ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের বিরহ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর অনুভূতির ও চিত্রধর্মী কবিতা হলো ‘বিরহ’। চৈত্র মাসের খাঁ খাঁ করা নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে প্রিয়জনের চলে যাওয়া এবং শূন্য ঘরে একলা বসে থাকা বিরহীর হৃদয়ের হাহাকারকে কবি প্রকৃতির অলস, তপ্ত ও বিষাদময় রূপের সাথে একাত্ম করে এঁকেছেন।

বিরহ কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবিরহ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক বিরহের লিরিক (Romantic Elegiac Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ গুরুগম্ভীর ভাষা ছেড়ে চলিত ও আটপৌরে ভঙ্গিতে জীবনের বিচিত্র সুর তুলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যে বিরহের চিরায়ত পটভূমি হিসেবে বর্ষা বা রাতের উল্লেখ বেশি দেখা গেলেও, এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের আগের চৈত্রের তপ্ত দ্বিপ্রহরকে বিরহের প্রেক্ষাপট করেছেন। জনশূন্য গ্রাম, বন্ধ দুয়ার, ঘুঘুর ডাক আর উত্তপ্ত বাতাসের মাঝে বিরহী মনের নিঃসঙ্গতা এখানে এক অনন্য রূপ পরিগ্রহ করেছে।

বিরহ কবিতা (সম্পূর্ণ কবিতা):

তুমি যখন চলে গেলে

          তখন দুই-পহর–

সূর্য তখন মাঝ-গগনে,

           রৌদ্র খরতর।

ঘরের কর্ম সাঙ্গ করে

ছিলেম তখন একলা ঘরে,

আপন-মনে বসে ছিলেম

            বাতায়নের ‘পর।

                        তুমি যখন চলে গেলে

                                    তখন দুই-পহর।

চৈত্র মাসের নানা খেতের

            নানা গন্ধ নিয়ে

আসতেছিল তপ্ত হাওয়া

            মুক্ত দুয়ার দিয়ে।

দুটি ঘুঘু সারাটা দিন

ডাকতেছিল শ্রান্তিবিহীন,

একটি ভ্রমর ফিরতেছিল

            কেবল গুন্‌গুনিয়ে

                চৈত্র মাসের নানা খেতের

                     নানা বার্তা নিয়ে।

তখন পথে লোক ছিল না,

            ক্লান্ত কাতর গ্রাম।

ঝাউশাখাতে উঠতেছিল

            শব্দ অবিশ্রাম।

আমি শুধু একলা প্রাণে

অতি সুদূর বাঁশির তানে

গেঁথেছিলেম আকাশ ভ’রে

            একটি কাহার নাম।

                 তখন পথে লোক ছিল না,

                      ক্লান্ত কাতর গ্রাম।

ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,

            আমি ছিলেম জেগে–

আবাঁধা চুল উড়তে ছিল

            উদাস হাওয়া লেগে।

তটতরুর ছায়ার তলে

ঢেউ ছিল না নদীর জলে,

তপ্ত আকাশ এলিয়ে ছিল

            শুভ্র অলস মেঘে।

                  ঘরে ঘরে দুয়ার দেওয়া,

                       আমি ছিলেম জেগে।

তুমি যখন চলে গেলে

            তখন দুই-পহর,

শুষ্ক পথে দগ্ধ মাঠে

            রৌদ্র খরতর।

নিবিড়-ছায়া বটের শাখে

কপোত দুটি কেবল ডাকে

একলা আমি বাতায়নে–

            শূন্য শয়ন-ঘর।

                        তুমি যখন গেলে তখন

                                    বেলা দুই-পহর।

 

Amar Rabindranath Logo

বিরহ সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Tumi jokhon chole gele
Tokhon dui-pohor–
Shurjo tokhon majh-gogone,
Roudro khorotoro.
Ghorer kormo shango kore
Chhilem tokhon ekla ghore,
Apon-mone boshe chhilem
Batayoner ‘por.
Tumi jokhon chole gele
Tokhon dui-pohor.
Choitro masher nana kheter
Nana gondho niye
Ashtechhilo topto hawa
Mukto duar diye.
Duti ghughu sharata din
Daktechhilo shrantibihin,
Ekti bhomor phirtechhilo
Kebol gunguniye
Choitro masher nana kheter
Nana barta niye.
Tokhon pothe lok chhilo na,
Klanto kator gram.
Jhaushakhate uthtechhilo
Shobdo obishram.
Ami shudhu ekla prane
Oti shudur banshir tane
Genthechhilem akash bhore
Ekti kahar nam.
Tokhon pothe lok chhilo na,
Klanto kator gram.
Ghore ghore duar dewa,
Ami chhilem jege–
Abandha chul urte chhilo
Udash hawa lege.
Tottorur chhayar tole
Dheu chhilo na nodir jole,
Topto akash eliye chhilo
Shubhro olesh meghe.
Ghore ghore duar dewa,
Ami chhilem jege.
Tumi jokhon chole gele
Tokhon dui-pohor,
Shushko pothe dogdho mathe
Roudro khorotoro.
Nibir-chhaya boter shakhe
Kopot duti kebol dake
Ekla ami batayone–
Shunno shoyon-ghor.
Tumi jokhon gele tokhon
Bela dui-pohor.
বিরহ biroho [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • নিথর নিসর্গে বিরহের রূপ:
    “তটতরুর ছায়ার তলে / ঢেউ ছিল না নদীর জলে, / তপ্ত আকাশ এলিয়ে ছিল / শুভ্র অলস মেঘে।”
    — দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে নদীর জলে ঢেউ নেই, আকাশে অলস মেঘ থমকে আছে। নিথর এই নিসর্গ বিরহী হৃদয়ের স্থবিরতা ও হাহাকারকেই মূর্ত করে তোলে।
  • প্রকৃতির শব্দে নিঃসঙ্গতার তীব্রতা:
    “দুটি ঘুঘু সারাটা দিন / ডাকতেছিল শ্রান্তিবিহীন, / একটি ভ্রমর ফিরতেছিল / কেবল গুন্‌গুনিয়ে”
    — তপ্ত দুপুরে ঘুঘুর ক্লান্তিহীন ডাক আর ভ্রমরের গুনগুন শব্দ জনহীন গ্রামের নির্জনতাকে যেমন গাঢ় করে, তেমনি একাকী হৃদয়ের শূন্যতাবোধকেও বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়।
  • শূন্য গৃহ ও স্মৃতির বিস্তার:
    “একলা আমি বাতায়নে– / শূন্য শয়ন-ঘর। / তুমি যখন গেলে তখন / বেলা দুই-পহর।”
    — চারপাশের সবাই যখন ঘরে দুয়ার দিয়ে বিশ্রামে মগ্ন, তখন বাতায়নে বসে বিরহী সত্তা জেগে থাকে। প্রিয়জনের প্রস্থানে শূন্য হয়ে যাওয়া শয়নঘর আর বুকের ভেতরের হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন