ক্যান্ডীয় নাচ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | নবজাতক কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ বয়সের বিখ্যাত ‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ ও শক্তিশালি কবিতা হলো এই ‘ক্যান্ডীয় নাচ’। শ্রীলঙ্কার (তৎকালীন সিংহল) ঐতিহ্যবাহী ক্যান্ডি অঞ্চলের একদল আদিবাসী পুরুষের একরোখা, বুনো আর দুর্দান্ত নাচ দেখে কবিগুরু এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, সেই নাচের ভেতরের আদিম শক্তিকে তিনি এই কবিতায় বন্দি করেছেন।

সাধারণত নাচ বলতে আমরা যে মৃদু লতার দোলা, পাতার কাঁপন বা মিষ্টি আবেগ বুঝি—ক্যান্ডীয় নাচ কিন্তু মোটেও তেমন নয়। কবি এখানে দেখিয়েছেন, এই নাচ যেন মাটির গভীর থেকে শিকড় ছিঁড়ে উপড়ে আসা কোনো খ্যাপা শালের গাছের মতো, যার হুংকারে পুরো আকাশ কেঁপে ওঠে। এই নাচ আসলে কোনো নিয়ম বা বাঁধন মানে না, কোনো নরম স্বপ্ন দিয়ে একে ঘেরা যায় না; এ যেন এক অলৌকিক আগুন হয়ে জ্বলে ওঠা।

নাচের এই তুমুল গতিকে বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, ঝড়ের প্রলয় আর পৌরাণিক রাহুর চাঁদ গ্রাস করার ক্ষুধার মতো শক্তিশালী সব রূপক ব্যবহার করেছেন। নর্তকদের শূন্যে তোলা একেকটি বাহু দেখে কবির মনে হয়েছে, তারা যেন রাহু নামের রাক্ষসের হাত থেকে পূর্ণিমার চাঁদকে মুক্ত করে তাকে আবার নতুন জীবন ফিরিয়ে দিতে লড়ছে।

কবিতার শেষ অংশে এসে এই নাচ আর সাধারণ কোনো মানুষের নাচ থাকে না, তা হয়ে ওঠে দেবাদিদেব মহাদেবের ‘নটরাজ’ রূপের তাণ্ডব নৃত্য। মহাদেবের ক্রোধে তাঁর অনুচর নন্দী যেমন সব ভয়ডর ভুলে রুখে দাঁড়ায়, এই নাচের প্রতিটা মুদ্রা যেন তেমনই নির্ভীক আর দয়া-মায়াহীন বহ্নিশিখা। কবি মনে করেন, এই তাণ্ডবের মাধ্যমে নটরাজ আসলে সমস্ত মোহ, জড়তা আর মনের ভয়কে পুড়িয়ে ছাই করে দেন। নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলে সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলাই যে এই নাচের আসল উদ্দেশ্য, কবিগুরু চমৎকারভাবে সেই আদিম ও রুদ্র সুন্দরের জয়গান গেয়েছেন এই কবিতায়।

ক্যান্ডীয় নাচ কবিতা (Candyiyo Nach Kobita) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | নবজাতক কাব্যগ্রন্থ

সিংহলে সেই দেখেছিলেম ক্যান্ডিদলের নাচ;

শিকড়গুলোর শিকড় ছিঁড়ে যেন শালের গাছ

          পেরিয়ে এল মুক্তিমাতাল খ্যাপা,

     হুংকার তার ছুটল আকাশ-ব্যাপা।

ডালপালা সব দুড়্‌দাড়িয়ে ঘূর্ণি হাওয়ায় কহে–

                   নহে, নহে, নহে–

নহে বাধা, নহে বাঁধন, নহে পিছন-ফেরা,

          নহে আবেগ স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা,

     নহে মৃদু লতার দোলা, নহে পাতার কাঁপন–

আগুন হয়ে জ্বলে ওঠা এ যে তপের তাপন।

 

        ওদের ডেকে বলেছিল সমুদ্দরের ঢেউ,

“আমার ছন্দ রক্তে আছে এমন আছে কেউ।’

        ঝঞ্ঝা ওদের বলেছিল, “মঞ্জীর তোর আছে

ঝংকারে যার লাগাবে লয় আমার প্রলয়নাচে।’

        ঐ যে পাগল দেহখানা, শূন্যে ওঠে বাহু,

          যেন কোথায় হাঁ করেছে রাহু–

        লুব্ধ তাহার ক্ষুধার থেকে চাঁদকে করবে ত্রাণ,

          পূর্ণিমাকে ফিরিয়ে দেবে প্রাণ।

 

        মহাদেবের তপোভঙ্গে যেন বিষম বেগে

                    নন্দী উঠল জেগে;

          শিবের ক্রোধের সঙ্গে

        উঠল জ্বলে দুর্দাম তার প্রতি অঙ্গে অঙ্গে

          নাচের বহ্নিশিখা

                   নিদয়া নির্ভীকা।

খুঁজতে ছোটে মোহমদের বাহন কোথায় আছে

     দাহন করবে এই নিদারুণ আনন্দময় নাচে।

নটরাজ যে পুরুষ তিনি, তাণ্ডবে তাঁর সাধন,

     আপন শক্তি মুক্ত ক’রে ছেঁড়েন আপন বাঁধন;

দুঃখবেগে জাগিয়ে তোলেন সকল ভয়ের ভয়;

          জয়ের নৃত্যে আপনাকে তাঁর জয়।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন