কথা কাব্যগ্রন্থের প্রতিনিধি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক ও আত্মত্যাগের বর্ণনামূলক কবিতা হলো ‘প্রতিনিধি’। মারাঠি গাথার ওপর ভিত্তি করে রচিত এই কবিতায় ছত্রপতি শিবাজি এবং তাঁর গুরু সমর্থ রামদাসের ঐতিহাসিক ও রূপক কাহিনীর মধ্য দিয়ে রাজ্যত্যাগ, অহংকার বিসর্জন এবং প্রকৃত রাজধর্মের এক গভীর দর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামপ্রতিনিধি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকথা
কবিতার ধরনঐতিহাসিক ও দার্শনিক আখ্যানকবিতা (Historical and Philosophical Narrative Poem)

পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

অ্যাক্‌ওয়ার্থ্‌ সাহেবের মারাঠি গাথার ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থের ভূমিকা থেকে সংগৃহীত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এই কবিতাটি রচিত হয়েছে। মারাঠা বীর শিবাজির গেরুয়া পতাকা ইতিহাসে ‘ভগোয়া ঝেণ্ডা’ নামে খ্যাত। কবিতায় দেখা যায়, সর্বজয়ী রাজা শিবাজি একদিন তাঁর গুরু রামদাসকে ভিক্ষা করতে দেখে বিস্মিত হন এবং গুরুর চরণে নিজের সমস্ত রাজ্য সঁপে দেন। এরপর গুরু ও শিষ্য একসঙ্গে ভিক্ষা করে রাজ্যত্যাগের এবং গুরুর প্রতিনিধিরূপে রাজ্য চালনার দীক্ষা নেন।

প্রতিনিধি – সম্পূর্ণ কবিতা

অ্যাক্‌ওয়ার্থ্‌ সাহেব কয়েকটি মারাঠি গাথার যে ইংরাজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন তাহারই ভূমিকা হইতে বর্ণিত ঘটনা গৃহীত। শিবাজির গেরুয়া পতাকা “ভগোয়া ঝেণ্ডা’ নামে খ্যাত।

 

বসিয়া প্রভাতকালে                সেতারার দুর্গভালে

          শিবাজি হেরিলা এক দিন–

রামদাস গুরু তাঁর                 ভিক্ষা মাগি দ্বার দ্বার

          ফিরিছেন যেন অন্নহীন।

ভাবিলা, এ কী এ কাণ্ড!          গুরুজির ভিক্ষাভাণ্ড–

          ঘরে যাঁর নাই দৈন্যলেশ!

সব যাঁর হস্তগত,                   রাজ্যেশ্বর পদানত,

          তাঁরো নাই বাসনার শেষ!

এ কেবল দিনে রাত্রে              জল ঢেলে ফুটা পাত্রে

          বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে।

কহিলা, “দেখিতে হবে           কতখানি দিলে তবে

          ভিক্ষাঝুলি ভরে একেবারে।’

তখনি লেখনী আনি                কী লিখি দিলা কী জানি,

          বালাজিরে কহিলা ডাকায়ে,

“গুরু যবে ভিক্ষা-আশে            আসিবেন দুর্গ-পাশে

          এই লিপি দিয়ো তাঁর পায়ে।’

গুরু চলেছেন গেয়ে,               সম্মুখে চলেছে ধেয়ে

          কত পান্থ কত অশ্বরথ!–

“হে ভবেশ, হে শংকর,             সবারে দিয়েছ ঘর,

          আমারে দিয়েছ শুধু পথ।

অন্নপূর্ণা মা আমার                 লয়েছে বিশ্বের ভার,

          সুখে আছে সর্ব চরাচর–

মোরে তুমি, হে ভিখারি,          মার কাছ হতে কাড়ি

          করেছ আপন অনুচর।’

সমাপন করি গান                  সারিয়া মধ্যাহ্নস্নান

          দুর্গদ্বারে আসিয়া যখন–

বালাজি নমিয়া তাঁরে              দাঁড়াইল এক ধারে

          পদমূলে রাখিয়া লিখন।

গুরু কৌতূহলভরে                 তুলিয়া লইলা করে,

          পড়িয়া দেখিলা পত্রখানি–

বন্দি তাঁর পাদপদ্ম                 শিবাজি সঁপিছে অদ্য

          তাঁরে নিজরাজ্য-রাজধানী।

পরদিনে রামদাস                  গেলেন রাজার পাশ,

          কহিলেন, “পুত্র, কহো শুনি,

রাজ্য যদি মোরে দেবে            কী কাজে লাগিবে এবে–

          কোন্‌ গুণ আছে তব গুণী?’

“তোমারি দাসত্বে প্রাণ             আনন্দে করিব দান’

          শিবাজি কহিলা নমি তাঁরে।

গুরু কহে, “এই ঝুলি              লহ তবে স্কন্ধে তুলি,

          চলো আজি ভিক্ষা করিবারে।’

শিবাজি গুরুর সাথে               ভিক্ষাপাত্র লয়ে হাতে

          ফিরিলে পুরদ্বারে-দ্বারে।

নৃপে হেরি ছেলেমেয়ে            ভয়ে ঘরে যায় ধেয়ে,

          ডেকে আনে পিতারে মাতারে।

অতুল ঐশ্বর্যে রত,                তাঁর ভিখারির ব্রত!

          এ যে দেখি জলে ভাসে শিলা!

ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে,          হস্ত কাঁপে থরেথরে,

          ভাবে ইহা মহতের লীলা।

দুর্গে দ্বিপ্রহর বাজে,                ক্ষান্ত দিয়া কর্মকাজে

          বিশ্রাম করিছে পুরবাসী।

একতারে দিয়ে তান               রামদাস গাহে গান

          আনন্দে নয়নজলে ভাসি,

“ওহে ত্রিভুবনপতি,                বুঝি না তোমার মতি,

          কিছুই অভাব তব নাহি–

হৃদয়ে হৃদয়ে তবু                  ভিক্ষা মাগি ফির, প্রভু,

          সবার সর্বস্বধন চাহি।’

অবশেষে দিবসান্তে                নগরের এক প্রান্তে

          নদীকূলে সন্ধ্যাস্নান সারি–

ভিক্ষা-অন্ন রাঁধি সুখে             গুরু কিছু দিলা মুখে,

          প্রসাদ পাইল শিষ্য তাঁরি।

রাজা তবে কহে হাসি,           “নৃপতির গর্ব নাশি

          করিয়াছ পথের ভিক্ষুক–

প্রস্তুত রয়েছে দাস,                আরো কিবা অভিলাষ–

          গুরু-কাছে লব গুরু দুখ।’

গুরু কহে, “তবে শোন্‌,করিলি কঠিন পণ,

          অনুরূপ নিতে হবে ভার–

এই আমি দিনু কয়ে               মোর নামে মোর হয়ে

          রাজ্য তুমি লহ পুনর্বার।

তোমারে করিল বিধি              ভিক্ষুকের প্রতিনিধি,

          রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন।

পালিবে যে রাজধর্ম                জেনো তাহা মোর কর্ম,

          রাজ্য লয়ে রবে রাজ্যহীন।’

“বৎস, তবে এই লহো            মোর আশীর্বাদসহ

          আমার গেরুয়া গাত্রবাস–

বৈরাগীর উত্তরীয়                  পতাকা করিয়া নিয়ো’

          কহিলেন গুরু রামদাস।

নৃপশিষ্য নতশিরে                 বসি রহে নদীতীরে,

          চিন্তারাশি ঘনায়ে ললাটে।

থামিল রাখালবেণু,                গোঠে ফিরে গেল ধেনু,

          পরপারে সূর্য গেল পাটে।

পূরবীতে ধরি তান                 একমনে রচি গান

          গাহিতে লাগিলা রামদাস,

“আমারে রাজার সাজে   বসায়ে সংসারমাঝে

          কে তুমি আড়ালে কর বাস!

হে রাজা, রেখেছি আনি তোমারি পাদুকাখানি,

          আমি থাকি পাদপীঠতলে–

সন্ধ্যা হয়ে এল ওই,              আর কত বসে রই!

          তব রাজ্যে তুমি এসো চলে।’

Protinidhi Kobitar Roman Version

Boshiya provatkale setarar durgbhale
Shibaji herila ek din–
Ramdas guru tar bhikha magi dwar dwar
firi_chen jeno onnohin.
Bhabila, e ki e kando! gurujir bhikhabhando–
ghore jar nai doinolesh!
Shob jar hostogto, rajyessor podnot,
taro nai bashnar shesh!
E kebol dine ratre jol dhele futa patre
britha chesta trishna mitabare.
Kohila, “dekhi_be hobe kotkhani dile tobe
bhikhajhuli bhore ekbare.’
Tokhoni lekhoni ani ki likhi dila ki jani,
balajire kohila dakaye,
“Guru jobe bhikha_ashe asiben durg_pashe
ei lipi diyo tar paye.’
Guru cholechen geye, sommukhe choleche dheye
koto panth koto oshoroth!–
“He bhovesh, he shonkor, sobare diyecho ghor,
amare diyecho shudhu poth.
Onnopurna ma amar loyechhe bishwer bhar,
sukhe ache shorbo chorachor–
More tumi, he bhikhari, mar kach hote kari
korecho apon onuchor.’
Somapon kori gan sariya modhyanhosnan
durgdware ashiya jokhon–
Allaji nomiya tare darailo ek dhare
podmule rakhiya likhon.
Guru kouthuholovore tuliya loyila kore,
poriya dekhila potrkhani–
Bondi tar padpodmo Shibaji shonpiche odyo
tare nizrajyo-rajdhani.
Poridine Ramdas gelen rajar pash,
kohilen, “putro, koho shuni,
Rajyo jodi more debe ki kaje lagibe ebe–
kon gun ache tobo guni?’
“Tomari dasstye pran anonde koribo dan’
Shibaji kohila nomi tare.
Guru kohe, “ei jhuli loh tobe skondhe tuli,
cholo aji bhikha koribare.’
Shibaji guruh shathe bhikhapatro loye hate
firile purdware-dware.
Nrupe heri chelemeye bhoye ghore jay dheye,
deke ane pitare matare.
Otul oishorjo roto, tar bhikhari-r broto!
e je dekhi jole bhase shila!
Bhikha dey lojja-bhore, hosto kape thore-thore,
bhabe iha mohoter lila.
Durge diprohor baje, kshanto diya kormokaje
bishram koriche purbasi.
Ektare diye tan Ramdas gahe gan
anonde noyonzole bhasi,
“Ohe tribhubonpoti, bujhi na tomar moti,
kichhui obhab tobo nahi–
Hridoye hridoye tobu bhikha magi firo, probhu,
sobar sorboshodhon chahi.’
Oboshese dibosante nogorer ek pronnte
nodikule shondhyasnan shari–
Bhikha-onno radhi sukhe guru kichhu dila mukhe,
prosad payil shishyo tari.
Raja tobe kohe hashi, “nriputir gorbo nashi
korechho pother bhikhuk–
Prostut royechhe das, aro kiba obhilash–
guru-kashe lobo guru dukh.’
Guru kohe, “tobe shon, korili kothin pon,
onurup nite hobe bhar–
E amru dinu koye mor name mor hoye
rajyo tumi loho punorbar.
Tomare korilo bidhi bhikhuker protinidhi,
rajyessor din udashin.
Paliibe je rajdhormo jeno taha mor kormo,
rajyo loye robe rajyohin.’
“Vatsa, tobe ei loho mor ashirbad-shoh
amar geruya gatrobas–
Bairagir uttoriyo potaka koriya niyo’
kohilen guru Ramdas.
Nruposhishyo notoshire bosi rohe noditire,
chintarashi ghonaye lolate.
Thamil rakhalbenu, gothe fire gelo dhenu,
porpare surjo gelo pate.
Purobite dhori tan ekmone rochi gan
gahite lagila Ramdas,
“Amare rajar saje bosaye shongshar-majhe
ke tumi adale korobas!
He raja, rekhechi ani tomari padukakhani,
ami thaki padpithotole–
Shondhya hoye elo oi, ar koto bose roi!
tobo rajye tumi eso chole.’

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • ত্যাগ ও অহংকার মুক্তি: শিবাজি ভেবেছিলেন গুরুর হয়তো বাসনার শেষ নেই, তাই রাজ্য দান করে গুরুর মোহমুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন। কিন্তু গুরু সেই রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে তাকেই ‘ভিক্ষুকের প্রতিনিধি’ বানিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে প্রকৃত রাজা হলেন সেই যিনি ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত।
  • রাজধর্ম ও বৈরাগ্য: “তোমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি, / রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন।”—ক্ষমতা বা সিংহাসনে বসেও নির্মোহ থেকে প্রজাপালন করা এবং সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে গুরুর আদর্শে জীবন পরিচালনা করাই এই কবিতার মূল বার্তা।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কথা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন