কণিকা কাব্যগ্রন্থের কর্তব্যগ্রহণ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অনুপ্রেরণামূলক একটি কবিতা হলো ‘কর্তব্য-গ্রহণ’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি দায়িত্ববোধ, ক্ষুদ্রের মহত্ত্ব এবং নিজ সাধ্য অনুযায়ী বিশ্বের কল্যাণে অবদান রাখার এক অসামান্য বার্তা তুলে ধরেছেন। বিদায়ী সূর্যের আহ্বানে ক্ষুদ্র মাটির প্রদীপের সাড়াদানের এই রূপক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করতে বিশাল ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, বরং আন্তরিক ইচ্ছাই যথেষ্ট।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামকর্তব্য-গ্রহণ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরনরূপক ও প্রেরণাদায়ক কবিতা (Allegorical and Motivational Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই যেন বিন্দুতে সিন্ধুর দর্শন। ‘কর্তব্য-গ্রহণ’ কবিতায় কবি মহৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও বৃহতের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। অস্তগামী সূর্য যখন পৃথিবীকে আলোকিত করার দায়িত্ব দিয়ে যেতে চায়, তখন বিশাল জগৎ স্তব্ধ হয়ে থাকে। কিন্তু একটি সামান্য মাটির প্রদীপ নিজের সীমিত ক্ষমতা নিয়েই সেই বিরাট দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে। এটি মূলত মানবসমাজের সেইসব নিঃস্বার্থ মানুষের প্রতীক, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েই সমাজের অন্ধকার দূর করতে সচেষ্ট হন।

কর্তব্য-গ্রহণ – সম্পূর্ণ কবিতা

কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি।
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।

কর্তব্য-গ্রহণ Romanized Version

Ke loibe mor karjo, kohe shondhyarobi.
Shuniya jogot rohe niruttor chobi.
Matir prodip chhilo, she kohilo, shami,
Amar jetuku shaddho koribo ta ami.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রূপক ও তাৎপর্য: কবিতায় ‘সন্ধ্যারবি’ বা অস্তগামী সূর্য হলো কোনো মহান ব্যক্তি বা বৃহৎ শক্তির প্রতীক, যিনি সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে জগৎকে আলোকিত করেছেন। অন্যদিকে ‘মাটির প্রদীপ’ হলো সাধারণ কিন্তু সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষের প্রতীক, যার ক্ষমতা সীমিত কিন্তু ইচ্ছা প্রবল।
  • বিশাল জগতের নীরবতা: সূর্য যখন তার প্রস্থানের সময় নিজের অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানায়, তখন বিশাল জগৎ বা প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে থাকে (“নিরুত্তর ছবি”)। এটি প্রমাণ করে যে, বড় কোনো কাজ বা দায়িত্ব নেওয়ার সাহস সবার থাকে না; বিশালতা বা আকার অনেক সময় নিষ্ক্রিয়তারও জন্ম দেয়।
  • ক্ষুদ্রের মহত্ত্ব ও দায়িত্ববোধ: নীরব জগতের মাঝে একটি অতি ক্ষুদ্র মাটির প্রদীপ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সাড়া দেয়। সে তার সাধ্যের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন, তবুও সে সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর অন্ধকার দূর করার জন্য নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যটুকু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত।
  • “আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।”
    — এই চরণটির মাধ্যমে কবি এক পরম শিক্ষা দিয়েছেন। পৃথিবীর বিশাল অন্ধকারের তুলনায় নিজের ক্ষমতা হয়তো খুবই সামান্য, কিন্তু তাই বলে ভয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। প্রত্যেকের উচিত নিজের অবস্থান থেকে সাধ্যমতো অবদান রাখা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দিয়েই একসময় চারপাশের অন্ধকার দূর করা সম্ভব।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন