বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি বিষাদমধুর ও দার্শনিক রূপকপ্রধান লিরিক কবিতা হলো ‘স্থায়ী-অস্থায়ী’। সংসারের ক্ষণভঙ্গুর সুখ-সম্ভোগের নশ্বরতা এবং তার বিপরীতে হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থেকে যাওয়া বেদনার ক্ষতকে কবি এখানে গোলাপ ও কাঁটার চমৎকার রূপকে চিত্রিত করেছেন।
Table of Contents
ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের স্থায়ী-অস্থায়ী কবিতা
স্থায়ী-অস্থায়ী কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | স্থায়ী-অস্থায়ী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক লিরিক ও দার্শনিক ভাবপ্রধান গীতি-কবিতা (Philosophical Lyric) |
স্থায়ী-অস্থায়ী কবিতার কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লঘু চালের ছন্দ ও আটপৌরে রূপকল্পের আড়ালে মানবজীবনের গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন। সংসারকে তিনি কল্পনা করেছেন এক পুষ্পিত লতারূপে, যার সৌন্দর্য মানুষকে আকর্ষণ করে। মানুষ আনন্দ ও প্রেমের আশায় সেই লতা থেকে ফুল তুলতে গিয়ে কাঁটার আঘাতে রক্তাক্ত হয়। কালের নিয়মে ফুলের সৌন্দর্য ঝরে যায় অর্থাৎ সুখ মিলিয়ে যায়, কিন্তু কাঁটার রেখে যাওয়া ক্ষত হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে বাজে। জীবনের বেলাশেষে এসে ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তি ও চিরস্থায়ী বেদনার এই অনিবার্য বৈপরীত্যই কবিতাটির মূল প্রেক্ষাপট।
স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পূর্ণ কবিতা:
তুলেছিলেম কুসুম তোমার
হে সংসার, হে লতা!
পরতে মালা বিঁধল কাঁটা
বাজল বুকে ব্যথা,
হে সংসার, হে লতা!
বেলা যখন পড়ে এল,
আঁধার এল ছেয়ে,
দেখি তখন চেয়ে–
তোমার গোলাপ গেছে, আছে
আমার বুকের ব্যথা,
হে সংসার, হে লতা!
আরো তোমার অনেক কুসুম
ফুটবে যথা-তথা–
অনেক গন্ধ, অনেক মধু,
অনেক কোমলতা,
হে সংসার, হে লতা!
সে ফুল তোলার সময় তো আর
নাহি আমার হাতে।
আজকে আঁধার রাতে
আমার গোলাপ গেছে, কেবল
আছে বুকের ব্যথা,
হে সংসার, হে লতা!
স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Tulechhilem kushum tomar
He shongshar, he lota!
Porote mala bindhlo kanta
Bajlo buke byatha,
He shongshar, he lota!
Bela jokhon pore elo,
Andhar elo cheye,
Dekhi tokhon cheye–
Tomar golap gechhe, achhe
Amar buker byatha,
He shongshar, he lota!
Aro tomar onek kushum
Phutbe jotha-totha–
Onek gondho, onek modhu,
Onek komolota,
He shongshar, he lota!
She phul tolar shomoy to ar
Nahi amar hate.
Ajke andhar rate
Amar golap gechhe, kebol
Achhe buker byatha,
He shongshar, he lota!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- সংসার-লতা ও ক্ষণস্থায়ী গোলাপের রূপক:“তুলেছিলেম কুসুম তোমার / হে সংসার, হে লতা! / পরতে মালা বিঁধল কাঁটা / বাজল বুকে ব্যথা,”— সংসার যেন এক ফুলন্ত লতা, যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মানুষ জীবনের আনন্দ আহরণ করতে চায়। কিন্তু সেই আনন্দের মালা গলায় পরতে গিয়েই নেমে আসে কাঁটার আঘাত—যা সংসারের সুখের সাথে অনিবার্য দুঃখের সহাবস্থান নির্দেশ করে।
- সুখের বিনাশ ও বেদনার স্থায়িত্ব:“তোমার গোলাপ গেছে, আছে / আমার বুকের ব্যথা, / হে সংসার, হে লতা!”— কবিতার মূল দর্শনটি লুকিয়ে আছে ‘স্থায়ী’ ও ‘অস্থায়ী’-র দ্বন্দ্বে। গোলাপ ফুলটি (সুখ ও যৌবন) ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় তা দ্রুত ঝরে গিয়ে মিলিয়ে গেছে; কিন্তু তার কাঁটার ক্ষত ও হৃদয়ের হাহাকার রয়ে গেছে অক্ষত ও চিরস্থায়ী।
- সময় ফুরোনোর আক্ষেপ ও অন্ধকার রাত:“আরো তোমার অনেক কুসুম / ফুটবে যথা-তথা– / … সে ফুল তোলার সময় তো আর / নাহি আমার হাতে।”— সংসারে রূপ-রস-গন্ধের কোনো শেষ নেই, নতুন নতুন ফুল ফুটতেই থাকবে। কিন্তু কবির জীবনের বেলা শেষ হয়ে রাত নেমে এসেছে, নতুন করে সুখ কুড়োনোর সময় আর অবশিষ্ট নেই। জীবনের এই অন্তিমলগ্নে ক্ষণিক আনন্দের স্মৃতি নয়, কেবল অমলিন বুকের ব্যথাই মানুষের একমাত্র সম্বল হয়ে থাকে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।