কর্মফল কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ক্ষণিকা [ ১৯০০ ]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চমৎকার রসাত্মক এবং হালকা মেজাজের কাব্যগ্রন্থ ‘ক্ষণিকা’-র একটি দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ও হাস্যোদ্দীপক কবিতা হলো এই ‘কর্মফল’। সাধারণত হিন্দু ধর্মে বা দর্শনে ‘কর্মফল’ বলতে আমরা বুঝি এই জন্মের ভালো-মন্দ কাজের ফল পরের জন্মে ভোগ করা। কিন্তু কবিগুরু এই চেনা গম্ভীর তত্ত্বটিকে এক্কেবারে উল্টে দিয়ে নিজের লেখক জীবন এবং সমকালীন সাহিত্য সমালোচকদের নিয়ে এক দারুণ মজার ও ব্যঙ্গাত্মক রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবি এখানে মজা করে কল্পনা করছেন, যদি পুনর্জন্ম বা পরজন্ম আসলেই সত্যি হয়, তবে এই জন্মে তিনি যে গদ্য আর পদ্যের পাহাড় জমিয়েছেন, সেই ‘পাপের’ শাস্তি পেতে তাঁকে আবার এই বাংলার বুকেই ফিরে আসতে হবে। আর শাস্তিটা কী? শাস্তিটা হলো, পরের জন্মে এসে তাঁকে নিজের এই জন্মের লেখাগুলোরই কঠোর সমালোচনা করতে হবে! কবি ভাবছেন, পরের জন্মে নিজের বই হাতে পেলে তিনি নিজেই রেগে আগুন হয়ে পৃষ্ঠা ধরে ধরে পুড়িয়ে ফেলবেন। নিজের লেখাকে নিজেই কড়া ভাষায় গালি দিয়ে বলবেন—”এসব কী পুরোনো জিনিস! আগাগোড়া সব চুরি করা লেখা, এমন তো আমিও ঝুড়ি ঝুড়ি লিখতে পারি!”

কবিতার পরের অংশে কবি তাঁর সমকালীন সমালোচকদের নিয়ে আরও মজার এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তিনি বলছেন, এই জন্মে যে সমালোচকেরা তাঁর লেখার নিন্দা করে তাঁর কান লাল করে দিচ্ছেন, পরের জন্মে যদি তাঁরা তাঁর পক্ষে কথা বলতে আসেন—তবে ঘটবে এক অদ্ভুত কাণ্ড। তখন কবি নিজেই নিজের লেখার কড়া সমালোচনা করবেন, আর পুরোনো সমালোচকেরা উল্টো কবির পক্ষ নিয়ে কবির করা সমালোচনার প্রতিবাদ করতে বসবেন! কবি নিজের লেখা বইকে বলবেন “হংস-মধ্যে বকো যথা” (অর্থাৎ হাঁসের দলে বকের মতো বেমানান), আর সেই পুরোনো সমালোচক তখন রেগেমেগে কবিকেই বলবেন পাষণ্ড আর মিথ্যাবাদী!

রবীন্দ্রনাথের এই ‘কর্মফল’ কবিতাটি আমাদের দেখায় যে, নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে কতটা নির্মেদভাবে হাসাহাসি করা যায় এবং নিজেকে কতটা সহজভাবে নেওয়া যায়। গম্ভীর তত্ত্বের আড়ালে সমকালীন সাহিত্যচর্চা, সমালোচকদের স্বভাব আর নিজের লেখকসত্তাকে নিয়ে এমন চমৎকার ও বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা সত্যিই অতুলনীয়।

কর্মফল কবিতা (Kormophol Kobita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পরজন্ম সত্য হলে

            কী ঘটে মোর সেটা জানি–

আবার আমায় টানবে ঘরে

            বাংলাদেশের এ রাজধানী।

গদ্য পদ্য লিখনু ফেঁদে,

তারাই আমায় আনবে বেঁধে,

অনেক লেখায় অনেক পাতক,

            সে মহাপাপ করবে মোচন–

                        আমায় হয়তো করতে হবে

                             আমার লেখা সমালোচন।

ততদিনে দৈবে যদি

            পক্ষপাতী পাঠক থাকে

কর্ণ হবে রক্তবর্ণ

            এমনি কটু বলব তাকে।

যে বইখানি পড়বে হাতে

দগ্ধ করব পাতে পাতে,

আমার ভাগ্যে হব আমি

            দ্বিতীয় এক ধূম্রলোচন–

                        আমায় হয়তো করতে হবে

                             আমার লেখা সমালোচন।

বলব,”এ-সব কী পুরাতন!

            আগাগোড়া ঠেকছে চুরি।

মনে হচ্ছে, আমিও এমন

            লিখতে পারি ঝুড়ি ঝুড়ি।’

আরো যে-সব লিখব কথা

ভাবতে মনে বাজছে ব্যথা,

পরজন্মের নিষ্ঠুরতায়

            এ জন্মে হয় অনুশোচন–

                        আমায় হয়তো করতে হবে

                             আমার লেখা সমালোচন।

তোমরা, যাঁদের বাক্য হয় না

            আমার পক্ষে মুখরোচক

তোমরা যদি পুনর্জন্মে

            হও পুনর্বার সমালোচক–

আমি আমায় পাড়ব গালি,

তোমরা তখন ভাববে খালি

কলম ক’ষে ব’সে ব’সে

            প্রতিবাদের প্রতি বচন।

                        আমায় হয়তো করতে হবে

                             আমার লেখা সমালোচন।

লিখব, ইনি কবিসভায়

            হংসমধ্যে বকো যথা!

তুমি লিখবে, কোন্‌ পাষণ্ড

            বলে এমন মিথ্যা কথা!

আমি তোমায় বলব–মূঢ়,

তুমি আমায় বলবে–রূঢ়,

তার পরে যা লেখালেখি

            হবে না সে রুচিরোচন।

                        তুমি লিখবে কড়া জবাব,

                             আমি কড়া সমালোচন।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন