বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর রূপকাশ্রিত ও জীবনবোধসমৃদ্ধ লিরিক হলো ‘অকালে’। সাঁঝের আঁধারে যখন সংসারের কর্মচঞ্চলতা থেমে আসে এবং সবাই নিজ নীড়ে বিশ্রামের আশ্রয় খোঁজে, তখন ভাঙা হাটের উদ্দেশ্যে অসময়ে ছুটে চলা এক পথিকের প্রতীকী চিত্র এ কবিতায় চমৎকার ছন্দে ও রূপকে ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের অকালে কবিতা
অকালে কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | অকালে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকাশ্রিত ও ভাবগম্ভীর লিরিক কবিতা (Allegorical Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
অকালে সম্পূর্ণ কবিতা:
ভাঙা হাটে কে ছুটেছিস,
পসরা লয়ে?
সন্ধ্যা হল, ওই-যে বেলা
গেল রে বয়ে।
যে যার বোঝা মাথার ‘পরে
ফিরে এল আপন ঘরে,
একাদশীর খণ্ড শশী
উঠল পল্লীশিরে।
পারের গ্রামে যারা থাকে
উচ্চকণ্ঠে নৌকা ডাকে,
হাহা করে প্রতিধ্বনি
নদীর তীরে তীরে।
কিসের আশে ঊর্ধ্বশ্বাসে
এমন সময়ে
ভাঙা হাটে তুই ছুটেছিস
পসরা লয়ে?
সুপ্তি দিল বনের শিরে
হস্ত বুলায়ে,
কা কা ধ্বনি থেমে গেল
কাকের কুলায়ে।
বেড়ার ধারে পুকুর-পাড়ে
ঝিল্লি ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,
বাতাস ধীরে পড়ে এল,
স্তব্ধ বাঁশের শাখা–
হেরো ঘরের আঙিনাতে
শ্রান্তজনে শয়ন পাতে,
সন্ধ্যাপ্রদীপ আলোক ঢালে
বিরাম-সুধা-মাখা।
সকল চেষ্টা শান্ত যখন
এমন সময়ে
ভাঙা হাটে কে ছুটেছিস,
পসরা লয়ে?
অকালে সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- অসময়ের অন্বেষণ ও রূপক:“ভাঙা হাটে কে ছুটেছিস, / পসরা লয়ে? / সন্ধ্যা হল, ওই-যে বেলা / গেল রে বয়ে।”— হাট হলো মানবজীবনের কর্মক্ষেত্র ও সুযোগের রূপক। যখন সময় অতিক্রান্ত এবং জীবনের বেলা ফুরিয়ে গেছে, তখন ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার পসরা সাজিয়ে ছুটে চলায় কোনো ফল মেলে না। এই অসময়ের চেষ্টা শুধুই বৃথা আর্তনাদে পরিণত হয়।
- শান্ত সন্ধ্যার বিপরীতে অন্তরের চঞ্চলতা:“হেরো ঘরের আঙিনাতে / শ্রান্তজনে শয়ন পাতে, / সন্ধ্যাপ্রদীপ আলোক ঢালে / বিরাম-সুধা-মাখা।”— চারপাশে প্রকৃতির ক্লান্তিহীন ঘুম, ঝিঁঝিঁর ডাক এবং গৃহকোণে বিশ্রামের স্নিগ্ধ আলো। গোটা জগৎ যখন শান্তি ও অবসরের কোলে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে, তখন একাকী পথিকের এই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা এক গভীর মানসিক অস্থিরতা ও অতৃপ্তির বৈপরীত্য তৈরি করে।
- জীবনের অবসান ও ব্যর্থতার হাহাকার:“সকল চেষ্টা শান্ত যখন / এমন সময়ে / ভাঙা হাটে কে ছুটেছিস, / পসরা লয়ে?”— সব চেষ্টা শান্ত হয়ে আসার পর যে ছুটে চলা, তা মানুষের বিলম্বে উপলব্ধির প্রতীক। সঠিক সময়ে যা করা হয়নি, জীবনের শেষ লগ্নে এসে তা পূরণ করার চেষ্টা এক পরম করুণ আকুতি হয়েই থেকে যায়।