রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কেবল পঞ্জিকার একটি তারিখ নয়, এটি সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে এক চিরন্তন উৎসবের নাম। তবে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটিতে কবি নিজের জন্মদিনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। এখানে জন্মদিন নিছক বয়স বাড়ার হিসাব নয়, বরং এটি হলো জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেওয়ার এক শাশ্বত আহ্বান। কবিতাটি পড়তে পড়তে আপনি অনুভব করবেন কীভাবে একজন পরিণত কবি প্রকৃতির রুদ্ররূপের মাঝে নিজের আত্মিক নবজাগরণের সুর খুঁজে পেয়েছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | পঁচিশে বৈশাখ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ |
| সাহিত্যিক পর্ব | বলাকা পর্ব |
| কবিতার ধরন | আত্মজৈবনিক ও দার্শনিক |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যজীবনের ‘বলাকা পর্ব’ এক প্রবল গতিবাদ ও যৌবনের বন্দনায় মুখরিত। এই পর্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ। জীবনের প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও কবির মনে যে এক অনন্ত যৌবনের তৃষ্ণা এবং নবজন্মের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটি কবির নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রচিত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের মন অনেক সময় জীর্ণতা ও অভ্যাসের দাসে পরিণত হয়। কিন্তু বিশ্বকবি চেয়েছেন সেই ধূলায় মলিন জীর্ণতাকে সরিয়ে নিজের সত্তাকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করতে। বৈশাখের রুদ্র ও প্রখর প্রকৃতির মাঝেই তিনি নিজের সেই আত্মিক উন্মোচনের রূপটি প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর কাছে জন্মদিন মানে হলো ভস্ম থেকে দীপ্ত হুতাশনের মতো জেগে ওঠা।
পঁচিশে বৈশাখ – সম্পূর্ণ কবিতা
রাত্রি হল ভোর।
আজি মোর
জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,
প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি
হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।
দিগন্তে আরক্ত রবি;
অরণ্যের ম্লান ছায়া বাজে যেন বিষণ্ন ভৈরবী।
শাল-তাল-শিরীষের মিলিত মর্মরে
বনান্তের ধ্যান ভঙ্গ করে।
রক্তপথ শুষ্ক মাঠে,
যেন তিলকের রেখা সন্ন্যাসীর উদার ললাটে।
এই দিন বৎসরে বৎসরে
নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর ‘পরে–
আতাম্র আম্রের বনে ক্ষণে ক্ষণে সাড়া দিয়ে,
তরুণ তালের গুচ্ছে নাড়া দিয়ে,
মধ্যদিনে অকস্মাৎ শুষ্কপত্রে তাড়া দিয়ে,
কখনো বা আপনারে ছাড়া দিয়ে
কালবৈশাখীর মত্ত মেঘে
বন্ধহীন বেগে।
আর সে একান্তে আসে
মোর পাশে
পীত উত্তরীয়তলে লয়ে মোর প্রাণদেবতার
স্বহস্তে সজ্জিত উপহার–
নীলকান্ত আকাশের থালা,
তারি ‘পরে ভুবনের উচ্ছলিত সুধার পিয়ালা।
এই দিন এল আজ প্রাতে
যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,
তাহার নির্ঘোষ বাজে
ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।
জন্ম-মরণের
দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,
সে আজি মিলাল।
শুভ্র আলো
কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে
শূন্য দিল ভরে।
আলোকের অসীম সংগীতে
চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।
উদয়-দিক্প্রান্ত-তলে নেমে এসে
শান্ত হেসে
এই দিন বলে আজি মোর কানে,
“অম্লান নূতন হয়ে অসংখ্যের মাঝখানে
একদিন তুমি এসেছিলে
এ নিখিলে
নবমল্লিকার গন্ধে,
সপ্তপর্ণ-পল্লবের পবনহিল্লোল-দোল-ছন্দে,
শ্যামলের বুকে,
নির্নিমেষ নীলিমার নয়নসম্মুখে।
সেই-যে নূতন তুমি,
তোমারে ললাট চুমি
এসেছি জাগাতে
বৈশাখের উদ্দীপ্ত প্রভাতে।
“হে নূতন,
দেখা দিক্ আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।
আচ্ছন্ন করেছে তারে আজি
শীর্ণ নিমেষের যত ধূলিকীর্ণ জীর্ণ পত্ররাজি।
মনে রেখো, হে নবীন,
তোমার প্রথম জন্মদিন
ক্ষয়হীন —
যেমন প্রথম জন্ম নির্ঝরের প্রতি পলে পলে;
তরঙ্গে তরঙ্গে সিন্ধু যেমন উছলে
প্রতিক্ষণে
প্রথম জীবনে।
হে নূতন,
হোক তব জাগরণ
ভস্ম হতে দীপ্ত হুতাশন।
“হে নূতন,
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্ঘাটন
সূর্যের মতন।
বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি
শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি–
সেই মতো, হে নূতন,
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।’
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।
পঁচিশে বৈশাখ Romanized Version
Ratri holo bhor.
Aji mor
Jonmer shoronpurno bani,
Provater roudre-lekha lipikhani
Hate kore ani
Dware ashi dilo dak
Pochishe boishakh.
Digonte arokto robi;
Oronner mlan chhaya baje jeno bishonno bhoirobi.
Shal-tal-shirisher milito mormore
Bonanter dhyan bhongo kore.
Roktopoth shushko mathe,
Jeno tiloker rekha shonnashir udar lolate.
