ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের বিদায় কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম লঘু, সহজ ও শান্তির সুরময় কবিতা হলো ‘বিদায়’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি সারা দিনের ক্লান্তি শেষে বিশ্রামের আকুলতা, জীবনের সহজ সন্তুষ্টি এবং কোনো অপ্রাপ্তির অভিযোগ না রেখে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ার এক সুন্দর ও মনমুগ্ধকর ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবিদায়
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০
কবিতার ধরনলঘু ও লিরিক কবিতা (Light and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক লঘু ও চঞ্চল রসের সৃষ্টি, যেখানে জীবনের গুরুগম্ভীর তত্ত্বের চেয়ে দৈনন্দিন আনন্দ, রসিকতা এবং মানবজীবনের হালকা-ফুলকা অনুভূতিগুলো প্রকাশ পেয়েছে। ‘বিদায়’ কবিতায় কবি দিনের শেষে ক্লান্তি নিয়ে সবার কাছ থেকে শান্তিতে বিদায় নেওয়ার ও ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলেছেন। জীবনের চলার পথে কোনো পরিবর্তন বা বদলের অহেতুক আফসোসে না ভুগে, দিনটি যেমন কেটেছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা এখানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিদায় – সম্পূর্ণ কবিতা

তোমরা নিশি যাপন করো,
এখনো রাত রয়েছে ভাই,
আমায় কিন্তু বিদায় দেহো–
ঘুমোতে যাই, ঘুমোতে যাই।
মাথার দিব্য, উঠো না কেউ
আগ বাড়িয়ে দিতে আমায়–
চলছে যেমন চলুক তেমন,
হঠাৎ যেন গান না থামায়।
আমার যন্ত্রে একটি তন্ত্রী
একটু যেন বিকল বাজে,
মনের মধ্যে শুনছি যেটা
হাতে সেটা আসছে না যে।
একেবারে থামার আগে
সময় রেখে থামতে যে চাই–
আজকে কিছু শ্রান্ত আছি,
ঘুমোতে যাই, ঘুমোতে যাই।
আঁধার-আলোয় সাদায়-কালোয়
দিনটা ভালোই গেছে কাটি,
তাহার জন্যে কারো সঙ্গে
নাইকো কোনো ঝগড়াঝাঁটি।
মাঝে মাঝে ভেবেছিলুম
একটু-আধটু এটা-ওটা
বদল যদি পারত হতে
থাকত নাকো কোনো খোঁটা।
বদল হলে কখন মনটা
হয়ে পড়ত ব্যতিব্যস্ত,
এখন যেমন আছে আমার
সেইটে আবার চেয়ে বসত।
তাই ভেবেছি দিনটা আমার
ভালোই গেছে কিছু না চাই–
আজকে শুধু শ্রান্ত আছি,
ঘুমোতে যাই, ঘুমোতে যাই।

বিদায় Romanized Version

Tomra nishi japon koro,
Ekhono rat royeche bhai,
Amay kintu biday deho–
Ghumote jai, ghumote jai.
Mathar dibyo, utho na keu
Ag bariye dite amay–
Cholche jemon choluk temon,
Hothat jeno gan na thamay.
Amar jontre ekti tontri
Ektu jeno bikol baje,
Moner modhye shunchhi jeta
Hate sheta ashe na je.
Ekbare thamar age
Somoy rekhe thamte je chai–
Ajke kichhu shranto achhi,
Ghumote jai, ghumote jai.
Andhar-aloy saday-kaloy
Dinta bhaloi geche kati,
Tahar jonno karo shonge
Naiko kono jhogra-jhati.
Majhe majhe bhebechhilum
Ektu-adhto eta-ota
Bodol jodi parot hote
Thakto nako kono khota.
Bodol hole kokhon monta
Hoye porto byotibyasto,
Ekhon jemon ache amar
Sheite abar cheye bosot.
Tai bhebechhi dinta amar
Bhaloi geche kichhu na chai–
Ajke shudhu shranto achhi,
Ghumote jai, ghumote jai.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • বিশ্রামের আকুলতা: সারাদিনের কর্মব্যস্ততা ও ক্লান্তির পর রাতের অন্ধকারে সকলের কাছ থেকে শান্তিতে বিদায় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সরল আকুলতা এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।
  • জীবন ও যন্ত্রের সুর:
“আমার যন্ত্রে একটি তন্ত্রী / একটু যেন বিকল বাজে, / মনের মধ্যে শুনছি যেটা / হাতে সেটা আসছে না যে।”
— মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতা ও বয়সের ক্লান্তি বোঝাতে কবি চমৎকার এই রূপক ব্যবহার করেছেন। মনের ভাব পুরোপুরি হাতে প্রকাশ না পেলেও, হঠাৎ থেমে যাওয়ার চেয়ে সময় রেখে শান্তিতে থামার আকাঙ্ক্ষাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
  • সন্তোষ ও প্রাপ্তি:
“তাই ভেবেছি দিনটা আমার / ভালোই গেছে কিছু না চাই–“
— জীবনে এটা-ওটা বদল করার বা পাওয়ার অহেতুক আফসোসে না ভুগে, দিনটি যেমন কেটেছে তাতেই পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করাই এই কবিতার মূল বার্তা।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন