বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ, রোমান্টিক ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘শুভক্ষণ’। এই কবিতায় পরম সত্তা বা ঈশ্বরের (রাজার দুলাল) ক্ষণিক দর্শনের জন্য মানবাত্মার যে আকুল প্রতীক্ষা ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রস্তুতি, তা এক মুগ্ধ বালিকার জবানিতে অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | শুভক্ষণ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রেম, ভক্তি ও রূপকধর্মী গীতি-কবিতা (Romantic, Devotional and Allegorical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
শুভক্ষণ – সম্পূর্ণ কবিতা
ওগো মা,
রাজার দুলাল যাবে আজি মোর
ঘরের সমুখপথে,
আজি এ প্রভাতে গৃহকাজ লয়ে
রহিব বলো কী মতে।
বলে দে আমায় কী করিব সাজ,
কী ছাঁদে কবরী বেঁধে লব আজ,
পরিব অঙ্গে কেমন ভঙ্গে
কোন্ বরনের বাস।
মা গো, কী হল তোমার, অবাক নয়নে
মুখপানে কেন চাস।
আমি দাঁড়াব যেথায় বাতায়নকোণে
সে চাবে না সেথা জানি তাহা মনে–
ফেলিতে নিমেষ দেখা হবে শেষ,
যাবে সে সুদূর পুরে,
শুধু সঙ্গের বাঁশি কোন্ মাঠ হতে
বাজিবে ব্যাকুল সুরে।
তবু রাজার দুলাল যাবে আজি মোর
ঘরের সমুখপথে,
শুধু সে নিমেষ লাগি না করিয়া বেশ
রহিব বলো কী মতে।
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- গৃহকাজে অনীহা ও প্রস্তুতির ব্যাকুলতা:
“ওগো মা, / রাজার দুলাল যাবে আজি মোর / ঘরের সমুখপথে, / আজি এ প্রভাতে গৃহকাজ লয়ে / রহিব বলো কী মতে।”— রাজার দুলাল বা ঈশ্বরের আগমনের খবরে বালিকা সংসারের প্রাত্যহিক কাজ বা জাগতিক নিয়মে আর মন বসাতে পারে না। সে কী পোশাক পরবে, কীভাবে চুল (কবরী) বাঁধবে—সেই ব্যাকুলতায় সে বিভোর হয়ে থাকে। তার এই মাতামাতি দেখে তার মা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
- ক্ষণিক দর্শন ও প্রতিদানহীন প্রেম:
“আমি দাঁড়াব যেথায় বাতায়নকোণে / সে চাবে না সেথা জানি তাহা মনে– / ফেলিতে নিমেষ দেখা হবে শেষ,”— বালিকা খুব ভালো করেই জানে যে ঈশ্বর তার মতো সাধারণ কারো জানালার (বাতায়ন) দিকে তাকাবেন না। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সেই দর্শন শেষ হয়ে যাবে এবং ঈশ্বর বহু দূরে চলে যাবেন। কিন্তু এই একতরফা বা প্রতিদানহীন প্রেমে তার কোনো আক্ষেপ নেই।
- নিঃশর্ত সমর্পণ ও আত্মিক সাজ:
“তবু রাজার দুলাল যাবে আজি মোর / ঘরের সমুখপথে, / শুধু সে নিমেষ লাগি না করিয়া বেশ / রহিব বলো কী মতে।”— ঈশ্বর হয়তো ফিরেও তাকাবেন না, তবুও তিনি যে এই পথ দিয়ে যাচ্ছেন, এটাই বালিকার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় ‘শুভক্ষণ’। সেই এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজেকে বা নিজের আত্মাকে সুন্দর করে না সাজিয়ে (বেশ না করে) তার পক্ষে কোনোভাবেই শান্ত থাকা সম্ভব নয়। ঈশ্বরকে বরণ করার এই নিঃস্বার্থ প্রস্তুতিই প্রকৃত ভক্তির লক্ষণ।

