বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ (১৯০৬) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আধ্যাত্মিক এবং সমর্পণমূলক কবিতা হলো ‘দুঃখমূর্তি’। এই কবিতায় কবি জীবনের দুঃখ, কষ্ট বা মৃত্যুকে নেতিবাচক কিছু হিসেবে না দেখে, তাকে পরম ঈশ্বরেরই একটি ভিন্ন রূপ বা আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ঈশ্বর কেবল সুখেই নয়, নিবিড় যন্ত্রণার মাঝেও যে মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন—এই গভীর দর্শনই এখানে মূর্ত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | দুঃখমূর্তি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | খেয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯০৬ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আত্মনিবেদন, আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক গীতি-কবিতা (Devotional, Spiritual and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
দুঃখমূর্তি – সম্পূর্ণ কবিতা
দুখের বেশে এসেছ বলে
তোমারে নাহি ডরিব হে।
যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা
নিবিড় ক’রে ধরিব হে।
আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী,
তোমারে তবু চিনিব আমি;
মরণরূপে আসিলে প্রভু,
চরণ ধরি মরিব হে–
যেমন করে দাও-না দেখা
তোমারে নাহি ডরিব হে।
নয়নে আজি ঝরিছে জল,
ঝরুক জল নয়নে হে।
বাজিছে বুকে, বাজুক তব
কঠিন বাহুবাঁধনে হে।
তুমি যে আছ বক্ষে ধরে
বেদনা তাহা জানাক মোরে,
চাব না কিছু, কব না কথা,
চাহিয়া রব বদনে হে।
নয়নে আজি ঝরিছে জল,
ঝরুক জল নয়নে হে।

Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- দুঃখ ও মৃত্যুর মাঝে ঈশ্বর দর্শন:
“দুখের বেশে এসেছ বলে / তোমারে নাহি ডরিব হে। / যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা / নিবিড় ক’রে ধরিব হে।”— কবি ঈশ্বরকে বলছেন যে, তিনি দুঃখের রূপ ধরে এলেও কবি তাঁকে ভয় পাবেন না। বরং জীবনের যেখানে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা বা ব্যথা, কবি সেখানেই ঈশ্বরকে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরতে চান।
- অন্ধকার ও মৃত্যুতে সমর্পণ:
“আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, / তোমারে তবু চিনিব আমি; / মরণরূপে আসিলে প্রভু, / চরণ ধরি মরিব হে–“— ঈশ্বর যদি অন্ধকার বা মৃত্যুর বেশেও আসেন, তবুও কবির চোখ তাঁকে ঠিকই চিনে নেবে। তখন কবি ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে বরং মৃত্যুর বেশে আসা সেই ঈশ্বরের চরণ ধরেই হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করবেন বা নিজেকে সমর্পণ করবেন।
- যন্ত্রণার মাঝে ঐশ্বরিক উপস্থিতির উপলব্ধি:
“বাজিছে বুকে, বাজুক তব / কঠিন বাহুবাঁধনে হে। / তুমি যে আছ বক্ষে ধরে / বেদনা তাহা জানাক মোরে,”— কবির বুকে যে কষ্ট বা যন্ত্রণা বাজছে, তা আসলে ঈশ্বরেরই কঠিন আলিঙ্গন বা বাহুবাঁধন। এই বেদনাই কবিকে মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর তাঁকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। তাই কবি কোনো অভিযোগ না করে, ঈশ্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতে চান।
