স্মরণ কাব্যগ্রন্থের দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর শোকগাথা, স্নিগ্ধ ও বেদনাবিধুর কবিতা হলো ‘দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি’। প্রিয়জনের প্রয়াণের পর ফেলে যাওয়া কিছু পুরনো চিঠি ও স্মৃতির স্মারক আগলে রাখার তীব্র ব্যাকুলতা এবং কালস্রোতের বিপরীতে স্মৃতির অমরত্ব এই কবিতায় অত্যন্ত মর্মে গিয়ে স্পর্শ করে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ
প্রকাশের বছর১৯০৩ (১৩১০ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনশোকগাথা ও স্মৃতিকাতর কবিতা (Elegy and Nostalgic Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯০৩ সালে প্রকাশিত ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত জীবনের এক চরম শোকাচ্ছন্ন অধ্যায়ের সৃষ্টি। ১৯০২ সালে কবির স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর অকালমৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে কবি এই শোকগাথাগুলো রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা, শূন্যতা এবং তাদের সাথে জড়িত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্মৃতির প্রতি এক গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। ‘দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি’ কবিতায় কবি প্রয়াত প্রিয়জনের রেখে যাওয়া পুরনো কিছু চিঠি ও স্মৃতির নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার পর যে অনুভূতির জন্ম হয়, তা অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি – সম্পূর্ণ কবিতা

দেখিলাম খানকয়েক পুরাতন চিঠি–
স্নেহমুগ্ধ জীবনের চিহ্ন দু-চারিটি
স্মৃতির খেলনা-ক’টি বহু যত্নভরে
গোপনে সঞ্চয় করি রেখেছিলে ঘরে।
যে প্রবল কালস্রোতে প্রলয়ের ধারা
ভাসাইয়া যায় কত রবিচন্দ্রতারা,
তারি কাছ হতে তুমি বহু ভয়ে ভয়ে
এই ক’টি তুচ্ছ বস্তু চুরি করে লয়ে
লুকায়ে রাখিয়াছিলে, বলেছিলে মনে,
“অধিকার নাই কারো আমার এ ধনে’।
আশ্রয় আজিকে তারা পাবে কার কাছে?
জগতের কারো নয়, তবু তারা আছে।
তাদের যেমন তব রেখেছিল স্নেহ,
তোমারে তেমনি আজ রাখে নি কি কেহ?

দেখিলাম খানকয় পুরাতন চিঠি Romanized Version

Dekhilam khankoyek puraton chithi–
Shehn-mugdho jiboner chinho du-chariti
Smritir khelna-k’ti bohu jotnotvore
Gopone sonchoy kori rekhechhile ghore.
Je probolo kalshrote proloyer dhara
Bhashaiya jay koto robichondrotara,
Tari kachh hote tumi bohu bhoye bhoye
Ei k’ti tuchchho bostu churi kore loye
Lukiye rakhachhile, bolechhile mone,
“Odhiokar nai karo amar a dhone’.
Ashroy ajike tara pabe kar kachhe?
Jogoter karo noy, tobu tara ache.
Tader jemon tobo rekhechhilo sneho,
Tomare temni aj rakhe ni ki keho?

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • স্মৃতির গোপন সঞ্চয়: প্রিয়জনের হাতের লেখা কিছু পুরনো চিঠি এবং সামান্য কিছু স্মৃতির নিদর্শন মানুষ কত যত্ন করে গোপনে ঘরে জমিয়ে রাখে, যেন কালস্রোতের হাত থেকে প্রিয় স্পর্শের কিছু অংশ বাঁচিয়ে রাখা যায়।
  • কালের নিষ্ঠুর স্রোত ও মানুষের আকুতি:
“যে প্রবল কালস্রোতে প্রলয়ের ধারা / ভাসাইয়া যায় কত রবিচন্দ্রতারা, / তারি কাছ হতে তুমি বহু ভয়ে ভয়ে / এই ক’টি তুচ্ছ বস্তু চুরি করে লয়ে…”
— মহাকালের যে ভয়ঙ্কর স্রোত কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র ও সাম্রাজ্য ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তার চোখ ফাঁকি দিয়ে মানুষ অতি যত্নে এই তুচ্ছ চিঠিগুলোকে যেন কালস্রোত থেকে ‘চুরি করে’ নিজের মনের কোণে লুকিয়ে রাখে।
  • অন্তিম সান্ত্বনা ও পরম আশ্রয়:
“তাদের যেমন তব রেখেছিল স্নেহ, / তোমারে তেমনি আজ রাখে নি কি কেহ?”
— কবিতার শেষ চরণে কবি এক গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছেন। যে চিঠিগুলো মানুষ এত যত্ন করে আগলে রেখেছিল, আজ সেই মানুষটি চলে যাওয়ার পরেও যেমন সেই চিঠিগুলো রয়ে গেছে, তেমনই মহাশূন্যে বা পরম মমতায় সেই মানুষটিকেও কি আজ কেউ একইভাবে আগলে রাখেনি? বিরহের মাঝে পরম আশ্বাসের এক অনুপম প্রকাশ ঘটেছে এখানে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন