চৈতালী কাব্যগ্রন্থের অভিমান কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম তীক্ষ্ণ, আত্মমর্যাদাবোধক ও প্রতিবাদী কবিতা হলো ‘অভিমান’। ১৮৯৬ সালের আশ্বিন মাসে (১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থে সর্বমোট ৭৮টি কবিতা রয়েছে। এটি রবীন্দ্রসাহিত্যের বিখ্যাত “চিত্রা-চৈতালি পর্ব”-এর অন্তর্গত একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টি।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅভিমান
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থচৈতালী
প্রকাশের বছর১৮৯৬ (আশ্বিন ১৩০৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআত্মমর্যাদা ও বাস্তববাদী লিরিক কবিতা (Self-respect and Realistic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ পর্বে রচিত প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য, মানবজীবন এবং আত্মিক উপলব্ধির এক অনন্য নিদর্শন। এই গ্রন্থে প্রকৃতির শান্ত রূপের পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্ব, আত্মসম্মান এবং দুর্বলতার বিরুদ্ধে এক ধরনের কঠোর বাস্তববোধও ফুটে উঠেছে। ‘অভিমান’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে নিজের অধিকার বা সম্মান রক্ষার শক্তি যদি নিজের হাতে না থাকে, তবে কেবল বৃথা আস্ফালন, কান্না বা নালিশ করে কোনো লাভ নেই। আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে হলে নীরবতা বা শক্তির প্রয়োজন, ভীরু কান্নাকাটি নয়।

অভিমান – সম্পূর্ণ কবিতা

কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ!
বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ।
যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ,
কেহ কভু তাহাদের করে নি সম্মান।
যতই কাগজে কাঁদি, যত দিই গালি,
কালামুখে পড়ে তত কলঙ্কের কালি।
যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ
তারি কাছে তারি ‘পরে তোমার নালিশ!
নিজের বিচার যদি নাই নিজহাতে,
পদাঘাত খেয়ে যদি না পার ফিরাতে–
তবে ঘরে নতশিরে চুপ করে থাক্‌,
সাপ্তাহিকে দিগ্‌বিদিকে বাজাস নে ঢাক।
একদিকে অসি আর অবজ্ঞা অটল,
অন্য দিকে মসী আর শুধু অশ্রুজল।

অভিমান Romanized Version

Kare dibo dosh bondhu, kare dibo dosh!
Britha kor ashfalon, britha kor rosh.
Jara shudhu more kintu nahi dey pran,
Keho kobhu tahader kore ni shomman.
Jotoi kagoge kadi, joto di gali,
Kalamukhe pore toto kolonker kali.
Je tomare opoman kore ohornish
Tari kache tari ‘pore tomar nalish!
Nijer bichar jodi nai nij-hate,
Podaghat kheye jodi na paro firate–
Tobe ghore notoshire chup kore thak,
Shaptahike dig-bidike bajas ne dhak.
Ekdike oshi ar obogga otol,
Onya dike moshi ar shudhu oshrujol.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • বৃথা আস্ফালন ও নালিশের অসারতা:
“কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ! / বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ।”

— অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে বা রাগ দেখিয়ে কোনো ফল হয় না। যাঁরা আত্মত্যাগী নন বা প্রাণের বিনিময়ে সম্মান অর্জন করতে জানেন না, তাঁদের জন্য সমাজের কেউ সম্মান দেখায় না।

  • অন্যায়কারীর কাছে বিচার প্রার্থনা:

“যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ / তারি কাছে তারি ‘পরে তোমার নালিশ!”

— যিনি প্রতিনিয়ত অপমান করছেন, তাঁরই কাছে গিয়ে নিজের অপমানের নালিশ জানানো চরম হীনতা ও বোকামি।

  • ত্মসম্মান ও নীরবতা:

“নিজের বিচার যদি নাই নিজহাতে, / পদাঘাত খেয়ে যদি না পার ফিরাতে– / তবে ঘরে নতশিরে চুপ করে থাক্‌, /াপ্তাহিকে দিগ্‌বিদিকে বাজাস নে ঢাক।”

— নিজের অপমান বা অবিচারের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা বা শক্তি যদি নিজের হাতে না থাকে, তবে ঢাক পিটিয়ে চারদিকে কান্নাকাটি না করে নীরবে ঘরে থাকা অনেক বেশি সম্মানের।

  • শক্তি বনাম দুর্বলতা: কবিতার শেষাংশে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, একদিকে রয়েছে বাহুবল ও অটল অবজ্ঞা (অসি), আর অন্যদিকে রয়েছে কেবল কালির দাগ (মসী) ও নিষ্ফল অশ্রুজল। বাস্তব জগতের এই নির্মম সত্যই এই কবিতার মূল বাণী।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন