আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থের ‘ভূমিকা’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আকাশ প্রদীপ’ (১৯৩৯) কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দার্শনিক, আত্মোপলব্ধিমূলক ও মননশীল কবিতা হলো ‘ভূমিকা’। এই কবিতায় স্মৃতির রূপায়ণ, মৃত্যুর অনিবার্য সত্যকে অতিক্রম করার মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং শিল্প-সাহিত্যের মধ্য দিয়ে অমরত্ব লাভের চঞ্চল প্রয়াস অত্যন্ত গভীর ও শিল্পসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামভূমিকা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থআকাশ প্রদীপ
প্রকাশের বছর১৯৩৯ (১৩৪৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও মননশীল গীতি-কবিতা (Philosophical and Contemplative Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থটি কবির জীবনের অন্তিম পর্বের সৃষ্টি, যেখানে স্মৃতিকাতরতা এবং অস্তিত্বের সংকট গভীরভাবে মূর্ত হয়েছে। ‘ভূমিকা’ কবিতায় কবি মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে এক ধরনের ‘ছেলেমানুষি’ বা মরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দেখেছেন। কালস্রোতে যখন মানুষের বস্তুশরীর ও জীবন ভেঙে পড়ে, তখন সে তার কল্পনার মধ্য দিয়ে, লেখার মধ্য দিয়ে একটি ‘দ্বিতীয় রূপ’ বা ছায়া তৈরি করতে চায়—যাতে মৃত্যু তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে না পারে।

ভূমিকা – সম্পূর্ণ কবিতা

স্মৃতিরে আকার দিয়ে আঁকা,

           বোধে যার চিহ্ন পড়ে ভাষায় কুড়ায়ে তারে রাখা,

                       কী অর্থ ইহার মনে ভাবি।

                                  এই দাবি

                       জীবনের এ ছেলেমানুষি,

           মরণেরে বঞ্চিবার ভান ক’রে খুশি,

                 বাঁচা-মরা খেলাটাতে জিতিবার শখ,

           তাই মন্ত্র প’ড়ে আনে কল্পনার বিচিত্র কুহক।

                 কালস্রোতে বস্তুমূর্তি ভেঙে ভেঙে পড়ে,

           আপন দ্বিতীয় রূপ প্রাণ তাই ছায়া দিয়ে গড়ে।

                 “রহিল” বলিয়া যায় অদৃশ্যের পানে;

           মৃত্যু যদি করে তার প্রতিবাদ, নাহি আসে কানে।

                 আমি বদ্ধ ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের জালে,

           আমার আপন-রচা কল্পরূপ ব্যাপ্ত দেশে কালে,

                 এ কথা বিলয়দিনে নিজে নাই জানি

           আর কেহ যদি জানে তাহারেই বাঁচা ব’লে মানি।

Amar Rabindranath Logo

 

Romanized Version

Smitire akar diye anka,
Bodhe jar chinho pore bhashay kuraye tare rakha,
Ki ortho ihar mone vabi.
Ei dabi
Jiber e chelemanushi,
Moronere bonchibar van k’re khushi,
Bacha-mora khelatate jitibar shokh,
Tai montro p’re ane kalponar bichitro kuhok.
Kalshrote bostumurti venge venge pore,
Apon ditiyo rup pran tai chhaya diye gore.
“Rohilo” boliya jay odrishyor pane;
Mrityu jodi kore tar protibad, nahi ashe kane.
Ami boddho khonosthayi ostitwer jale,
Amar apon-rocha kolporup byapto deshe kale,
E kotha biloydine nije nai jani
Ar keu jodi jane taharei bacha b’le mani.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • স্মৃতির আকার দান ও মানুষের প্রয়াস:
    “স্মৃতিরে আকার দিয়ে আঁকা, / বোধে যার চিহ্ন পড়ে ভাষায় কুড়ায়ে তারে রাখা, / কী অর্থ ইহার মনে ভাবি।”
    — মানুষের মনে জমে থাকা স্মৃতিকে লেখার ভাষায় বা রূপের আকারে ধরে রাখার আসল অর্থ কী? কবি এই প্রশ্নটি তুলেছেন মানুষের চিরন্তন সৃষ্টিশীলতার নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে।
  • মরণকে বঞ্চনার অবুঝ শখ:
    “এই দাবি / জীবনের এ ছেলেমানুষি, / মরণেরে বঞ্চিবার ভান ক’রে খুশি, / বাঁচা-মরা খেলাটাতে জিতিবার শখ,”
    — মানুষ নশ্বর জেনেও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে চায়। স্মৃতির রূপ দিয়ে শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির এই প্রয়াস আসলে মরণকে ফাঁকি দেওয়ার বা বঞ্চনা করার এক অপূর্ব ছেলেমানুষি খেলা, যেখানে মানুষ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকতে চায়।
  • কল্পনার দ্বিতীয় রূপ ও অস্তিত্বের বিস্তার:
    “কালস্রোতে বস্তুমূর্তি ভেঙে ভেঙে পড়ে, / আপন দ্বিতীয় রূপ প্রাণ তাই ছায়া দিয়ে গড়ে। / “রহিল” বলিয়া যায় অদৃশ্যের পানে;”
    — কালস্রোতের নিয়মে একদিন মানুষের শরীর ও সমস্ত বস্তু ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু প্রাণের আকুতি তার ছায়া দিয়ে বা সৃষ্টির মাধ্যমে এক ‘দ্বিতীয় রূপ’ বা অমরত্ব তৈরি করে যায়, যা জগতের উদ্দেশ্যে বলে যায়—”আমি রইলুম”।
  • অন্যের মনে বেঁচে থাকার সার্থকতা:
    “আমি বদ্ধ ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের জালে, / আমার আপন-রচা কল্পরূপ ব্যাপ্ত দেশে কালে, / এ কথা বিলয়দিনে নিজে নাই জানি / আর কেহ যদি জানে তাহারেই বাঁচা ব’লে মানি।”
    — কবি নিজে তো ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের জালে বন্দী, মৃত্যুর পর তাঁর নিজের পক্ষে তা আর জানার উপায় থাকে না যে তাঁর সৃষ্টি কতটা টিকে রইল। কিন্তু তাঁর গড়া সেই কল্পরূপ বা সৃষ্টি যদি অন্য কোনো মানুষের মনে বেঁচে থাকে এবং কেউ যদি তা মনে রাখে, তবে সেটাই প্রকৃত বেঁচে থাকা বলে কবি মনে করেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আকাশ প্রদীপ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত