বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, স্নিগ্ধ এবং চমৎকার রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা’। এই কবিতায় শিশিরবিন্দু ও সূর্যের কাল্পনিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সসীম (মানুষ) এবং অসীমের (ঈশ্বর) সম্পর্কের এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। অসীম ঈশ্বর যে প্রেমের টানে সসীম মানুষের ক্ষুদ্র হৃদয়েও ধরা দেন, সেটিই এই কবিতার মূল উপজীব্য।
![উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা haay gafan nohile tomaare dhoribe ke ba [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2021/12/Rabindranath-Tagore-42-e1650789746334-300x211.jpg)
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক কবিতা (Allegorical, Spiritual and Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সসীম ও অসীমের মিলনের দর্শনকে নানা প্রতীকে তুলে ধরেছেন। এই কবিতায় শিশির হলো ক্ষুদ্র ও সসীম মানবাত্মার প্রতীক, আর সূর্য হলো অনন্ত ও অসীম ঈশ্বরের প্রতীক। ক্ষুদ্র শিশিরের আক্ষেপ হলো, বিশাল সূর্যকে ধারণ করার ক্ষমতা কেবল অনন্ত আকাশের (গগন) আছে। শিশিরের মতো ক্ষুদ্র প্রাণের সেই ক্ষমতা বা বল নেই। কিন্তু সূর্য তাকে আশ্বাস দিয়ে জানায় যে, সে যেমন নিজের আলোয় পুরো বিশ্বভুবন আলোকিত করতে পারে, ঠিক তেমনি সে ভালোবাসার টানে নিজেকে অত্যন্ত ছোট করেও শিশিরবিন্দুর বুকে ধরা দিতে পারে। অর্থাৎ, ঈশ্বরের বিশালত্ব কখনোই তাঁর ভক্তের ক্ষুদ্র হৃদয়ে প্রবেশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা – সম্পূর্ণ কবিতা
“হায় গগন নহিলে তোমা-রে ধরিবে কে বা
ওগো তপন তোমার স্বপন দেখি যে,করিতে পারি নে সেবা।’
শিশির কহিল কাঁদিয়া,
“তোমারে রাখি যে বাঁধিয়া
হে রবি,এমন নাহিকো আমার বল।
তোমা বিনা তাই ক্ষুদ্র জীবন কেবলি অশ্রুজল।’
“আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো,
তবু শিশিরটুকুরে ধরা দিতে পারি
বাসিতে পারি যে ভালো।’
শিশিরের বুকে আসিয়া
কহিল তপন হাসিয়া,
“ছোটো হয়ে আমি রহিব তোমারে ভরি,
তোমার ক্ষুদ্র জীবন গড়িব
হাসির মতন করি।’

Romanized Version
“Hay gogon nohile tomare dhoribe ke ba
Ogo topon tomar swopon dekhi je, korite pari ne sheba.”
Shishir kohilo knadiya,
“Tomare rakhi je bndhiya
He robi, emon nahiko amar bol.
Toma bina tai khudro jibon keboli oshrujol.”
“Ami bipul kirone bhubon kori je alo,
Tobu shishirtukure dhora dite pari
Bashite pari je bhalo.”
Shishirer buke ashiya
Kohilo topon hashiya,
“Chhoto hoye ami rohibo tomare bhori,
Tomar khudro jibon goribo
Hashir moton kori.”
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ক্ষুদ্রের আক্ষেপ ও অসহায়তা:
“হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা / ওগো তপন তোমার স্বপন দেখি যে, করিতে পারি নে সেবা। … হে রবি, এমন নাহিকো আমার বল।”— ছোট্ট শিশিরবিন্দু কাঁদতে কাঁদতে সূর্যকে বলে যে, অনন্ত আকাশ ছাড়া এত বিশাল সূর্যকে কেউ ধারণ করতে পারে না। শিশির কেবল সূর্যের স্বপ্নই দেখতে পারে, কিন্তু তাকে নিজের কাছে আটকে রেখে তার সেবা করার ক্ষমতা বা বল শিশিরের নেই। সূর্য ছাড়া শিশিরের এই ক্ষুদ্র জীবন কেবলই কান্নার (অশ্রুজল) মতো অর্থহীন। এটি মূলত ঈশ্বরের বিশালত্বের সামনে মানুষের অসহায়তা ও আক্ষেপের রূপক।
- বিশালত্বের মাঝেও ক্ষুদ্রের প্রতি ভালোবাসা:
“”আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো, / তবু শিশিরটুকুরে ধরা দিতে পারি / বাসিতে পারি যে ভালো।””— সূর্য তখন শিশিরকে উত্তর দেয় যে, সে হয়তো নিজের সুবিশাল আলো দিয়ে পুরো পৃথিবী আলোকিত করে, কিন্তু ভালোবাসার টানে সে ওইটুকু ছোট্ট শিশিরবিন্দুর বুকেও অনায়াসে ধরা দিতে পারে। অর্থাৎ, ঈশ্বর যতই অসীম বা বিশাল হোন না কেন, ভক্তের প্রেমে সাড়া দিয়ে তিনি মানুষের ক্ষুদ্র হৃদয়ে নেমে আসতে দ্বিধা করেন না।
- অসীম ও সসীমের অপূর্ব মিলন:
“শিশিরের বুকে আসিয়া / কহিল তপন হাসিয়া, / “ছোটো হয়ে আমি রহিব তোমারে ভরি, / তোমার ক্ষুদ্র জীবন গড়িব / হাসির মতন করি।””— পরিশেষে সূর্য হেসে শিশিরের বুকে নেমে আসে এবং বলে যে, সে নিজেকে ছোট করেই শিশিরের বুক কানায় কানায় পূর্ণ করে রাখবে। শিশিরের যে জীবন একটু আগে কেবলই ‘অশ্রুজল’ বা কান্নার মতো ছিল, সূর্যের স্পর্শে তা হাসির মতো উজ্জ্বল ও ঝলমলে হয়ে ওঠে। ঈশ্বরের কৃপাতেই যে মানবজীবন তার সার্থকতা ও পরম আনন্দ লাভ করে, এখানে তা অপরূপ কাব্যিক সুষমায় মূর্ত হয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে যাচাই করে আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে।