Ei din botsore botsore
Nana beshe phire ashe dhoronir ‘pore–
Atamro amrer bone kkhone kkhone shara diye,
Torun taler gucche nara diye,
Moddhodine okosshat shushkopotre tara diye,
Kokhono ba aponare chara diye
Kalboishakhir motto meghe
Bondhohin bege.
Ar she ekante ashe
Mor pashe
Pito uttoriotole loye mor prandebotar
Swohoste shojjito upohar–
Nilkanto akasher thala,
Tari ‘pore bhuboner uccholito shudhar piyala.
Ei din elo aj prate
Je ononto shomudrer shonkho niye hate,
Tahar nirghosh baje
Ghono ghono mor bokkhomajhe.
Jonmo-moroner
Digboloy-chokrorekha jibonere diyechilo gher,
She aji milalo.
Shuvro alo
Kaler bashori hote ucchhosi jeno re
Shunno dilo bhore.
Aloker oshim shongite
Chitto mor jhongkariche shure shure ronito tontrite.
Udoy-dikpranto-tole neme eshe
Shanto heshe
Ei din bole aji mor kane,
“Omlan nuton hoye oshongkher majhkhan
Ekdin tumi eshechile
E nikhile
Nobomollikar gondhe,
Soptoporno-pollober pobonhillol-dol-chonde,
Shyamoler buke,
Nirnimesh nilimar noyonshommukhe.
Shei-je nuton tumi,
Tomare lolat chumi
Eshechi jagate
Boishakher uddipto provate.
“He nuton,
Dekha dik arbar jonmer prothom shubhokkhon.
Acchonno koreche tare aji
Shirno nimesher joto dhulikirno jirno potroraji.
Mone rekho, he nobin,
Tomar prothom jonmodin
Kkhoyhin —
Jemon prothom jonmo nirjhorer proti pole pole;
Toronge toronge shindhu jemon uchhole
Protikkhone
Prothom jibone.
He nuton,
Hok tobo jagoron
Voshmo hote dipto hutashon.
“He nuton,
Tomar prokash hok kujjhotika kori udghaton
Shurjer moton.
Boshonter joydhwoja dhori
Shunno shakhe kisholoy muhurte oronno dey vori–
Shei moto, he nuton,
Riktotar bokkho vedi aponare koro unmochon.
Byakto hok jiboner joy,
Byakto hok toma-majhe ononter oklanto bishmoy.’
Udoydigonte oi shuvro shonkho baje.
Mor chittomajhe
Chiro-nutonere dilo dak
Pochishe boishakh.
কবিতার মূল ভাব ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
প্রকৃতির রূপ ও জন্মদিনের আবহ: কবিতার শুরুতেই আমরা বৈশাখ মাসের এক রুদ্র-সুন্দর সকালের চিত্র পাই। শুষ্ক মাঠ যেন সন্ন্যাসীর কপালের রক্তিম তিলক, আর শাল-তাল-শিরীষের পাতায় বয়ে চলা হাওয়া যেন অরণ্যের ধ্যান ভাঙিয়ে দেয়। এই শুষ্কতা ও রুক্ষতার মাঝেই কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো এক প্রবল শক্তি নিয়ে ২৫শে বৈশাখ ফিরে আসে।
অনন্ত যৌবন ও নবজাগরণের ডাক: কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো নিজেকে “নূতন” বা চিরনবীন হিসেবে আবিষ্কার করার আহ্বান। কবি বলেছেন, বয়সের ভারে বা অভ্যাসের ধুলায় আমাদের জীবনের প্রথম জন্মদিনের সেই উজ্জ্বলতা যেন ঢেকে গেছে (“শীর্ণ নিমেষের যত ধূলিকীর্ণ জীর্ণ পত্ররাজি”)। তিনি নিজের ভেতরের সেই সত্তাকে ডাক দিয়েছেন, যেন সে কুয়াশা ভেদ করে ওঠা সূর্যের মতো এবং বসন্তের কিশলয়ের মতো সমস্ত রিক্ততা ভেদ করে নিজেকে উন্মোচিত করে।
মৃত্যুচেতনার বিলুপ্তি: জন্ম-মৃত্যুর যে সীমারেখা জীবনকে ঘিরে রেখেছিল, ২৫শে বৈশাখের এই উপলব্ধির সকালে তা যেন মিলিয়ে গেছে। শাশ্বত কালের বাঁশি থেকে উচ্ছ্বসিত হওয়া আলোয় কবির চিত্ত আজ পূর্ণ।
দার্শনিক বার্তা: “হে নূতন, দেখা দিক্ আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ” — এই চরণটিতেই নিহিত আছে কবিতার মূল দর্শন। জন্ম কেবল একবার হয় না; মানুষের চৈতন্য, তার সৃষ্টিশীলতা এবং তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রতিনিয়ত ভস্ম থেকে দীপ্ত আগুনের মতো নতুন করে জেগে উঠতে হয়।
এই কবিতাটি আমাদেরকে শেখায় যে, বার্ধক্য কেবল শরীরের হয়, কিন্তু মানুষের ভেতরের “অক্লান্ত বিস্ময়” আর “চির-নূতন” সত্তার কোনো ক্ষয় নেই।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং আনুষঙ্গিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে। কবিতাটির ভাবগাম্ভীর্য ও ছন্দপতন রোধ করতে মূল পাণ্ডুলিপির যতিচিহ্নগুলো অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।
