ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের অপটু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম লঘু, চঞ্চল ও কৌতুকপূর্ণ প্রেমের কবিতা হলো ‘অপটু’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রিয়ার উপস্থিতিতে কবির আকুলতা, মালা গাঁথতে গিয়ে হাত কেঁপে যাওয়া এবং গান গাইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত প্রিয়ার চরণে নিঃশব্দে বসে পড়ার এক অপূর্ব ও মিষ্টি অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅপটু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০
কবিতার ধরনলঘু ও রোমান্টিক লিরিক কবিতা (Light and Romantic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক লঘু ও চঞ্চল রসের সৃষ্টি, যেখানে জীবনের গুরুগম্ভীর তত্ত্বের চেয়ে দৈনন্দিন আনন্দ, রসিকতা এবং মানবজীবনের হালকা-ফুলকা অনুভূতিগুলো প্রকাশ পেয়েছে। ‘অপটু’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রিয় মানুষের সামনে আসতেই চতুর প্রিয়ার হাসির ছটায় বা চোখের ইশারায় কবির সমস্ত কর্মদক্ষতা ও কথা হারিয়ে যায়। গান বা মালা গাঁথার চেষ্টা ব্যর্থ হলে কবি সব ছেড়ে প্রিয়ার পায়ের কাছে নিঃশব্দে আশ্রয় চান।

অপটু – সম্পূর্ণ কবিতা

যতবার আজ গাঁথনু মালা
পড়ল খসে খসে
কী জানি কার দোষে!
তুমি হোথায় চোখের কোণে
দেখছ বসে বসে।
চোখ-দুটিরে প্রিয়ে,
শুধাও শপথ নিয়ে
আঙুল আমার আকুল হল
কাহার দৃষ্টিদোষে!
আজ যে বসে গান শোনাব
কথাই নাহি জোটে,
কণ্ঠ নাহি ফোটে।
মধুর হাসি খেলে তোমার
চতুর রাঙা ঠোঁটে।
কেন এমন ত্রুটি
বলুক আঁখি-দুটি–
কেন আমার রুদ্ধ কণ্ঠে
কথাই নাহি ফোটে!
রেখে দিলাম মাল্য বীণা,
সন্ধ্যা হয়ে আসে।
ছুটি দাও এ দাসে–
সকল কথা বন্ধ করে
বসি পায়ের পাশে।
নীরব ওষ্ঠ দিয়ে
পারب যে কাজ প্রিয়ে
এমন কোনো কর্ম দেহো
অকর্মণ্য দাসে।

অপটু Romanized Version

Joto bar aj ganthonu mala
Porelo khose khose
Ki jani kar doshe!
Tumi hothay chokher kone
Dekhcho bose bose.
Chokh-dutire priye,
Shudhao shopoth niye
Angul amar akul holo
Kahar drishtidoshe!
Aj je bose gan shonabo
Kothai nahi jhote,
Kontho nahi phote.
Modhur hashi khele tomar
Chotur ranga thote.
Keno amon truti
Boluk ankhi-duti–
Keno amar ruddho konsthe
Kothai nahi phote!
Rekhe dilam malyo bina,
Shondhya hoye ashe.
Chhuti dao e dase–
Sokol kotha bondho kore
Bosi payer pashe.
Nirobo oshtho diye
Parbo je kaj priye
Emon kono kormo deho
O-kormonnyo dase.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মালা গাঁথার ব্যর্থতা ও প্রিয়ার কটাক্ষ: যতবার কবি মালা গাঁথতে যান, তা খসে পড়ে। প্রিয়া দূরে বসে চোখের কোণে তা দেখে, আর কবির আঙুল আকুল হয়ে ওঠে দৃষ্টিদোষের কারণে।
  • বাক্যহীনতা ও গান থমে যাওয়া:
“আজ যে বসে গান শোনাব / কথাই নাহি জোটে, / কণ্ঠ নাহি ফোটে। / মধুর হাসি খেলে তোমার / চতুর রাঙা ঠোঁটে।”
— প্রিয়ার চতুর ও মধুর হাসির সামনে পড়ে কবির কণ্ঠের সমস্ত গান ও কথা যেন আটকে যায়।
  • সব ছেড়ে প্রিয়ার চরণে আত্মসমর্পণ:
“রেখে দিলাম মাল্য বীণা, / সন্ধ্যা হয়ে আসে। / ছুটি দাও এ দাসে– / সকল কথা বন্ধ করে / বসি পায়ের পাশে।”
— মালা ও বীণা রেখে দিয়ে কবি সব কথা বন্ধ করে প্রিয়ার পায়ের কাছে বসে পড়ার আকুতি জানান। নীরব ওষ্ঠ দিয়ে কাজ করা যায় এমন কোনো অকর্মণ্য দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে কবিতাটি এক মিষ্টি সমাপ্তিতে পৌঁছায়।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন