বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছড়ার ছবি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত নিসর্গকেন্দ্রিক, প্রতীকী ও স্বতন্ত্র মেজাজের কবিতা হলো ‘তালগাছ’। এই কবিতায় গ্রামীণ প্রকৃতির সাধারণ পরিধির মাঝে মাটির গাছের সাথে তালগাছের এক অদ্ভুত দূরত্ব, তার ঊর্ধ্বারোহী একাগ্রতা এবং বৈরাগ্যময় সন্ন্যাসীর রূপ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | তালগাছ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ছড়ার ছবি |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৭ (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | নিসর্গ-প্রকৃতি ও প্রতীকী গীতি-কবিতা (Nature and Symbolic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘ছড়ার ছবি’ কাব্যগ্রন্থটিতে কবির পল্লিপ্রকৃতির নিভৃত রূপ এবং গাছপালার লৌকিক জীবনের এক গভীর অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে। আমগাছের স্নিগ্ধ ছায়া, ঘাসের আঙিনা এবং চেনা পরিবেশের পাশে তালগাছ যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্তা। তার লম্বা, ঋজু ও উদাসীন রূপ কবিকে এক অদ্ভুত বৈরাগ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পার্থিব মোক্ষ বা মোহের বাইরে গিয়ে আকাশের পানে চেয়ে থাকা তালগাছটি যেন প্রকৃতির এক ঊর্ধ্বারুক্ষ সন্ন্যাসী।
তালগাছ কবিতা (সম্পূর্ণ)
বেড়ার মধ্যে একটি আমের গাছে
গম্ভীরতায় আসর জমিয়ে আছে।
পরিতৃপ্ত মূর্তিটি তার তৃপ্ত চিকন পাতায়,
দুপুরবেলায় একটুখানি হাওয়া লাগছে মাথায়।
মাটির সঙ্গে মুখোমুখি ঘাসের আঙিনাতে
সঙ্গিনী তার শ্যামল ছায়া, আঁচলখানি পাতে।
গোরু চরে রৌদ্রছায়ায় সারা প্রহর ধরে;
খাবার মতো ঘাস বেশি নেই, আরাম শুধুই চ’রে।
পেরিয়ে বেড়া ঐ যে তালের গাছ,
নীল গগনে ক্ষণে ক্ষণে দিচ্ছে পাতার নাচ।
আশেপাশে তাকায় না সে, দূরে-চাওয়ার ভঙ্গী,
এমনিতরো ভাবটা যেন নয় সে মাটির সঙ্গী।
ছায়াতে না মেলায় ছায়া বসন্ত-উৎসবে,
বায়না না দেয় পাখির গানের বনের গীতরবে।
তারার পানে তাকিয়ে কেবল কাটায় রাত্রিবেলা,
জোনাকিদের ‘পরে যে তার গভীর অবহেলা।
উলঙ্গ সুদীর্ঘ দেহে সামান্য সম্বলে
তার যেন ঠাঁই ঊর্ধ্ববাহু সন্ন্যাসীদের দলে।

তালগাছ কবিতার Romanized Version:
Bedar modhye ekti amer gachhe
Gombhirtay asor jomiye achhe.
Poritripto murtiti tar tripto chikon patay,
Dupurbelay ektukhani hawa lagchhe mathay.
Matir shonge mukhomukhi ghaser anginate
Shongini tar shyamol chhaya, acholkhani pate.
Goru chore roudro-chhayay shara prohor dhore;
Khabar moto ghas beshi nei, aram shudhui ch’re.
Periye beda oi je taler gachh,
Nil gogone khone khone dicchhe patar nach.
Ashepashe takay na se, dure-chawar vhongi,
Emontoro vhabta jeno noy se matir shongi.
Chhayate na melay chhaya boshonto-utshebe,
Bayna na dey pakhir ganer boner gitrobe.
Tarar pane takiye kebol katay ratribela,
Jonakider ‘pore je tar gobhir obhela.
Ulongo shudirgh dehe shamanno shombole
Tar jeno thai urdhbahu shonnyasider dole.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
আমগাছের সংসারী রূপ ও স্নিগ্ধতা:
“বেড়ার মধ্যে একটি আমের গাছে / গম্ভীরতায় আসর জমিয়ে আছে। … সঙ্গিনী তার শ্যামল ছায়া, আঁচলখানি পাতে।”
— কবিতার শুরুতে আমের গাছটি মাটির কাছাকাছি থেকে ছায়া দিয়ে, ঘাসের আঙিনায় এক পরম তৃপ্ত ও সংসারী পরিবেশ তৈরি করেছে। গোরু চরা এবং ছায়ার আয়েশের মধ্য দিয়ে সেখানে একটি নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবন প্রকাশ পেয়েছে।
তালগাছের স্বতন্ত্র ও উদাসীন সত্তা:
“পেরিয়ে বেড়া ঐ যে তালের গাছ, / নীল গগনে ক্ষণে ক্ষণে দিচ্ছে পাতার নাচ। / আশেপাশে তাকায় না সে, দূরে-চাওয়ার ভঙ্গী, / এমনিতরো ভাবটা যেন নয় সে মাটির সঙ্গী।”
— বেড়া পেরিয়ে থাকা তালগাছটি কিন্তু আমের গাছের মতো মাটির মায়ায় আবদ্ধ নয়। তার দৃষ্টি সুদূর নীল গগনের পানে। আশেপাশের পার্থিব জিনিসের প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, যেন সে এই মাটির দুনিয়ার কেউ নয়।
পার্থিব উৎসব ও মোহের প্রতি অবহেলা:
“ছায়াতে না মেলায় ছায়া বসন্ত-উৎসবে, / বায়না না দেয় পাখির গানের বনের গীতরবে। / তারার পানে তাকিয়ে কেবল কাটায় রাত্রিবেলা, / জোনাকিদের ‘পরে যে তার গভীর অবহেলা।”
— বসন্তের উৎসবে সে অন্য গাছের সাথে ছায়া মেলায় না, পাখির গানেও তার কোনো আগ্রহ নেই। মাটিতে জোনাকির আলো বা মায়ার প্রতি তার গভীর অবহেলা রয়েছে; সে কেবল রাতের আকাশে তারার পানে তাকিয়ে কাটিয়া দেয়।
ঊর্ধ্বারুক্ষ সন্ন্যাসীর প্রতীক:
“উলঙ্গ সুদীর্ঘ দেহে সামান্য সম্বলে / তার যেন ঠাঁই ঊর্ধ্ববাহু সন্ন্যাসীদের দলে।”
— সমস্ত শাখা-প্রশাখা ও মোহের বিস্তার বাদ দিয়ে তার ওই সোজা ও লম্বা উলঙ্গ দেহ নিয়ে তালগাছটি যেন প্রকৃতির মাঝে এক তপস্বী বা ‘ঊর্ধ্বারুক্ষ সন্ন্যাসীর’ মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ছড়ার ছবি কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।