শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের সাত সমুদ্র পারে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর, শিশুমনস্তত্ত্ব ও কল্পনাশক্তিনির্ভর কবিতা হলো ‘সাত সমুদ্র পারে’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় এক শিশুর নিষ্কলুষ কল্পনা, রূপকথার সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার হওয়ার আকুতি এবং মায়ের সাথে তার এক মিষ্টি আবদারের রূপ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামসাত সমুদ্র পারে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশিশু ভোলানাথ
প্রকাশের বছর১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনশিশুকেন্দ্রিক ও কাল্পনিক লিরিক কবিতা (Child-centric and Imaginative Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ কবিতার এক অপূর্ব নিদর্শন। এই গ্রন্থের কবিতায় কবি শিশুদের মনের অবুঝ আকুতি, তাদের খেলার জগৎ এবং রূপকথার প্রতি আসক্তি খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘সাত সমুদ্র পারে’ কবিতায় একটি ছোট্ট শিশুর মনের ভাব প্রকাশ পেয়েছে—যে মেঘলা আকাশে রূপকথার সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হতে চায়। গোবিন্দ, মুকুন্দ বা হরিশ খোঁড়ার মতো খেলার সাথীরা কেউ নেই, তাই মায়ের খাতার কাগজ ছিঁড়ে নৌকো বানিয়ে সে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে চায়। বাবার অনুপস্থিতি বা চিঠির ডাক পাঠানোর চেয়েও তার কাছে এই কাল্পনিক যাত্রা অনেক বেশি জরুরি।

সাত সমুদ্র পারে – সম্পূর্ণ কবিতা

দেখছ না কি, নীল মেঘে আজ
আকাশ অন্ধকার।
সাত সমুদ্র তেরো নদী
আজকে হব পার।
নাই গোবিন্দ, নাই মুকুন্দ,
নাইকো হরিশ খোঁড়া।
তাই ভাবি যে কাকে আমি
করব আমার ঘোড়া।
কাগজ ছিঁড়ে এনেছি এই
বাবার খাতা থেকে,
নৌকো দে না বানিয়ে, অমনি
দিস, মা, ছবি এঁকে।
রাগ করবেন বাবা বুঝি
দিল্লি থেকে ফিরে?
ততক্ষণ যে চলে যাব
সাত সমুদ্র তীরে।
এমনি কি তোর কাজ আছে, মা,
কাজ তো রোজই থাকে।
বাবার চিঠি এক্‌খুনি কি
দিতেই হবে ডাকে?
নাই বা চিঠি ডাকে দিলে
আমার কথা রাখো,
আজকে না হয় বাবার চিঠি
মাসি লিখুন নাকো!
আমার এ যে দরকারি কাজ
বুঝতে পার না কি?
দেরি হলেই একেবারে
সব যে হবে ফাঁকি।
মেঘ কেটে যেই রোদ উঠবে
বৃষ্টি বন্ধ হলে
সাত সমুদ্র তেরো নদী
কোথায় যাবে চলে!

সাত সমুদ্র পারে Romanized Version

Dekhchho na ki, nil meghe aj
Akash ondhokar.
Shat shomudro tero nodi
Ajke hobo par.
Nai gobindo, nai mukundo,
Naiko horish khora.
Tai bhabi je kake ami
Korbo amar ghora.
Kagoj chhire enechhi ei
Babar khata theke,
Nouko de na baniye, omoni
Dish, ma, chhobi enke.
Rag korben baba bujhi
Dilli theke fire?
Totokkhon je chole jabo
Shat shomudro tire.
Emni ki tor kaj ache, ma,
Kaj to roj-i thake.
Babar chithi ek-khuni ki
Ditei hobe dake?
Nai ba chithi dake dile
Amar kotha rakho,
Ajke na hoy babar chithi
Mashi likhun nako!
Amar e je dorkari kaj
Bujhite paro na ki?
Deri holei ekbare
Shob je hobe faki.
Megh kete jei rod uthbe
Brishti bondho hole
Shat shomudro tero nodi
Kothay jabe chole!

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রূপকথার জগতের টান:
“দেখছ না কি, নীল মেঘে আজ / আকাশ অন্ধকার। / সাত সমুদ্র তেরো নদী / আজকে হব পার।”
— শিশুর কল্পনা আকাশ ছাপিয়ে রূপকথার সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
  • খেলার সাথী ও খাতার কাগজ: খেলার বন্ধুরা (গোবিন্দ, মুকুন্দ, হরিশ খোঁড়া) কেউ কাছে না থাকায় সে বাবার খাতা ছিঁড়ে নৌকা বানানোর আবদার করে মায়ের কাছে। বাবার বকুনি খাওয়ার ভয় তার মনে নেই, কারণ তার আগেই সে রূপকথার দেশে পালিয়ে যেতে চায়।
  • শিশুর কাছে খেলার গুরুত্ব:
“আমার এ যে দরকারি কাজ / বুঝতে পার না কি? / দেরি হলেই একেবারে / সব যে হবে ফাঁকি।”
— মায়ের কাছে সংসারের সাধারণ কাজ বা বাবার চিঠি পাঠানোর চেয়ে শিশুর কাছে তার এই কাগজের নৌকো ভাসানোর ‘দরকারি কাজ’ অনেক বেশি মূল্যবান। বৃষ্টি থেমে রোদ উঠার আগেই নদী বা সমুদ্র হারিয়ে যাওয়ার ভয় শিশুর মনে কাজ করে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন