বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত চপল, মিষ্টি ও রোমান্টিক লিরিক হলো ‘ক্ষণেক দেখা’। পল্লীগ্রামের মেঠোপথে দৈনন্দিন জল আনার মুহূর্তে এক তরুণীর ঘোমটার আড়াল থেকে ক্ষণিকের কৌতূহলী চাওয়া কীভাবে এক উদাসী পথিকের হৃদয়ে গভীর দোলা দিয়ে যায়, তা এ কবিতায় অত্যন্ত চমৎকার ছন্দে রূপায়িত হয়েছে।
Table of Contents
ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের ক্ষণেক দেখা কবিতা
ক্ষণেক দেখা কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ক্ষণেক দেখা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক লিরিক ও ক্ষণিক অনুভূতির কবিতা |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
ক্ষণেক দেখা সম্পূর্ণ কবিতা:
চলেছিলে পাড়ার পথে
কলস লয়ে কাঁখে,
একটুখানি ফিরে কেন
দেখলে ঘোমটা-ফাঁকে?
ওইটুকু যে চাওয়া
দিল একটু হাওয়া
কোথা তোমার ও পার থেকে
আমার এ পার-‘পরে।
অতি দূরের দেখাদেখি
অতি ক্ষণেক-তরে।
আমি শুধু দেখেছিলেম
তোমার দুটি আঁখি–
ঘোমটা-ফাঁদা আঁধার-মাঝে
ত্রস্ত দুটি পাখি।
তুমি এক নিমিখে
চেয়ে আমার দিকে
পথের একটি পথিকেরে
দেখলে কতখানি
একটুমাত্র কৌতূহলে
একটি দৃষ্টি হানি?
যেমন ঢাকা ছিলে তুমি
তেমনি রইলে ঢাকা,
তোমার কাছে যেমন ছিনু
তেমনি রইনু ফাঁকা!
তবে কিসের তরে
থামলে লীলাভরে
যেতে যেতে পাড়ার পথে
কলস লয়ে কাঁখে?
একটুখানি ফিরে কেন
দেখলে ঘোমটা-ফাঁকে?
ক্ষণেক দেখা সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- দৃষ্টির ক্ষণিক বিনিময় ও অন্তরের আলোড়ন:“ওইটুকু যে চাওয়া / দিল একটু হাওয়া / কোথা তোমার ও পার থেকে / আমার এ পার-‘পরে।”— দুটি মানুষের মাঝে পরিচয় নেই, কোনো কথাও হয়নি। শুধু ঘোমটার ফাঁক দিয়ে এক পলকের দৃষ্টিবিনিময় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তার মাঝে এক অদৃশ্য অনুভূতির বাতাস বইয়ে দেয়।
- চমকিত চোখের উপমা:“ঘোমটা-ফাঁদা আঁধার-মাঝে / ত্রস্ত দুটি পাখি।”— ঘোমটার আবরণের ভেতর তরুণীর চঞ্চল ও সন্ত্রস্ত চোখ দুটিকে কবি বন্দি অথচ ভয় পাওয়া পাখির সাথে তুলনা করেছেন, যা গ্রাম্য নারীর শঙ্কা ও স্বাভাবিক লজ্জাশীলতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
- অপূর্ণতার মধুর বিস্ময়:“যেমন ঢাকা ছিলে তুমি / তেমনি রইলে ঢাকা, / তোমার কাছে যেমন ছিনু / তেমনি রইনু ফাঁকা! / তবে কিসের তরে / থামলে লীলাভরে”— এই দেখার কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না; তরুণী যেমন আবৃত ছিল তেমনই থেকে গেল, পথিকের জীবনও রয়ে গেল আগের মতো শূন্য। তবু সেই ক্ষণিক কৌতূহল ও দৃষ্টিপাতের লীলাটুকু পথিকের মনে আজীবন এক মিষ্টি রহস্য ও প্রশ্ন জাগিয়ে রাখে।