আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী , প্রেম পর্যায়, ২৩৫ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেম পর্বের এক অনন্যসাধারণ, আত্মত্যাগোদ্ভাসিত ও বৈপ্লবিক সৃষ্টি “আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী”। প্রেমমূলক গানে রবীন্দ্র-ভাবনা কোনো সহজিয়া বা প্রচলিত সামাজিক সংস্কারের পথে হাঁটে না; বরং তা দার্শনিক গভীরতায় পুষ্ট এক অবিনাশী রূপ ধারণ করে। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-ভাবের সাথে আত্মিক সংযোগ ঘটিয়ে কবি এখানে সামাজিক লোকনিন্দা, শুচিতার অহংকার এবং যাবতীয় বিধিবিধানের বন্ধন ছিন্ন করে ভালোবাসার জন্য নির্দ্বিধায় কলঙ্ককে বরণ করে নেওয়ার পরম প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সমাজ যাকে ‘পঙ্ক’ বা কলঙ্ক বলে দূরে ঠেলে দেয়, খাঁটি অনুরাগের স্পর্শে তা-ই যে বক্ষে ধারণ করার মতো অমূল্য ধন হয়ে ওঠে—গানটি সেই চরম আত্মনিবেদনের এক চিরন্তন দলিল।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
শিরোনামআমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী
পর্যায়প্রেম পর্যায় (গান সংখ্যা: ২৩৫)
উপ-পর্যায়প্রেম-বৈচিত্র্য
রাগভৈরবী
তালদাদরা (ছয় মাত্রা)
রচনাকাল (বঙ্গাব্দ)১৩১৭ বঙ্গাব্দ
রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ)১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ
স্বরলিপিকারসাহানা দেবী
আকর গ্রন্থগীতবিতান (প্রেম পর্যায়) ও স্বরবিতান
মূল উপজীব্যনিঃশর্ত সমর্পণ, লোকনিন্দাকে অলংকার জ্ঞান করা, সংস্কারমুক্তি ও পরম অনুরাগ

আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী | Ami tomar preme hobo sobar lyrics :

আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।
আমি সকল দাগে হব দাগি॥

তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন, যেথা তোমার ধুলার শয়ন
সেথা আঁচল পাতব আমার তোমার রাগে অনুরাগী॥

আমি শুচি-আসন টেনে টেনে বেড়াব না বিধান মেনে,
যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি॥

Ami Tomar Preme Hobo Sobar Kolonkobhagi — Romanized Version

Ami tomar preme hobo sobar kolonkobhagi।
Ami sokol dage hobo dagi॥

Tomar pother kanta korbo chayon, jetha tomar dhular shayon
setha anchol patbo amar tomar rage onuragi॥

Ami shuchi-ason tene tene berabo na bidhan mene,
je panke oi charan pore tahari chhap bokshe magi॥

 

আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী

গানের মূল ভাব

“আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী” গানটির মূল নির্যাস হলো ভালোবাসার পবিত্রতা রক্ষার্থে যেকোনো আত্মবিসর্জন ও সামাজিক অপবাদকে সানন্দে বরণ করে নেওয়ার মানসিকতা। প্রচলিত সমাজ যাকে সম্মান বা শুচিতা বলে দাবি করে, অনেক সময় তা কৃত্রিম আচার ও সংকীর্ণ বিধানের দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রকৃত প্রেম কোনো সামাজিক নিয়মের পরোয়া করে না।
বৈষ্ণব দর্শনে রাধার যে আত্মবিলোপী আকুতি—শ্রীকৃষ্ণের জন্য সমগ্র ব্রজধামের অপবাদ ও কলঙ্ককে ভূষণ মনে করা—রবীন্দ্রনাথ সেই মরমি দর্শনকে আধুনিক ভাবায় রূপ দিয়েছেন। ভালোবাসার মানুষের জন্য ধুলোয় আঁচল পাতা, পথের কাঁটা নিজ হাতে সরিয়ে দেওয়া এবং শুচিতার মেকি আসন পরিহার করে প্রিয়জনের পদধূলিযুক্ত কাদা-মাটিকে অন্তরে স্থান দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রেমের এক পরম রূপকাশ্রয়ী ও আধ্যাত্মিক সত্য উন্মোচিত হয়েছে।
AmarRabindranath.com Logo 252x68 px Dark আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী , প্রেম পর্যায়, ২৩৫ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. সামাজিক কলঙ্কের বরণডালা

  • “আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী / আমি সকল দাগে হব দাগি…”
    গানটির সূচনাই এক সাহসী উচ্চারণ দিয়ে। তথাকথিত সামাজিক বিশুদ্ধতার চেয়ে প্রেমের সত্য অনেক উঁচুতে। প্রিয়জনের ভালোবাসার কারণে যদি সমাজ ‘কলঙ্ক’ বা ‘দাগ’ লেপন করে, তবে সেই দাগকেই প্রেমিক শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হিসেবে বক্ষে ধারণ করতে প্রস্তুত।

২. কণ্টক দূরীকরণ ও ধুলার শয্যা

  • “তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন, যেথা তোমার ধুলার শয়ন / সেথা আঁচল পাতব আমার তোমার রাগে অনুরাগী…”
    নিঃস্বার্থ সেবার পরাকাষ্ঠা। প্রেমাস্পদের চলার পথকে মসৃণ করতে নিজের হাতে কাঁটা তোলা এবং যেখানে প্রিয়জন ধুলায় আসন নেবে, সেখানে নিজের স্নিগ্ধ আঁচল বিছিয়ে দেওয়ার সংকল্প প্রকাশ করে যে, প্রিয়তমের দুঃখের অংশীদার হওয়াই প্রেমের পরম সার্থকতা।

৩. কৃত্রিম শুচিতার প্রত্যাখ্যান ও পঙ্কের মহিমা

  • “আমি শুচি-আসন টেনে টেনে বেড়াব না বিধান মেনে / যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি…”
    সামাজিক ভণ্ডামি ও আচারসর্বস্ব ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ। আচারনিষ্ঠ মানুষ পবিত্রতার নামে আলাদা ‘শুচি-আসন’ পেতে দূরত্ব বজায় রাখে; কিন্তু প্রেমিক সেই কৃত্রিম শুচিতা মানতে নারাজ। প্রেমাস্পদের চরণস্পর্শে যে কাদা বা পঙ্ক পবিত্র হয়ে উঠেছে, সেই ধূলি-কাদার চিহ্ন নিজ বক্ষে ধারণ করাই তার কাছে পরম আশীর্বাদ।

বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

প্রেমের এই পথে কোনো বাহ্যিক নিরাপত্তা বা সামাজিক আশ্রয় নেই। চারপাশের চিরচেনা সমাজ ও স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে তীব্র আঘাত, তা এখানে এক অনিবার্য সত্য। দৃষ্টির সামনে কোনো জাগতিক স্বীকৃতির আশা থাকে না; আশাহীন নয়নে শুধু থাকে প্রিয়জনের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্পণ। এই নিঃসঙ্গ যাত্রায় বাহ্যিক জগতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রেমিক নিজের অন্তর্জগতে প্রিয়তমের সাথে একাকার হয়ে যায়, যেখানে লোকলজ্জার ভয় চিরতরে বিলীন।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • বৈষ্ণব ভাবধারার নবজন্ম: রাধার অপবাদ বরণের চিরন্তন পদাবলী রসকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কাব্যিক রূপ দিয়েছেন, যেখানে ভক্তি ও পার্থিব প্রেমের ভেদরেখা মুছে যায়।
  • তীব্র বৈপরীত্যের অলংকার (Antithesis): ‘শুচি-আসন’ বনাম ‘ধুলার শয়ন’ এবং ‘বিধান’ বনাম ‘পঙ্ক’—এই পরস্পরবিরোধী রূপকের মধ্য দিয়ে ভণ্ড শুচিতার বিরুদ্ধে খাঁটি ভালোবাসার জয়গান গাওয়া হয়েছে।
  • দাদরা তালের স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ: ছয় মাত্রার দাদরা তালের দোলা গানটির বাণীর বলিষ্ঠতাকে এক ধরনের সাবলীল নৃত্যময়তা ও সংকল্পবদ্ধ রূপ দিয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • ভৈরবী রাগের সর্বজনীন আবেদন: গানটিতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বশ্রেষ্ঠ আর্তিপ্রধান রাগ ‘ভৈরবী’-র আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ভৈরবীর করুণ ও নিবেদিত সুর চরণের ভেতরের ত্যাগ ও নিঃশর্ত ভালোবাসার গভীরতাকে শ্রোতার হৃদয়ে প্রগাঢ়ভাবে পৌঁছে দেয়।
  • সাহানা দেবীর স্বরলিপি: প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সাহানা দেবীর করা স্বরলিপিতে গানটির রাগাঙ্গ গাম্ভীর্য ও আর্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। সুরের মৃদু তান ও মীড়ের ব্যবহার গানটিকে এক অপূর্ব প্রার্থনাগীতির রূপ দেয়।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯১০ সালে (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) গানটি যখন রচিত হয়, তখন কবির জীবনে গীতাঞ্জলি পর্বের গভীর আত্মিক রূপান্তর চলছিল। এই পর্বে রচিত প্রেম পর্যায়ের গানগুলো কেবল মানব-মানবীর সাধারণ প্রেমের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা পরমাত্মার সাথে আত্মার মিলনের রূপক হিসেবেও এক গভীর রূপ পরিগ্রহ করেছে।
  • সাহানা দেবী (১৮৯৭–১৯৯০): রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ও বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসংগীতের প্রাচীন ও বিশুদ্ধ ধারা সংরক্ষণে তাঁর স্বরলিপি ও কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী” বাংলা সংগীত সাহিত্যের এমন একটি অনন্য সৃষ্টি, যা সামাজিক সংস্কার, জাতিভেদ এবং মেকি শুচিবায়ুগ্রস্ততার মূলে আঘাত হানে। স্বার্থহীন ভালোবাসা ও আদর্শের জন্য সবরকম লাঞ্ছনা মাথা পেতে নেওয়ার এই বার্তা মানবচেতনাকে উন্নত করে। ফলে রবীন্দ্রসংগীতের আসরে ও ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে এটি আত্মশুদ্ধি ও অকৃত্রিম নিষ্ঠার গান হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত।

AmarRabindranath.com Logo 252x68 px White আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী , প্রেম পর্যায়, ২৩৫ | রবীন্দ্রসঙ্গীত

উৎস ও তথ্যসূত্র

  • গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
  • স্বরবিতান (৩৭তম খণ্ড), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
  • রবীন্দ্র-জীবনী ও রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

 

Share

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, প্রাবন্ধিক, চিত্রকর, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় পরিচিত।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প *গল্পগুচ্ছ* এবং ১,৯১৫টি গান *গীতবিতান* সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলি ৩২ খণ্ডে *রবীন্দ্র রচনাবলী* নামে সংকলিত হয়েছে। তাঁর পত্রসাহিত্যও *চিঠিপত্র* নামে ১৯ খণ্ডে এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি চিত্রকলাতেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন; তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে *গীতাঞ্জলি* কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

https://amarrabindranath.com/

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত