কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের চিঠি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মিষ্টি, কৌতুকপূর্ণ ও ঘরোয়া লিরিক কবিতা হলো ‘চিঠি’। গঙ্গার বুকে ‘রাজহংস’ স্টিমারে বসে স্নেহাস্পদ ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে (ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু) উদ্দেশ করে লেখা এই কবিতায় কবি কলকাতার শহুরে খবর ও ব্যস্ততার প্রতি তাঁর অনীহা এবং এক দুষ্টু-মিষ্টি মেয়ের সাথে তাঁর খুনসুটি ও ঝগড়ার এক মনোরম চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামচিঠি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকড়ি ও কোমল
কবিতার ধরনকৌতুকপূর্ণ ও ঘরোয়া লিরিক কবিতা (Playful and Intimate Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যুবক বয়সের সৃজনশীল উচ্ছ্বাস ও সৌন্দর্যচেতনার এক অপূর্ব নিদর্শন। এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘চিঠি’ কবিতায় কবি ব্যক্তিগত জীবনের একটি পারিবারিক ও ঘরোয়া আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন। গঙ্গার বুকে স্টিমারে ভ্রমণকালে ইন্দিরা দেবীকে লেখা এই চিঠির ছলে কবি খবরের কাগজ বা পার্থিব খবরের প্রতি নিজের উদাসীনতা এবং এক বুদ্ধিমতী ও জেদি তরুণীর (যিনি ইন্দিরা দেবী নিজেই) সাথে তাঁর নিত্যদিনের মিষ্টি ঝগড়া ও ভালোবাসার সম্পর্কের এক চমৎকার কৌতুকপূর্ণ চিত্র এঁকেছেন।

