আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

যখন ভাঙল মিলন মেলা , প্রেম ২৮২ | Jokhon vhanglo milon mela

Table of Content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর প্রেম পর্যায়ের (গান নং ২৮২) অন্তর্ভুক্ত এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও বেদনাবিধুর রবীন্দ্রসংগীত “যখন ভাঙল মিলন-মেলা”। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ) গানটি রচিত হয়। বিচ্ছেদের পর মানুষের মনের ভেতরে অবচেতনভাবে জমা হয়ে থাকা সুপ্ত যন্ত্রণা এবং সময়ের ব্যবধানে ভুলে যাওয়ার ছদ্মাবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন ভালোবাসাই এই গানের মূল উপজীব্য। রবীন্দ্রসংগীতের বিরহ ধারায় এই গানটি ভালোবাসার স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং আকস্মিক পুনর্মিলনের এক অনন্য কাব্যিক ও সংগীততাত্ত্বিক দলিল।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামযখন ভাঙল মিলন-মেলা
গীতিকার / রচয়িতারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুরকাররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পর্যায়প্রেম (গান নং ২৮২)
উপ-পর্যায়প্রেমবৈচিত্র্য / বিরহ
রাগভৈরবী
তালকাহারবা (৪/৪ ছন্দ)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)১ বৈশাখ, ১৩৩১
রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ)১৯২৪ (১৪ এপ্রিল)
গ্রন্থ / সংকলনগীতবিতান (প্রেম পর্যায়), স্বরবিতান

সম্পূর্ণ বাংলা লিরিক

যখন ভাঙল মিলন-মেলা
ভেবেছিলুম ভুলব না আর চক্ষের জল ফেলা ॥
দিনে দিনে পথের ধুলায় মালা হতে ফুল ঝরে যায়–
জানি নে তো কখন এল বিস্মরণের বেলা ॥
দিনে দিনে কঠিন হল কখন বুকের তল–
ভেবেছিলেম ঝরবে না আর আমার চোখের জল।
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে, কান্না তখন থামে না যে–
ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রুজলের খেলা ॥

Romanized Bengali Lyrics

Jokhon bhanglo milon-mela
Bhebechilum bhulbo na ar chokkher jol fela.
Dine dine pother dhulay mala hote ful jhore jay–
Jani ne to kokhon elo bishmoroner বেলা.
Dine dine kothin holo kokhon buker tol–
Bhebechilem jhorbe na ar amar chokher jol.
Hotat dekha pother majhe, kanna tokhon thame na je–
Bholar tole tole chilo oshrujoler khela.

গানের মূল ভাব

“যখন ভাঙল মিলন-মেলা” গানটি মানুষের মনের সুপ্ত আবেগ ও অবচেতন অনুভূতির এক বিস্ময়কর বিশ্লেষণ। সম্পর্কের বিচ্ছেদের প্রাথমিক ধাক্কায় মানুষ মনে করে তার দুঃখ কখনো শেষ হবে না। কিন্তু কালপ্রবাহে জীবনের দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও অভ্যাসের টানে সেই তীব্র অনুভূতির ওপর বিস্মৃতির আস্তরণ পড়ে। মানুষ ভুলবশত ধরে নেয় সে অতীতকে পেছনে ফেলে এসে পাষাণ হৃদয়ে পরিণত হয়েছে।
গানের মূল বার্তা হলো—মন থেকে স্মৃতি মুছে যাওয়া আর মনকে জোর করে ভুলিয়ে রাখা এক বিষয় নয়। হঠাৎ কোনো একদিন অপ্রস্তুত মুহূর্তে প্রিয়জনের মুখোমুখি হলে ভালোবাসার সেই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি আবার জেগে ওঠে। তথাকথিত বিস্মৃতির আড়ালে যে প্রতিনিয়ত অশ্রুজলের খেলা চলেছে, তা আকস্মিক সাক্ষাতে বাঁধ ভাঙা কান্নার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. বিচ্ছেদ ও ক্ষণিকের দৃঢ়তা

  • “যখন ভাঙল মিলন-মেলা / ভেবেছিলুম ভুলব না আর চক্ষের জল ফেলা ॥”
    ‘মিলন-মেলা’ শব্দটির মাধ্যমে প্রেম ও সান্নিধ্যের উৎসবকে বোঝানো হয়েছে। মেলা শেষ হলে যেমন শূন্যতা নেমে আসে, সম্পর্কের সমাপ্তিতেও তেমনই এক চরম একাকীত্ব তৈরি হয়। বিচ্ছেদের মুহূর্তে মানুষ ভাবে এই কান্না হয়তো সারাজীবনের সঙ্গী হতে চলেছে।

২. সময়ের প্রভাবে বিস্মৃতি

  • “দিনে দিনে পথের ধুলায় মালা হতে ফুল ঝরে যায়– / জানি নে তো কখন এল বিস্মরণের বেলা ॥”
    এখানে ‘স্মৃতির মালা’ থেকে একেকটি ফুল ধুলায় ঝরে পড়ার মাধ্যমে সময়ের সাথে স্মৃতির ধূসর হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ অসচেতনভাবেই অতীতকে ভুলতে শুরু করে; ঠিক কোন মুহূর্তে যে দুঃখের জায়গায় এক ধরণের উদাসীন বিস্মৃতি এসে দাঁড়ায়, তা মানুষ নিজেও টের পায় না।

৩. কৃত্রিম কঠোরতা ও ছদ্মাবরণ

  • “দিনে দিনে কঠিন হল কখন বুকের তল– / ভেবেছিলেম ঝরবে না আর আমার চোখের জল।”
    দুঃখ পেতে পেতে মানুষের হৃদয় একসময় অনুভূতিহীন বা ‘কঠিন’ রূপ ধারণ করে। ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনে ধরে নেয় সে শোককে জয় করেছে এবং তার আর কোনোদিন কান্না আসবে না। এটি বস্তুত আত্মপ্রতারণারই একটি রূপ।

৪. অবচেতনের প্রকাশ ও পুনর্মিলনের অভিঘাত

  • “হঠাৎ দেখা পথের মাঝে, কান্না তখন থামে না যে– / ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রুজলের খেলা ॥”
    অপ্রত্যাশিত স্থানে বা পথের মাঝে প্রিয়জনের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া গানের নাটकीय মোড় এনে দেয়। যে কান্না স্তব্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল, তা অবাধ্য হয়ে ভেসে ওঠে। তখন মানুষ বুঝতে পারে, বাহ্যিক বিস্মৃতি ছিল নিছকই একটি মুখশ; মনের গভীরে বা অবচেতনে ভালোবাসার নদীটি শুকিয়ে যায়নি, বরং গোপনে প্রবহমান ছিল।

গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

  • প্রতীক ও রূপক ব্যবহার: গানে ব্যবহৃত ‘মিলন-মেলা’, ‘পথের ধুলা’, এবং ‘স্মৃতির মালা’—প্রতিটি রূপক সম্পর্কের প্রারম্ভ, স্থায়িত্ব ও ক্ষয়িষ্ণুতাকে উপস্থাপন করে।

  • মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা: রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ করা। ‘ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রুজলের খেলা’ চরণটি আধুনিক মনস্তত্ত্বের অবচেতন মনের (Subconscious Mind) ধারণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

  • সহজ শব্দবিন্যাস: প্রাঞ্জল ভাষার চরণে গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলা এই গানের অন্যতম সাহিত্যিক শক্তি।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  • রাগ ভৈরবীর প্রভাব: গানটি ‘ভৈরবী’ রাগে নিবদ্ধ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে ভৈরবী হলো বৈরাগ্য, করুণ রসাশ্রিত অনুভূতি এবং সার্বিক সমর্পণের রাগ। বিচ্ছেদের বিষাদ ও স্মৃতির আবেশ ফুটিয়ে তুলতে ভৈরবীর কোমল স্বরগুলোর প্রয়োগ এখানে অত্যন্ত সার্থক।
  • তাল কাহারবা: ৪।৪ ছন্দের ‘কাহারবা’ তালের প্রবহমান লয় চরণের সাথে দারুণভাবে মানানসই। তালের গতিশীলতা জীবনের প্রাত্যহিক পথচলা ও সময়ের বয়ে যাওয়াকে নির্দেশ করে।

রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল ১৯২৪) গানটি রচিত হয়। ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন হওয়ার কারণে এই দিনে পুরানো দিনের ক্ষয়, স্মৃতি ও নতুনকে বরণ করে নেওয়ার যে সার্বিক ঐতিহ্য রয়েছে, তার এক ধরণের দার্শনিক প্রতিফলন এই গানে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতের প্রেম ও বিচ্ছেদ পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে আত্মপর্যালোচনামূলক এই গানটি আধুনিক যুগেও শিল্পী ও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে আবেদনময়ী।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. গীতবিতান (প্রেম পর্যায়, গান নং ২৮২), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
  2. স্বরবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
  3. রবীন্দ্রসংগীত অভিধান, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী।
  4. Tagoreweb Digital Archive, বিশ্বভারতী স্বীকৃত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার।

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত