বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম স্নিগ্ধ ও ভাবালু লিরিক কবিতা হলো ‘নষ্ট স্বপ্ন’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় বর্ষার একাকী রাতে কবির অন্তরের মেঘমেদুর আকুতি, অবাস্তব স্বপ্নের পিছুটান এবং বাস্তবের কঠিন সত্যের সাথে এক মিষ্টি অথচ ম্লান বেদনার রূপ ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নষ্ট স্বপ্ন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও ভাবালু লিরিক কবিতা (Romantic and Melancholic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক চঞ্চল ও মননশীল সময়ের সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের হালকা-ফুলকা আনন্দের পাশাপাশি কখনো কখনো গভীর অন্তরঙ্গ বেদনা ও কল্পনার আকুতিও প্রকাশ পেয়েছে। ‘নষ্ট স্বপ্ন’ কবিতায় বাদলা রাতের একাকীত্ব, ঝিরিঝিরি বরিষণ এবং কল্পনায় কোনো প্রিয়মুখকে পাওয়ার অদম্য বাসনা ও পরিশেষে তা কেবল স্বপ্নেই থেকে যাওয়ার আক্ষেপ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নষ্ট স্বপ্ন – সম্পূর্ণ কবিতা
কালকে রাতে মেঘের গরজনে
রিমিঝিমি-বাদল-বরিষনে
ভাবিতেছিলাম একা একা–
স্বপ্ন যদি যায় রে দেখা
আসে যেন তাহার মূর্তি ধ’রে
বাদলা রাতে আধেক ঘুমঘোরে।
মাঠে মাঠে বাতাস ফিরে মাতি,
বৃথা স্বপ্নে কাটল সারা রাতি।
হায় রে, সত্য কঠিন ভারী,
ইচ্ছামত গড়তে নারি–
স্বপ্ন সেও চলে আপন মতে,
আমি চলি আমার শূন্য পথে।
কালকে ছিল এমন ঘন রাত,
আকুল ধারে এমন বারিপাত,
মিথ্যা যদি মধুর রূপে
আসত কাছে চুপে চুপে
তাহা হলে কাহার হত ক্ষতি
স্বপ্ন যদি ধরত সে মূরতি?
নষ্ট স্বপ্ন Romanized Version
Kalko rate megher gorjone
Rimijhimi-badol-borishone
Bhabitechhilam eka eka–
Shopno jodi jay re dekha
Ashe jeno tahar murti dho’re
Badla rate adhek ghum-ghore.
Mathe mathe batash fire mati,
Britha shopne katlo shara rati.
Hay re, sotyo kothin bhari,
Ichchhamoto gorte nari–
Shopno se-o chole apon mote,
Ami choli amar shunyo pothe.
Kalko chhilo emon ghono rat,
Akul dhare emon baripat,
Mithya jodi modhur rupe
Ashto kache chupe chupe
Tahole kahar hoto khoti
Shopno jodi dhorto se murti?
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- বাদলা রাতের একাকীত্ব ও স্বপ্নের আকুতি:
“কালকে রাতে মেঘের গরজনে / রিমিঝিমি-বাদল-বরিষনে / ভাবিতেছিলাম একা একা– / স্বপ্ন যদি যায় রে দেখা…”— বর্ষার অন্ধকার রাতে মেঘের ডাক আর বৃষ্টির শব্দে কবি একা একা বসে প্রিয় কল্পনার মুখটিকে দেখার আকুতি অনুভব করেন।
- বাস্তবের কঠিন সত্য বনাম স্বপ্নের স্বাধীনতা:
“হায় রে, সত্য কঠিন ভারী, / ইচ্ছামত গড়তে নারি– / স্বপ্ন সেও চলে আপন মতে, / আমি চলি আমার শূন্য পথে।”— মানুষের ইচ্ছামতো বাস্তবকে গড়া যায় না, সত্য সবসময় কঠিন ও ভারী। আর স্বপ্ন নিজের গতিতে চলে, ফলে কবিকে তার শূন্য পথেই চলতে হয়।
- মিথ্যার মোহে মধুর প্রত্যাশা:
“মিথ্যা যদি মধুর রূপে / আসত কাছে চুপে চুপে / তাহা হলে কাহার হত ক্ষতি / স্বপ্ন যদি ধরত সে মূরতি?”— কবিতার শেষাংশে কবির এক গভীর আক্ষেপ প্রকাশ পায়—যদি সেই স্বপ্ন সত্যি একটি মূর্ত রূপ নিয়ে মধুর মিথ্যার মতো কাছে আসত, তবে কারই বা এমন কী ক্ষতি হতো? কল্পনার সেই রেশই এই কবিতার মূল প্রাণ।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।