বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলজয়ী কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র একটি অত্যন্ত গভীর, সমর্পণমুখী ও অধ্যাত্ম-ভাবাপন্ন কবিতা হলো ‘এবার নীরব করে দাও’ (গীতাঞ্জলির ১২১ সংখ্যক কবিতা/গান, যা পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়)। জীবনের বহু বাচনিক কোলাহল ও প্রকাশের ক্লান্তি শেষে কবি নিজের ব্যক্তিগত অহংকার ও মুখরতাকে স্তব্ধ করে ঈশ্বরের নিজের সুরে বেজে ওঠার আকুল প্রার্থনা জানিয়েছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | এবার নীরব করে দাও (গীতাঞ্জলির ১২১ সংখ্যক পদ) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | গীতাঞ্জলি (পরবর্তীতে ‘গীতবিতান’-এর পূজা পর্যায়ের গান) |
| প্রকাশের বছর | ১৯১০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) |
| সুর ও রাগ | রাগ: কালাংড়া; তাল: একতাল |
| কবিতার ধরন | অধ্যাত্ম-সমর্পণমূলক লিরিক ও প্রার্থনাসঙ্গীত (Mystical Devotional Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯১০ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলি পর্বে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা নিছক পার্থিব সৃষ্টির অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের হাতে আত্মনিবেদনে উন্মুখ হয়েছিল। কবি সারা জীবন বহু গান গেয়েছেন, অসংখ্য শব্দের মায়াজাল বুনেছেন; কিন্তু জীবনের এক পরম লগ্নে এসে তিনি অনুভব করেন যে এই সমস্ত বাক্যরাশি মূলত সীমিত মানুষের অহংয়ের প্রকাশ। তাই তিনি ঈশ্বরকে অনুরোধ করছেন তাঁর হাতের “হৃদয়-বাঁশি”টি কেড়ে নিতে। মানুষ যখন নিজের চেষ্টায় বাঁশি বাজায়, তখন তাতে নানা অসম্পূর্ণ সুর ও কোলাহল থাকে; কিন্তু সেই বাঁশি যখন স্বয়ং বিশ্বস্রষ্টার ওষ্ঠে স্পর্শিত হয়, তখন তা থেকে সৃষ্টি হয় মহাজাগতিক স্তব্ধ সুর—যে সুরে চন্দ্র-তারা-গ্রহ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। পার্থিব সমস্ত সঞ্চয় ও বাক্যরাশি যেন সেই পরম ঐশ্বরিক সুরের প্লাবনে ভেসে যায় এবং কবি একাকী অন্ধকারে বসে সেই অনন্ত বাঁশির ধ্বনি শুনতে পান।
সম্পূর্ণ কবিতা:
এবার নীরব করে দাও হে তোমার
মুখর কবিরে।
তার হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে
বাজাও গভীরে।
নিশীথরাতের নিবিড় সুরে
বাঁশিতে তান দাও হে পুরে
যে তান দিয়ে অবাক কর’
গ্রহশশীরে।
যা-কিছু মোর ছড়িয়ে আছে
জীবন-মরণে,
গানের টানে মিলুক এসে
তোমার চরণে।
বহুদিনের বাক্যরাশি
এক নিমেষে যাবে ভাসি,
একলা বসে শুনব বাঁশি
অকূল তিমিরে।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Ebar nirob kore dao he tomar
Mukhor kobire.
Tar hridoy-banshi aponi kere
Bajao gobhire.
Nishithrater nibir shure
Banshite tan dao he pure
Je tan diye obak koro’
Grohoshoshire.
Ja-kichhu mor chhoriye achhe
Jibon-morone,
Ganer tane miluk eshe
Tomar chorone.
Bohudiner bakkorashi
Ek nimeshe jabe bhashi,
Ekla boshe shunbo banshi
Okul timire.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- মুখরতার অবসান ও পরম সমর্পণ:“এবার নীরব করে দাও হে তোমার / মুখর কবিরে। / তার হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে / বাজাও গভীরে।”— কবি নিজের এতকালের সৃষ্টিশীলতাকে অহংকার হিসেবে না দেখে একধরনের মুখর অপূর্ণতা হিসেবে দেখছেন। তিনি চান নিজের ব্যক্তিসত্তা ও বাচনিকতা স্তব্ধ হোক, এবং তাঁর হৃদয়রূপ বাঁশিটি যেন ঈশ্বরের নিজের হাতে সমর্পিত হয়, যাতে সেখান থেকে নিখাদ ঐশ্বরিক সুর নির্গত হতে পারে।
- মহাজাগতিক সুরের তান:“নিশীথরাতের নিবিড় সুরে / বাঁশিতে তান দাও হে পুরে / যে তান দিয়ে অবাক কর’ / গ্রহশশীরে।”— কবির কামনা কোনো সাধারণ সুর নয়; যে সুর রাতের গভীরতায় মহাবিশ্বের গ্রহ, উপগ্রহ ও চন্দ্র-নক্ষত্রকে স্তব্ধ বিস্ময়ে চালিত করে, সেই মহাজাগতিক ও অখণ্ড সুর যেন তাঁর অন্তরের বাঁশিতে ধ্বনিত হয়।
- অহংয়ের বিলোপ ও অনন্তের বাঁশি শ্রবণ:“বহুদিনের বাক্যরাশি / এক নিমেষে যাবে ভাসি, / একলা বসে শুনব বাঁশি / অকূল তিমিরে।”— জীবনের সমস্ত শব্দ, যুক্তি ও পার্থিব সৃষ্টির বোঝা ঈশ্বরের সুরের প্লাবনে নিমেষে ভেসে যাক। কোনো কথার দরকার নেই; নিবিড় অন্ধকারের মাঝে একা বসে সেই পরম কাণ্ডারির অনন্ত বাঁশির ধ্বনি শোনাই কবির পরম আত্মিক মুক্তি।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।








