বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যাত্মভাবাপন্ন ও ভক্তিমূলক লিরিক রচনা হলো ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি’ (পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত হিসেবেও বিপুল জনপ্রিয়)। পরমসত্তার সান্নিধ্য কীভাবে মানবাত্মার সমস্ত সংকীর্ণ ভৌগোলিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে অজানাকে চিরচেনা আত্মীয়তায় এবং পরকে পরম ভ্রাতৃত্বে রূপান্তর করে—এ কবিতায় তারই এক সার্বজনীন মহিমা অভিব্যক্ত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | কত অজানারে জানাইলে তুমি (গীতাঞ্জলির ১৮ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতাঞ্জলি (পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) |
| প্রকাশের বছর | ১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | ভক্তিমূলক রোমান্টিক লিরিক ও প্রার্থনাসঙ্গীত (Devotional Mystical Lyric / Hymn) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
কত অজানারে-জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই–
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
পুরানো আবাস ছেড়ে যাই তবে
মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন
সে কথা যে ভুলে যাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে
যখনি যেখানে লবে,
চিরজনমের পরিচিত ওহে,
তুমিই চিনাবে সবে।
তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর,
নাহি কোনো মানা, নাহি কোনো ডর;
সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ,
দেখা যেন সদা পাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- দূর ও পরের সর্বজনীন আত্মীয়তা:“দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু, / পরকে করিলে ভাই। / কত অজানারে জানাইলে তুমি, / কত ঘরে দিলে ঠাঁই–“— ঈশ্বরের ভালোবাসা মানুষকে সংকীর্ণ ভৌগোলিক বা গোত্রগত সীমানায় আবদ্ধ রাখে না। হৃদয়ে ঈশ্বরের উপস্থিতি থাকলে মানুষ সর্বত্র নিজের গৃহ খুঁজে পায় এবং অচেনা মানুষকেও সহোদরের মতো আপন করে নিতে পারে।
- নূতনের মাঝে চিরন্তন পুরাতনের উপলব্ধি:“পুরানো আবাস ছেড়ে যাই যবে / মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে, / নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন / সে কথা যে ভুলে যাই।”— জীবনের স্থানান্তর বা মৃত্যুর মতো রূপান্তর মানুষকে স্বভাবতই আতঙ্কিত করে। কিন্তু পরমেশ্বর যে নতুনের অবয়বেও সেই একই চিরন্তন সত্তা হয়ে বিরাজ করেন, তা স্মরণ করতে পারলে পরিবর্তনের সমস্ত সংশয় ও শঙ্কা কেটে যায়।
- ভয়হীন বিশ্বচেতনার উন্মেষ:“তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর, / নাহি কোনো মানা, নাহি কোনো ডর; / সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ, / দেখা যেন সদা পাই।”— কবিতায় ভক্তের অন্তিম উপলব্ধি হলো: ঈশ্বরকে জানলে জগতে আর কেউ পর থাকে না। জাত-পাত, লোকলজ্জা বা পার্থিব বাধানিষেধের সমস্ত কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে মানুষ তখন সর্বভূতে সেই এক ঈশ্বরের প্রকাশ দর্শন করে সম্পূর্ণ নির্ভীক হয়ে ওঠে।