চিঠি – সম্পূর্ণ কবিতা

শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু
স্টীমার “রাজহংস’ । গঙ্গা
চিঠি লিখব কথা ছিল,
দেখছি সেটা ভারি শক্ত।
তেমন যদি খবর থাকে
লিখতে পারি তক্ত তক্ত।
খবর বয়ে বেড়ায় ঘুরে
খবরওয়ালা ঝাঁকা-মুটে।
আমি বাপু ভাবের ভক্ত
বেড়াই নাকো খবর খুঁটে।
এত ধুলো, এত খবর
কলকাতাটার গলিতে!
নাকে চোকে খবর ঢোকে
দু-চার কদম চলিতে।
এত খবর সয় না আমার
মরি আমি হাঁপোষে।
ঘরে এসেই খবরগুলো
মুছে ফেলি পাপোষে।
আমাকে তো জানই বাছা!
আমি একজন খেয়ালি।
কথাগুলো যা বলি, তার
অধিকাংশই হেঁয়ালি।
আমার যত খবর আসে
ভোরের বেলা পুব দিয়ে।
পেটের কথা তুলি আমি
পেটের মধ্যে ডুব দিয়ে।
আকাশ ঘিরে জাল ফেলে
তারা ধরাই ব্যাবসা।
থাক্‌ গে তোমার পাটের হাটে
মথুর কুণ্ডু শিবু সা।
কল্পতরুর তলায় থাকি
নই গো আমি খবুরে।
হাঁ করিয়ে চেয়ে আছি
মেওয়া ফলে সবুরে।
তবে যদি নেহাত কর
খবর নিয়ে টানাটানি।
আমি বাপু একটি কেবল
দুষ্টু মেয়ের খবর জানি!
দুষ্টুমি তার শোনো যদি
অবাক হবে সত্যি!
এত বড়ো বড়ো কথা তার
মুখখানি একরত্তি।
মনে মনে জানেন তিনি
ভারি মস্ত লোকটা।
লোকের সঙ্গে না-হক কেবল
ঝগড়া করবার ঝোঁকটা।
আমার সঙ্গেই যত বিবাদ
কথায় কথায় আড়ি।
এর নাম কি ভদ্র ব্যাভার!
বড্ড বাড়াবাড়ি।
মনে করেছি তার সঙ্গে
কথাবার্তা বন্দ করি।
প্রতিজ্ঞা থাকে না পাছে
সেইটে ভারি সন্দ করি।
সে না হলে সকাল বেলায়
চামেলি কি ফুটবে!
সে নইলে কি সন্ধে বেলায়
সন্ধেতারা উঠবে।
সে না হলে দিনটা ফাঁকি
আগাগোড়াই মস্কারা।
পোড়ারমুখী জানে সেটা
তাই এত তার আস্কারা।
চুড়ি-পরা হাত দুখানি
কতই জানে ফন্দি।
কোনোমতে তার সাথে তাই
করে আছি সন্ধি।
নাম যদি তার জিগেস কর
নামটি বলা হবে না।
কী জানি সে শোনে যদি
প্রাণটি আমার রবে না।
নামের খবর কে রাখে তার
ডাকি তারে যা খুশি।
দুষ্টু বলো, দস্যি বলো,
পোড়ারমুখী, রাক্ষুসী!
বাপ মায়ে যে নাম দিয়েছে
বাপ মায়েরি থাক্‌ সে।
ছিষ্টি খুঁজে মিষ্টি নামটি
তুলে রাখুন বাক্সে!
এক জনেতে নাম রাখবে
অন্নপ্রাশনে।
বিশ্বসুদ্ধ সে নাম নেবে
বিষম শাসন এ!
নিজের মনের মত সবাই
রুক নামকরণ।
বাবা ডাকুন “চন্দ্রকুমার’
খুড়ো “রামচরণ’!
ধার-করা নাম নেব আমি
হবে না তো সিটি।
জানই আমার সকল কাজে
Originality।
ঘরের মেয়ে তার কি সাজে
সঙস্কৃত নাম।
এতে কেবল বেড়ে ওঠে
অভিধানের দাম।
আমি বাপু ডেকে বসি
যেটা মুখে আসে,
যারে ডাকি সেই তা বোঝে
আর সকলে হাসে!
দুষ্টু মেয়ের দুষ্টুমি– তায়
কোথায় দেব দাঁড়ি!
অকূল পাথার দেখে শেষে
কলমের হাল ছাড়ি!
শোনো বাছা, সত্যি কথা
বলি তোমার কাছে–
ত্রিজগতে তেমন মেয়ে
একটি কেবল আছে!
বর্ণিমেটা কারো সঙ্গে
মিলে পাছে যায়–
তুমুল ব্যাপার উঠবে বেধে
হবে বিষম দায়!
হপ্তাখানেক বকাবকি
ঝগড়াঝাঁটির পালা,
একটু চিঠি লিখে, শেষে
প্রাণটা ঝালাফালা।
আমি বাপু ভালোমানুষ
মুখে নেইকো রা।
ঘরের কোণে বসে বসে
গোঁফে দিচ্ছি তা।
আমি যত গোলে পড়ি
শুনি নানান বাক্যি।
খোঁড়ার পা যে খানায় পড়ে
আমিই তাহার সাক্ষী।
আমি কারো নাম করি নি
তবু ভয়ে মরি।
তুই পাছে নিস গায়ে পেতে
সেইটো বড়ো ডরি!
কথা একটা উঠলে মনে
ভারি তোরা জ্বালাস।
আমি বাপু আগে থাকতে
বলে হলুম খালাস!

চিঠি Romanized Version

Srimoti Indira Pranadhikashu
Steamer “Rajhangsho” . Gonga

Chithi likhbo kotha chhilo,
Dekchhi sheta bhari shokto.
Temon jodi khobor thake
Likhte pari tokto tokto.
Khobor boye beray ghure
Khoborwala jhaka-mute.
Ami bapu bhaber bhokto
Beray nako khobor khute.
Eto dhulo, eto khobor
Kolkata-tar golite!
Nake choke khobor dhoke
Du-char kodom cholite.
Eto khobor soya na amar
Mori ami hanpose.
Ghore esei khobor-gulo
Mushe feli papose.
Amake to janai bacha!
Ami ekjon kheyali.
Kothagulo ja boli, tar
Odhonshoi hetyali.
Amar joto khobor ashe
Vhorer belay pub diye.
Peter kotha tuli ami
Peter modhye dub diye.
Akash ghire jal fele
Tara dhorai byabsha.
Thak ge tomar pather hate
Mothor Kundu Shibu Sa.
Kolpotorur tolay thaki
Noi go ami khobure.
Ha koriye cheye achhi
Mewa fole shobure.
Tobe jodi nehat koro
Khobor niye tanatani.
Ami bapu ekti kebol
Dushtu meyer khobor jani!
Dushtumi tar shono joni
Obak hobe shotyi!
Eto boro boro kotha tar
Mukhkhani ekrotti.
Mone mone janen tini
Bhari mosto lokta.
Loker shonge na-hok kebol
Jhogra korbar jhokta.
Amar shongei joto bibad
Kothay kothay ari.
Er nam ki bhodro byabhar!
Boddo barabari.
Mone korechhi tar shonge
Kothabarta bondho kori.
Protigja thake na pache
Sheite bhari shondo kori.
Se na hole shokal belay
Chameli ki futebe?
Se noile ki shondhe belay
Shondhetara uthbe.
Se na hole dinta fanki
Agagoray moskara.
Porarmukhi jane sheta
Tai eto tar askara.
Churi-pora hath dukhani
Kotoi jane fondi.
Konomote tar shathe tai
Kore achhi shondhi.
Nam jodi tar jigesh koro
Namti bola hobe na.
Ki jani se shone jodi
Pranti amar robe na.
Namer khobor ke rakhe tar
Daki tare ja khushi.
Dushtu bolo, doshyi bolo,
Porarmukhi, rakkhushi!
Bap maye je nam diyeche
Bap mayeri thak se.
Chhishti khuje mishti namti
Tule rakhun bakse!
Ek jonete nam rakhbe
Onnoprashone.
Bishvoshuddho se nam nebe
Bishom shashon e!
Nijer moner moto sobai
Koruk namkoron.
Baba dakun “Chondrokumar”
Khuro “Ramchoron”!
Dhar-kora nam nebo ami
Hobe na to city.
Janai amar shokol kaje
Originality.
Gorer meye tar ki shaje
Songskrito nam.
Ete kebol bere othe
Ovhidhaner dam.
Ami bapu deke boshi
Jeta mukhe ashe,
Yare daki shei ta bojhe
Ar shokole hase!
Dushtu meyer dushtumi– tay
Kothay debo danri!
Okul pathar dekhe shese
Kolomer hal chhari!
Shono bacha, shotyi kotha
Boli tomar kachhe–
Trijogote temon meye
Ekti kebol ache!
Bornimeta karo shonge
Mile pache jay–
Tumul byapar uthbe bedhe
Hobe bishom day!
Hoptakhanek bokaboki
Jhograjhatir pala,
Ektu chithi likhe, shese
Pranta jhalafala.
Ami bapu bhalomanush
Mukhe neiko ra.
Gorer kone bose bose
Gonfe dichchhi ta.
Ami joto gole pori
Shuni nanan bakyi.
Khorar pa je khanay pore
Ami-i tahar sakshi.
Ami karo nam kori ni
Tobu bhoye mori.
Tui pache nis gaye pete
Sheito boro dori!
Kotha ekta uthle mone
Bhari tora jwalas.
Ami bapu age thakte
Bole holum khalas!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • খবরের প্রতি উদাসীনতা ও খেয়ালি মন: কবি পার্থিব জগতের হইচই, শহরের ধুলোবালি এবং খবরের কাগজের অতিরিক্ত তথ্যের চেয়ে অন্তরের ভাব ও খেয়ালকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেন।
  • দুষ্টু মেয়ের সাথে খুনসুটি ও ঝগড়া: এই কবিতার মূল আকর্ষণ হলো এক দুষ্টু ও জেদি তরুণীর (ইন্দিরা দেবী) সাথে কবির নিত্যদিনের খুনসুটি, কথা কাটাকাটি এবং ঝগড়া না করলে দিন অর্থহীন হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।
  • নাম নিয়ে কৌতুক: তরুণীর আসল নাম লুকিয়ে রেখে তাকে নানা আদুরে বা ব্যঙ্গাত্মক নামে ডাকার মধ্যে পারিবারিক স্নেহের এক মধুর ও হালকা চালের সম্পর্ক ফুটে উঠেছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন