বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি চমৎকার প্রকৃতি ও পুরাণ-আশ্রিত কবিতা হলো ‘হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা’। এই কবিতায় কবি সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালাকে শিব ও পার্বতীর (হরগৌরী) অভিন্ন রূপ বা মিলিত সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যেখানে প্রকৃতির কঠিন ও কোমল রূপের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামহে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থউৎসর্গ
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রকৃতি ও পৌরাণিক রূপকধর্মী কবিতা (Nature and Mythological Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রকৃতি, ঈশ্বর ও মানবমনের এক গভীর আধ্যাত্মিক যোগসূত্রের কথা বলেছেন। ‘হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা’ কবিতায় কালিদাসের ‘কুমারসম্ভবম্’-এর প্রথম শ্লোকের (অস্ত্যুত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নগাধিরাজঃ) সুরের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। কবি হিমালয়কে শিব ও পার্বতীর মিলিত রূপ হিসেবে দেখেছেন। হিমালয়ের তুষারাবৃত, রিক্ত, কঠিন ও স্তব্ধ রূপটি হলো ধ্যানে মগ্ন শিব বা পশুপতি। আর তাকে ঘিরে থাকা শ্যামল বনানী, চঞ্চল ঝরনা, ফুল ও মেঘের খেলা হলো পার্বতীর লীলা বা মাধুর্য। এই কঠিন ও কোমলের মিলনেই হিমালয় পূর্ণতা পেয়েছে।

 

হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা – সম্পূর্ণ কবিতা

হে হি-মাদ্রি, দেবতা-ত্মা, শৈলে শৈলে আজিও তোমার

অভেদাঙ্গ হরগৌরী আপনারে যেন বারম্বার

শৃঙ্গে শৃঙ্গে বিস্তারিয়া ধরিছেন বিচিত্র মুরতি।

ওই হেরি ধ্যানাসনে নিত্যকাল স্তব্ধ পশুপতি,

দুর্গম দুঃসহ মৌন– জটাপুঞ্জতুষারসংঘাত

নিঃশব্দে গ্রহণ করে উদয়াস্তরবিরশ্মিপাত

পূজাস্বর্ণপদ্মদল। কঠিনপ্রস্তরকলেবর

মহান্‌-দরিদ্র, রিক্ত, আভরণহীন দিগম্বর,

হেরো তাঁরে অঙ্গে অঙ্গে এ কী লীলা করেছে বেষ্টন–

মৌনেরে ঘিরেছে গান, স্তব্ধেরে করেছে আলিঙ্গন

সফেন চঞ্চল নৃত্য, রিক্ত কঠিনেরে ওই চুমে

কোমল শ্যামলশোভা নিত্যনব পল্লবে কুসুমে

ছায়ারৌদ্রে মেঘের খেলায়। গিরিশেরে রয়েছেন ঘিরি

পার্বতী মাধুরীচ্ছবি তব শৈলগৃহে হিমগিরি।

 

Amar Rabindranath Logo

 

Romanized Version

He himadri, debotatma, shoile shoile ajio tomar
Obhedanggo horogouri aponare jeno barombar
Shringge shringge bistariya dhorichhen bichitro muroti.
Oi heri dhyanashone nityokal stobdho poshupoti,
Durgom dusshoho mouno– jotapunjotusharshongghat
Nishshobde grohon kore udoyastorobi-roshmipat
Pujashwornopodmodol. Kothinprostorokolebor
Mohan doridro, rikto, abhoronhin digombor,
Hero tnnare ongge ongge e ki lila korechhe beshton–
Mounere ghirechhe gan, stobdhere korechhe alinggon
Shophen chonchol nrityo, rikto kothinere oi chume
Komol shyamolshobha nityonobo pollobe kushume
Chhayaroudre megher khelay. Girishere royechhen ghiri
Parboti madhurichchhobi tobo shoilogrihe himogiri.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • হরগৌরীর মিলিত রূপ:
    “হে হিমাদ্রি, দেবতাত্মা, শৈলে শৈলে আজিও তোমার / অভেদাঙ্গ হরগৌরী আপনারে যেন বারম্বার / শৃঙ্গে শৃঙ্গে বিস্তারিয়া ধরিছেন বিচিত্র মুরতি।”
    — কবি হিমালয়ের প্রতিটি পাহাড় ও শৃঙ্গকে শিব (হর) ও পার্বতীর (গৌরী) অভিন্ন রূপ হিসেবে কল্পনা করেছেন। হিমালয় যেন এই দুই দেবতার বিচিত্র মূর্তিরই এক মহাজাগতিক প্রকাশ।
  • ধ্যানমগ্ন শিবের রূপ (কঠিন প্রকৃতি):
    “দুর্গম দুঃসহ মৌন– জটাপুঞ্জতুষারসংঘাত… কঠিনপ্রস্তরকলেবর / মহান্‌ দরিদ্র, রিক্ত, আভরণহীন দিগম্বর,”
    — হিমালয়ের দুর্গম, নিঃশব্দ, তুষারাবৃত ও কঠিন পাথরের রূপটিকে কবি ধ্যানমগ্ন শিব বা ‘পশুপতি’-র সাথে তুলনা করেছেন। উদয় ও অস্তগামী সূর্যের আলো যখন বরফের ওপর পড়ে, তা যেন শিবের তুষারশুভ্র জটায় পূজার স্বর্ণপদ্মের মতো শোভা পায়। তিনি রিক্ত, অলংকারহীন ও দিগম্বর।
  • পার্বতীর মাধুর্যময় লীলা (কোমল প্রকৃতি):
    “মৌনেরে ঘিরেছে গান, স্তব্ধেরে করেছে আলিঙ্গন / সফেন চঞ্চল নৃত্য, রিক্ত কঠিনেরে ওই চুমে / কোমল শ্যামলশোভা…”
    — শিবের এই স্তব্ধ ও কঠিন রূপকে ঘিরে আছে পার্বতীর অপরূপ মাধুর্য। হিমালয়ের ঝরনার গান, চঞ্চল স্রোতের নৃত্য, কোমল সবুজ বনানী, ফুল এবং মেঘের ছায়া-রৌদ্রের খেলা—এ সবই হলো পার্বতীর রূপ, যা রিক্ত ও কঠিন গিরিশকে (শিবকে) চিরকাল কোমল আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে।

 

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘হি-মাদ্রি’, ‘দেবতা-ত্মা’ শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেন পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন