বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতালি’ (১৯১৪) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘চোখে দেখিস, প্রাণে কানা’। এই কবিতায় বাহ্যিক দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা এবং অন্তর্দৃষ্টি বা হৃদয়ের অনুভূতির মাধ্যমে পরম সত্তাকে বা পৃথিবীর প্রকৃত সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার কথা বলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামচোখে দেখিস, প্রাণে কানা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থগীতালি
প্রকাশের বছর১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধ্যাত্মিক ও দর্শনমূলক গীতি-কবিতা (Spiritual and Philosophical Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘গীতালি’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বর ও অসীমের সাথে মানুষের অন্তরের নিবিড় সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। ‘চোখে দেখিস, প্রাণে কানা’ কবিতায় কবি বলেছেন যে মানুষ সাধারণত তার বাইরের চোখ দিয়ে জগতকে দেখে, কিন্তু অন্তরের দৃষ্টি বা ‘প্রাণ’ দিয়ে তার আসল রূপটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। অথচ পরম সত্তা বা অসীম সৌন্দর্য মানুষের হৃদয়ের সাথেই গাঁথা আছে। মানুষ যদি তার হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়, তবে বাইরের রূপে-রসে লুকিয়ে থাকা সেই অজানা পরম সত্তাকে সে খুব সহজেই নিজের অন্তরে অনুভব করতে পারবে।

চোখে দেখিস, প্রাণে কানা – সম্পূর্ণ কবিতা

চোখে দেখিস, প্রাণে কানা।
হিয়ার মাঝে দেখ্‌-না ধরে
ভুবনখানা।
প্রাণের সাথে সে যে গাঁথা,
সেথায় তারি আসন পাতা,
বাইরে তারে রাখিস তবু–
অন্তরে তার যেতে মানা?
তারি কণ্ঠে তোমার বাণী,
তোরি রঙে রঙিন তারি
বসনখানি।
যে জন তোমার বেদনাতে
লুকিয়ে খেলে দিনে রাতে
সামনে যে ওই রূপে রসে
সেই অজানা হল জানা।

Romanized Version

Chokhe dekhish, prane kana.
Hiyar majhe dekh-na dhore
Bhubonkhana.
Praner shathe she je gnatha,
Shethay tari ashon pata,
Baire tare rakhish tobu–
Ontore tar jete mana?
Tari konthe tomar bani,
Tori ronge rongin tari
Boshonkhani.
Je jon tomar bedonate
Lukiye khele dine rate
Shamne je oi rupe roshe
Shei ojana holo jana.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • বাহ্যিক দৃষ্টি বনাম অন্তর্দৃষ্টি:
    “চোখে দেখিস, প্রাণে কানা। / হিয়ার মাঝে দেখ্‌-না ধরে / ভুবনখানা।”
    — মানুষ বাইরের চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবী দেখে ঠিকই, কিন্তু অন্তরের দৃষ্টি বা প্রাণের দিক থেকে সে যেন অন্ধ। কবি তাই মানুষকে তার হৃদয়ের মাঝে পুরো ভুবন বা পৃথিবীর প্রকৃত সৌন্দর্যকে ধারণ করে দেখতে বলেছেন।
  • অন্তরে পরম সত্তার উপস্থিতি:
    “প্রাণের সাথে সে যে গাঁথা, / সেথায় তারি আসন পাতা, / বাইরে তারে রাখিস তবু– / অন্তরে তার যেতে মানা?”
    — সেই পরম সত্তা বা ঈশ্বর তো মানুষের প্রাণের সাথেই গাঁথা এবং মানুষের হৃদয়েই তাঁর আসন পাতা রয়েছে। অথচ মানুষ তাঁকে কেবল বাইরের জগতেই খুঁজে বেড়ায় এবং নিজের অন্তরে তাঁকে প্রবেশ করতে দেয় না।
  • অসীমের সাথে সীমার একাত্মতা:
    “যে জন তোমার বেদনাতে / লুকিয়ে খেলে দিনে রাতে / সামনে যে ওই রূপে রসে / সেই অজানা হল জানা।”
    — মানুষের কণ্ঠের বাণী এবং রূপের রঙের মাধ্যমেই সেই অসীম নিজেকে প্রকাশ করেন। মানুষের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ ও বেদনার মাঝে যে পরম সত্তা লুকিয়ে খেলা করেন, তিনিই চারপাশের রূপে-রসে মানুষের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠেন এবং সেই অজানা ঈশ্বর মানুষের কাছে জানা হয়ে যান।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (গীতালি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ এবং ‘চো-খে’, ‘প্রা-ণে’, ‘কবি-তা’ শব্দের অনাকাঙ্ক্ষিত হাইফেন পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন