বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর একটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, দার্শনিক ও দাম্পত্য মিলনের শাশ্বত রূপের চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘এ সংসারে একদিন নববধূবেশে’। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণোত্তর প্রেক্ষাপটে রচিত এই কবিতায় কবি তাঁদের শুভপরিণয়কে নিছক কোনো আকস্মিক পার্থিব যোগাযোগ বা অদৃষ্টের ক্ষণিক খেলা হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের এই মিলন ছিল যুগ-যুগান্তরের সাধনা ও অনাদিকালের এক অলৌকিক অভিপ্রায়।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | এ সংসারে একদিন নববধূবেশে (স্মরণ কাব্যের ১৬ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | স্মরণ (অনলাইন প্রতিলিপিতে উল্লিখিত ১৯৬১ সালটি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সংস্করণ নির্দেশ করে; মূল কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৯০৩ সালে) |
| রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ | ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ) |
| কবিতার আঙ্গিক ও ধরন | চতুর্দশপদী সনেটধর্মী স্মৃতিচারণ ও শোক-লিরিক (Elegiac Romantic Sonnet) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৮৮৩ সালে ভবতারিণী (পরবর্তী নাম মৃণালিনী দেবী)-র সাথে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ উনিশ বছরের দাম্পত্যজীবন পার করে ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর মৃণালিনী দেবী অকালে মৃত্যুবরণ করেন। পত্নীর চিরবিদায়ের পর কবি তাঁর প্রথম জীবনের স্মৃতিতে ফিরে যান—যেদিন নববধূবেশে কম্পিত হাতে বধূ কবির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কবির হৃদয়ে প্রশ্ন জাগে, এই মিলন কি কেবল ভাগ্যের খেয়াল বা মুহূর্তের কোনো আকস্মিক ঘটনা? অন্তরের গভীর থেকে উত্তর আসে—না, এ মিলন অনাদিকালের বিধিলিপি। বহু জনম ধরে একে অন্যকে সম্পূর্ণ করার জন্যই এই যুগলযাত্রার সূচনা হয়েছিল। সুখ-দুঃখ, লজ্জা-ভয়, জয়-পরাজয়ের দোলাচলে দুইজনে মিলে যে যৌথ জীবনের সৌধ গড়ে তুলছিলেন, প্রিয়তমার প্রয়াণে তা আজ অসমাপ্ত। কবি বেদনাভরে উপলব্ধি করেন, তাঁদের দুইজনের নিবিড় অংশীদারত্ব ছাড়া আর কারো পক্ষেই এই অসমাপ্ত সুর বা সৃষ্টিকে পূর্ণতা দেওয়া সম্ভব নয়।
সম্পূর্ণ কবিতা:
এ সংসারে একদিন নববধূবেশে
তুমি যে আমার পাশে দাঁড়াইলে এসে,
রাখিলে আমার হাতে কম্পমান হাত,
সে কি অদৃষ্টের খেলা, সে কি অকস্মাৎ?
শুধু এক মুহূর্তের এ নহে ঘটনা,
অনাদিকালের এ আছিল মন্ত্রণা।
দোঁহার মিলনে মোরা পূর্ণ হব দোঁহে,
বহু যুগ আসিয়াছি এই আশা বহে।
নিয়ে গেছ কতখানি মোর প্রাণ হতে,
দিয়ে গেছ কতখানি এ জীবনস্রোতে!
কত দিন কত রাত্রে কত লজ্জাভয়ে
কত ক্ষতিলাভে কত জয়ে পরাজয়ে
রচিতেছিলাম যাহা মোরা শ্রান্তিহারা
সাঙ্গ কে করিবে তাহা মোরা দোঁহে ছাড়া?
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
E shongshare ekdin nobobodhubeshe
Tumi je amar pashe danrayile eshe,
Rakhile amar hate kompomano hat,
She ki odrishter khela, she ki okossmat?
Shudhu ek muhurter e nohe ghotona,
Onadikaler e achhilo montrona.
Donhar milone mora purno hobo donhe,
Bohu jug ashiyachhi ei asha bohe.
Niye gechho kotokhani mor pran hote,
Diye gechho kotokhani e jibonsrote!
Koto din koto ratre koto lojjabhoye
Koto khotilabhe koto joye porajoye
Rochitechhilam jaha mora shrantihara
Sanggo ke koribe taha mora donhe chhara?
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- শুভদৃষ্টির চিরন্তন তাৎপর্য:“তুমি যে আমার পাশে দাঁড়াইলে এসে, / রাখিলে আমার হাতে কম্পমান হাত, / সে কি অদৃষ্টের খেলা, সে কি অকস্মাৎ? / শুধু এক মুহূর্তের এ নহে ঘটনা, / অনাদিকালের এ আছিল মন্ত্রণা।”— পরিণয়লগ্নে নববধূর সেই প্রথম স্পর্শ ও কম্পিত হাতের ছোঁয়া কোনো ক্ষণিক বা দৈব ঘটনা নয়। ভারতীয় দর্শনের জন্মান্তর ও শাশ্বত প্রেমের ধারণায় এটি ছিল সৃষ্টিলগ্নের এক নির্ধারিত পরম পরিকল্পনা।
- পরস্পরের দেওয়া-নেওয়া ও পূর্ণতা:“দোঁহার মিলনে মোরা পূর্ণ হব দোঁহে, / বহু যুগ আসিয়াছি এই আশা বহে। / নিয়ে গেছ কতখানি মোর প্রাণ হতে, / দিয়ে গেছ কতখানি এ জীবনস্রোতে!”— দাম্পত্য কেবল সহাবস্থান নয়, একে অপরকে পূর্ণ করার এক আত্মিক সাধনা। দীর্ঘ উনিশ বছরে দুজনের প্রাণের আদান-প্রদানে কবির জীবনস্রোত সমৃদ্ধ হয়েছে; প্রিয়তমা তাঁর সত্তা থেকে যেমন অনেক কিছু গ্রহণ করেছেন, তেমনি নিজের সমস্ত মমত্ব উজাড় করে দিয়ে গেছেন।
- অসমাপ্ত জীবনসাধনা ও একাকিত্বের আর্তি:“কত দিন কত রাত্রে কত লজ্জাভয়ে / কত ক্ষতিলাভে কত জয়ে পরাজয়ে / রচিতেছিলাম যাহা মোরা শ্রান্তিহারা / সাঙ্গ কে করিবে তাহা মোরা দোঁহে ছাড়া?”— সংসারের প্রতিদিনের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে, সুখ-দুঃখের যৌথ অভিজ্ঞতায় যে জীবনের স্বপ্ন তাঁরা রচনা করছিলেন, তা আজ একার পক্ষে সমাপ্ত করা অসম্ভব। মৃত্যুর নিষ্ঠুর বিচ্ছেদে সেই অসমাপ্ত সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে কবির আত্মায় কেবল অপার শূন্যতা ও হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও ঐতিহাসিক সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।