শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ১০ সংখ্যক কবিতা হলো ‘তখন বয়স ছিল কাঁচা’। তারুণ্যের লাগামহীন দুঃসাহস, প্রেম ও অজানাকে ঘিরে মহাকাব্যিক রোমাঞ্চের বিপরীতে বার্ধক্যের তথ্যভারাক্রান্ত বাস্তবতা এবং রূপকথার হারিয়ে যাওয়া বিস্ময়বোধ এ কবিতায় চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্যে ধরা পড়েছে।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা কবিতা

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামতখন বয়স ছিল কাঁচা (১০ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক স্মৃতিচারণমূলক লিরিক (Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে যৌবন ও প্রৌঢ়ত্বের দৃষ্টিভঙ্গির গভীর ব্যবধানকে উন্মোচন করেছেন। কাঁচা বয়সে যখন বাস্তব সংসারের রূঢ় তথ্যগুলো জানা থাকে না, তখন মন থাকে বাঁধনহারা কল্পনায় পূর্ণ। ভালোবাসার সাথে তখন জড়িয়ে থাকে বুনো ঘোড়ায় চড়ে ডাকাত-হানা মাঠ পেরিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস কিংবা সোনার কাঠির খোঁজে সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার রূপকথা। কিন্তু অভিজ্ঞতার ভারে প্রৌঢ় বয়সে এসে জগত যখন ‘মার্কামারা খবরের মালখানা’য় পরিণত হয়, তখন অজানার সেই অপার রহস্য ও বিস্ময়রস কীভাবে স্তিমিত হয়ে আসে—তা-ই এই কবিতার মর্মবাণী।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা সম্পূর্ণ কবিতা:

তখন বয়স ছিল কাঁচা;

কতদিন মনে মনে এঁকেছি নিজের ছবি,

বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার,

জিন নেই, লাগাম নেই,

ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে

ভরসন্ধ্যেবেলায়;

ঘোড়ার খুরে উড়ছে ধুলো

ধরণী যেন পিছু ডাকছে আঁচল দুলিয়ে।

আকাশে সন্ধ্যার প্রথম তারা

দূরে মাঠের সীমানায় দেখা যায়

একটিমাত্র ব্যগ্র বিরহী আলো একটি কোন্‌ ঘরে

নিদ্রাহীন প্রতীক্ষায়।

যে ছিল ভাবীকালে

আগে হতে মনের মধ্যে

ফিরছিল তারি আবছায়া,

যেমন ভাবী আলোর আভাস আসে

ভোরের প্রথম কোকিল-ডাকা অন্ধকারে।

তখন অনেকখানি সংসার ছিল অজানা,

আধ্‌জানা।

তাই অপরূপের রাঙা রঙটা

মনের দিগন্ত রেখেছিলে রাঙিয়ে;

আসন্ন ভালোবাসা

এনেছিল অঘটন-ঘটনার স্বপ্ন।

তখন ভালোবাসার যে কল্পরূপ ছিল মনে

তার সঙ্গে মহাকাব্যযুগের

দুঃসাহসের আনন্দ ছিল মিলিত।

এখন অনেক খবর পেয়েছি জগতের,

মনে ঠাওরেছি

সংসারের অনেকটাই মার্কামারা খবরের

মালখানা।

মনের রসনা থেকে

অজানার স্বাদ গেছে মরে,

অনুভবে পাইনে

ভালোবাসায় সম্ভবের মধ্যে

নিয়তই অসম্ভব,

জানার মধ্যে অজানা,

কথার মধ্যে রূপকথা।

ভুলেছি প্রিয়ার মধ্যে আছে সেই নারী,

যে থাকে সাত সমুদ্রের পারে,

সেই নারী আছে বুঝি মায়ার ঘুমে,

যার জন্যে খুঁজতে হবে সোনার কাঠি।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের তখন বয়স ছিল কাঁচা সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Tokhon boyosh chhilo kancha;
Kotodin mone mone enkechhi nijer chobi,
Buno ghorar pithe sowar,
Jin nei, lagam nei,
Chhutechhi dakat-hana mather majhkhan diye
Bhorshondhyebelay;
Ghorar khure urchhe dhulo
Dhoroni jeno pichhu dakchhe anchol duliye.
Akashe shondhyar prothom tara
Dure mather shimanay dekha jay
Ektimatro byagro birohi alo ekti kon ghore
Nidrahin prottikkhay.
Je chhilo bhabikale
Age hote moner moddhye
Phirchhilo tari abchhaya,
Jemon bhabi alor abhash ashe
Bhorer prothom kokil-daka ondhokare.
Tokhon onekkhani shongshar chhilo ojana,
Adh-jana.
Tai oporuper ranga rongta
Moner digonto rekhechhile rangiye;
Ashonno bhalobasha
Enechhilo oghoton-ghotonar swopno.
Tokhon bhalobashar je kolporup chhilo mone
Tar shonge mohakabbojuger
Duhshaho-sher anondo chhilo milito.
Ekhon onek khobor peyechhi jogoter,
Mone thaorechhi
Shongsharer onektai markamara khoborer
Malkhana.
Moner roshona theke
Ojanar shad gechhe more,
Onubhobe paine
Bhalobashay shombhobe-r moddhye
Niyot-i oshombhob,
Janar moddhye ojana,
Kothar moddhye rupkotha.
Bhulechhi priyar moddhye achhe shei nari,
Je thake shat shomudrer pare,
Shei nari achhe bujhi mayar ghume,
Jar jonnye khunjte hobe shonar kathi.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • তারুণ্যের দুঃসাহসিক রূপকথা:
    “বুনো ঘোড়ার পিঠে সওয়ার, / জিন নেই, লাগাম নেই, / ছুটেছি ডাকাত-হানা মাঠের মাঝখান দিয়ে / ভরসন্ধ্যেবেলায়;”
    — কাঁচা বয়সের মন কোনো বাস্তব বাধা বা সামাজিক শৃঙ্খল মানে না। লাগামহীন ঘোড়ায় চড়ে বিপদসংকুল পথে ছুটে যাওয়া এবং দূর দিগন্তের বিরহী আলোর পানে অভিসার—তারুণ্যের প্রেমকে মহাকাব্যের রোমাঞ্চকর বীরত্বে ভূষিত করেছিল।
  • অজানার সৌন্দর্য ও অঘটন-ঘটন ভাবনা:
    “তখন অনেকখানি সংসার ছিল অজানা, / আধ্‌জানা। / তাই অপরূপের রাঙা রঙটা / মনের দিগন্ত রেখেছিলে রাঙিয়ে;”
    — জীবনের সমস্ত তথ্য না জানার ফলেই তরুণ মন অজানার রঙে কল্পনার দিগন্ত রাঙিয়ে তুলতে পারে। সেই অপূর্ণ জানাই ছিল সকল অলৌকিক কল্পনা ও তীব্র অনুভূতির প্রধান উৎস।
  • বাস্তবতার মালখানা ও রূপকথার অবলুপ্তি:
    “সংসারের অনেকটাই মার্কামারা খবরের / মালখানা। / … ভুলেছি প্রিয়ার মধ্যে আছে সেই নারী, / যে থাকে সাত সমুদ্রের পারে, / সেই নারী আছে বুঝি মায়ার ঘুমে, / যার জন্যে খুঁজতে হবে সোনার কাঠি।”
    — পরিপক্ক বয়সে এসে পার্থিব জগতের কার্যকারণ ও তথ্যের ভারে মন তার কল্পনাশূন্য রূপ ধারণ করে। প্রাত্যহিক চেনা প্রিয়ার মাঝে সাত সমুদ্র পারের মায়াময় রূপকথার রাজকন্যাকে খুঁজে পাওয়ার সেই দুর্লভ প্রেরণা আজ বাস্তবতার ভিড়ে বিস্মৃত।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন