স্মরণ কাব্যগ্রন্থের ‘স্বল্প-আয়ু এ জীবনে যে-কয়টি আনন্দিত দিন’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শোককাব্য ‘স্মরণ’-এর একটি অত্যন্ত ব্যথিত, স্মৃতিভারাক্রান্ত ও নিসর্গ-অভিষিক্ত চতুর্দশপদী (সনেটধর্মী) কবিতা হলো ‘স্বল্প-আয়ু এ জীবনে যে-কয়টি আনন্দিত দিন’। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর অকালমৃত্যুর পর তাঁর ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমিত আনন্দের দিনগুলো হারিয়ে যায়নি, বরং প্রকৃতির নানা রূপে—সূর্যাস্তের মেঘে, দুপুরের পাতার মর্মরে এবং শীতের মিঠে রোদে—কবির চারিদিকে ছড়িয়ে আছে; এ কবিতায় শোকের সেই মহাজাগতিক ও অন্তরঙ্গ বিস্তার অপূর্ব রূপ লাভ করেছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামস্বল্প-আয়ু এ জীবনে যে-কয়টি আনন্দিত দিন (স্মরণ কাব্যের অন্তর্গত)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ (অনলাইন অনুলিপিতে ১৯৬১ সালটি রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সংস্করণ নির্দেশ করে; মূল প্রকাশ ১৯০৩ সালে)
রচনাকাল/প্রথম প্রকাশ১৩০৯ বঙ্গাব্দ (১৯০২-১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনচতুর্দশপদী সনেটধর্মী শোক-লিরিক ও প্রকৃতি-স্মৃতিচারণ (Elegiac Sonnet)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর মাত্র ২৯ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী প্রয়াণ করেন। জীবনের এই অতি স্বল্প পরিসরে সংসারের নানা দায়িত্ব, রোগ-শোক ও আত্মসংকোচের মাঝে তিনি খুব কমই নিখাদ আনন্দের দিন পেয়েছিলেন। পত্নীহারা কবি বেদনাভরে ভাবেন—সঙ্গীতের মতো বেদনায় বিলীন সেই কম্পিত-পুলকের দিনগুলো কি মৃত্যুর সাথে সাথে নষ্ট বা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে? না, কবি বিশ্বাস করেন তা কোথাও পরম যত্নে সংরক্ষিত আছে। তাই তিনি প্রকৃতির ক্যানভাসে সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে খুঁজে বেড়ান। সূর্যাস্তের মেঘের সোনালি স্তরে যেন সেই জীবনের বিদায়গাথা লেখা রয়েছে; দ্বিপ্রহরের শুষ্ক পাতার মর্মরে তাঁর ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়; আর শীতের রোদ্দুরে যেন তাঁদের অতীতের শান্ত মধ্যাহ্নের যৌথ সুখের স্মৃতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়াণের পরও পত্নীর অপূর্ণ সাধ ও স্মৃতি কবির সত্তাকে অহর্নিশ ঘিরে রেখেছে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

স্বল্প-আয়ু এ জীবনে যে-কয়টি আনন্দিত দিন
কম্পিত-পুলকভরে, সংগীতের-বেদনা-বিলীন,
লাভ করেছিলে, লক্ষ্মী, সে কি তুমি নষ্ট করি যাবে?
সে আজি কোথায় তুমি যত্ন করি রাখিছ কী ভাবে
তাই আমি খুঁজিতেছি। সূর্যাস্তের স্বর্ণমেঘস্তরে
চেয়ে দেখি একদৃষ্টে — সেথা কোন্‌ করুণ অক্ষরে
লিখিয়াছ সে জন্মের সায়াহ্নের হারানো কাহিনী!
আজি এই দ্বিপ্রহরে পল্লবের মর্মররাগিণী
তোমার সে কবেকার দীর্ঘশ্বাস করিছে প্রচার!
আতপ্ত শীতের রৌদ্রে নিজহস্তে করিছ বিস্তার
কত শীতমধ্যাহ্নের সুনিবিড় সুখের স্তব্ধতা!
আপনার পানে চেয়ে বসে বসে ভাবি এই কথা–
কত তব রাত্রিদিন কত সাধ মোরে ঘিরে আছে,
তাদের ক্রন্দন শুনি ফিরে ফিরে ফিরিতেছ কাছে।
Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Shwolpo-ayu e jibone je-koyti anondito din
Kompito-pulokbhore, shonggiter-bedona-bilin,
Labho korechhile, Lokkhi, she ki tumi noshto kori jabe?
She aji kothay tumi jotno kori rakhichho ki bhabe
Tai ami khunjitechhi. Shurjastero shwornomeghostore
Cheye dekhi ekdrishte — setha kon korun okkhore
Likhiyachho she jonmer shayanher harano kahini!
Aji ei dwiprohore pollober mormor-ragini
Tomar she kobekar dirghoshwash korichhe prochar!
Atopto shiter roudre nijohoste korichho bistar
Koto shitomoddanher shunibir shukher stobdhota!
Aponar pane cheye boshe boshe bhabi ei kotha–
Koto tobo ratridin koto sadh more ghire achhe,
Tader krondon shuni phire phire phiritechho kachhe.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অল্পায়ু জীবনের আনন্দস্মৃতির অমরত্ব:
    “স্বল্প-আয়ু এ জীবনে যে-কয়টি আনন্দিত দিন / কম্পিত-পুলকভরে, সংগীতের-বেদনা-বিলীন, / লাভ করেছিলে, লক্ষ্মী, সে কি তুমি নষ্ট করি যাবে?”
    — মৃণালিনী দেবীর জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সেই অল্প পরিসরে তিনি যে ক’টি আনন্দের মুহূর্ত পেয়েছিলেন, কবি বিশ্বাস করতে চান না যে মৃত্যুর অন্ধতায় তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। প্রেম ও আনন্দের সেই মুহূর্তগুলো অমূল্য সম্পদ; তা মহাকালের কোথাও না কোথাও সযত্নে রয়ে গেছে।
  • প্রকৃতির রূপকে শোকের বিস্তার:
    “সূর্যাস্তের স্বর্ণমেঘস্তরে / চেয়ে দেখি একদৃষ্টে — সেথা কোন্‌ করুণ অক্ষরে / লিখিয়াছ সে জন্মের সায়াহ্নের হারানো কাহিনী! / আজি এই দ্বিপ্রহরে পল্লবের মর্মররাগিণী / তোমার সে কবেকার দীর্ঘশ্বাস করিছে প্রচার!”
    — রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিগত শোককে নিসর্গের দৃশ্যপটে মিলিয়ে দিয়েছেন। গোধূলির মেঘে তিনি পড়েন পত্নীর জীবনের অবসান-গাথা, আর দ্বিপ্রহরের পাতার মরমর ধ্বনিকে মনে হয় তাঁরই অতীতের দীর্ঘশ্বাস। প্রিয়তমার ফেলে যাওয়া অনুভূতিগুলো বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।
  • স্মৃতির নীরব সহাবস্থান ও পুনরাগমন:
    “কত তব রাত্রিদিন কত সাধ মোরে ঘিরে আছে, / তাদের ক্রন্দন শুনি ফিরে ফিরে ফিরিতেছ কাছে।”
    — কবিতার অন্তিমে ফুটে উঠেছে এক অপার্থিব যোগসূত্র। কবির চারপাশে প্রিয়তমার অতৃপ্ত সাধ ও দিনরাত্রির স্মৃতিরা যেন অবিরত ক্রন্দন করছে। সেই স্মৃতির কান্নাতেই দেহাতীত আত্মা বার বার কবির কাছে ফিরে এসে নিঃশব্দ সান্নিধ্য দিয়ে যায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনুলিপির বিবিধ টাইপো ও অপ্রয়োজনীয় ক্যাপশন বর্জনপূর্বক), ছন্দবিন্যাস ও ঐতিহাসিক সংকলন-তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন