমার কঙ্কণ / কোমল কল্যাণপ্রভা করেছে অর্পণ / সকল সতীর করে। স্নেহাতুর হিয়া / নিখিল নারীর চিত্তে গিয়েছে লাগিয়া। / সেই বিশ্বমূর্তি তব আমারি অন্তরে / লক্ষ্মী-সরস্বতী-রূপে পূর্ণরূপ ধরে।”— তাঁর ব্যক্তিগত হাতের মঙ্গলের কঙ্কণ আজ পৃথিবীর প্রতিটি নারীর হাতে শোভিত, তাঁর স্নেহশীল হৃদয় প্রতিটি নারীর বাৎসলে প্রতিধ্বনিত। ব্যক্তিগত সত্তার এই সার্বজনীন রূপান্তরের মধ্য দিয়েই কবির হৃদয়ে তিনি সেবা ও সুরের—লক্ষ্মী ও সরস্বতীর—এক অবিচ্ছেদ্য পূর্ণরূপ লাভ করেছেন।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির অনাবশ্যক হাইফেন ও টাইপো বর্জনপূর্বক প্রমিত ‘হে লক্ষ্মী’ ও ‘আজিনাই’-এর স্থলে পৃথককৃত রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।