বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূজা পর্বের এক নিবিড়, ধ্যানমগ্ন ও মরমি উপাসনাগীতি “কোথা হতে বাজে প্রেমবেদনা রে”। ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার মধুর সম্পর্কের পটভূমিতে রচিত এই গানটিতে অন্তরের সুপ্ত প্রেমবেদনাকে পরমাত্মার আগমনের পূর্বলক্ষণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। হৃদয়ের নিভৃত অন্ধকারে যখন এক অলৌকিক আর্তি ও মধুর ব্যাকুলতা জেগে ওঠে, তখনই ভক্ত উপলব্ধি করে যে তার চিরন্তন ‘সখা’ বা ‘প্রিয়তম’ অন্তরের অঙ্গনে পদার্পণ করছেন। সমস্ত আধ্যাত্মিক দৈন্য ও মোহ দূর করে অন্তরে ভক্তির আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে সেই পরম সত্তাকে আহ্বান করার এক অনুপম সুরময় আরতি এই সৃষ্টি।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | কোথা হতে বাজে প্রেমবেদনা রে |
| পর্যায় | পূজা পর্যায় (গান সংখ্যা: ৪৩১) |
| উপ-পর্যায় | বিরহ ও মিলন / সখা |
| রাগ | দেশ |
| তাল | ত্রিতাল (১৬ মাত্রা: ৪+৪+৪+৪) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১৩১৫ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| আকর গ্রন্থ | গীতবিতান (পূজা পর্যায়) ও স্বরবিতান |
| মূল উপজীব্য | অতীন্দ্রিয় প্রেমবেদনা, পরম বন্ধুর আগমনবার্তা, আধ্যাত্মিক জাগরণ ও পূর্ণ সমর্পণ |
কোথা হতে বাজে প্রেমবেদনা রে :
কোথা হতে বাজে প্রেমবেদনা রে!
ধীরে ধীরে বুঝি অন্ধকারঘন
হৃদয়-অঙ্গনে আসে সখা মম ॥
সকল দৈন্য তব দূর করো ওরে,
জাগো সুখে ওরে প্রাণ।
সকল প্রদীপ তব জ্বালো রে, জ্বালো রে–
ডাকো আকুল স্বরে “এসো হে প্রিয়তম’ ॥
Kotha Hote Baje Prembedona Re
Kotha hote baje prembedona re!
Dhire dhire bujhi andhokar
ghan Hriday-anganey ashe sokha momo ॥
Sokol dainya tobo dur koro ore,
Jago sukhe ore pran।
Sokol prodip tobo jwalo re, jwalo re—
Dako akul swore “Eso he priyatama” ॥
গানের মূল ভাব
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. অচিন প্রেমবেদনার জাগরণ ও সখার পদধ্বনি
- “কোথা হতে বাজে প্রেমবেদনা রে! ধীরে ধীরে বুঝি অন্ধকারঘন হৃদয়-অঙ্গনে আসে সখা মম…”গানটির সূচনা এক অপার্থিব বিস্ময় ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। হৃদয়ের গভীরে হঠাৎ বেজে ওঠা মিষ্টি সুর জানান দেয় যে, দীর্ঘদিনের অন্ধকার পেরিয়ে অন্তরের নিভৃত প্রাঙ্গণে পরম বন্ধু বা সখা নিঃশব্দে উপস্থিত হচ্ছেন।
২. দৈন্যমোচন ও আনন্দের পুনর্জাগরণ
- “সকল দৈন্য তব দূর করো ওরে, জাগো সুখে ওরে প্রাণ…”আত্মার প্রতি আত্মসম্বোধন। পরমেশ্বরের আগমনে হীনমন্যতা, পাপবোধ ও পার্থিব অভাবের সমস্ত দৈন্য তুচ্ছ হয়ে যায়। ভক্ত তার প্রাণকে সমস্ত শোক ভুলে পরম আনন্দে উদ্বেলিত হতে নির্দেশ দেয়।
৩. আলোকের অভিষেক ও ব্যাকুল সমর্পণ
- “সকল প্রদীপ তব জ্বালো রে, জ্বালো রে—ডাকো আকুল স্বরে ‘এসো হে প্রিয়তম’…”পূজা ও আরতির চরম মুহূর্ত। অন্তরের প্রতিটি প্রকোষ্ঠে ভক্তি ও ভালোবাসার আলো জ্বেলে রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করা। ‘সখা’ থেকে ‘প্রিয়তম’ সম্বোধনে রূপান্তরের মাধ্যমে ঈশ্বর ও সাধকের সম্পর্ক একাকার হয়ে পরম প্রেমের অদ্বৈত রূপ লাভ করে।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- রূপক ও চিত্রকল্পের সার্থক প্রয়োগ: ‘অন্ধকারঘন হৃদয়-অঙ্গন’ এবং ‘সকল প্রদীপ জ্বালো’—এই রূপকগুলোর মাধ্যমে অন্তরের অজ্ঞতা দূর করে আধ্যাত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- সখা ও প্রিয়তমের দ্বৈত মাধুর্য: বৈষ্ণব দর্শনের মতো ভগবানকে একদিকে যেমন নির্ভরতার ‘সখা’ (বন্ধু) এবং অন্যদিকে চরম আত্মনিবেদনের ‘প্রিয়তম’ রূপে প্রকাশ করে সম্পর্কের মধুর রস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- সংক্ষিপ্ততায় বিরাট ভাবের সমাহার: গানের পদগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও তার অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা ও আহ্বান অত্যন্ত ঋজু, প্রত্যক্ষ ও ভাবগম্ভীর।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- দেশ রাগের আর্তি ও মাধুর্য: গানটির সুর নির্মিত হয়েছে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আবেগঘন রাগ ‘দেশ’-এর আশ্রয়ে। দেশ রাগের করুণ অথচ আশাবাদী সুর অন্তরের না-বলা আকুলতা ও মিলনের আনন্দকে এক অপূর্ব ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করে।
- ত্রিতালের গম্ভীর চলন: ১৬ মাত্রার ত্রিতালের শান্ত ও সমমাত্রিক চলন গানের ভাবকে কোনো চটুলতা দেয় না; বরং তা এক নিবিষ্ট প্রার্থনার মতো ধীর ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
- বাণীর সাথে সুরের সাযুজ্য: ‘ডাকো আকুল স্বরে’ অংশে সুরের আরোহী চলন ভক্তের অন্তরের ব্যাকুলতাকে সংগীতের মাধ্যমে সরাসরি দৃশ্যমান করে তোলে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৫ বঙ্গাব্দ) শান্তিনিকেতনের শান্ত আশ্রমে কবি এই গানটি রচনা করেন। এটি ছিল কবির ‘গীতাঞ্জলি’ পর্বের সমসাময়িক কাল, যখন তাঁর সমস্ত চেতনা পার্থিব কোলাহল ছেড়ে একমাত্র পরমেশ্বরের চরণে নিঃশর্ত সমর্পণে নিমগ্ন হয়েছিল।
- গীতবিতানের পূজা পর্যায়: গীতবিতানের পূজা পর্বের এই গানটি আত্মশুদ্ধি, আরতি এবং ঈশ্বরপ্রেমের এক অমূল্য আধ্যাত্মিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি গ্রন্থমালা), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্র-জীবনী (দ্বিতীয় খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।






![বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি | Borish dhora majhe shantir bari [ পূজা পর্যায়ের গান ] 2 বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি | Borish dhora majhe shantir bari](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/09/বরিষ-ধরা-মাঝে-শান্তির-বারি-1024x576.jpg)



![ভালোবেসে মন বললে bhalobese mon bolle [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভালোবেসে মন বললে bhalobese mon bolle [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভালোবেসে-মন-বললে-bhalobese-mon-bolle-কবিতা--1024x536.gif)