দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার – পূজা পর্যায়ের গান, ১৯ [ Dariye Acho Tumi ]

বাংলা সংগীতের আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক ধারায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে’ এক অনন্য এবং চিরন্তন সৃষ্টি। গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ের এই গানটিতে স্রষ্টার প্রতি ভক্তের গভীর অনুরাগ, আত্মনিবেদন এবং মিলনের এক অলৌকিক আর্তি প্রকাশ পেয়েছে। জাগতিক কোলাহল থেকে দূরে শান্তিময় এক মনোজাগতিক পরিবেশে রচিত এই গানটি আজও শ্রোতার হৃদয়কে এক পরম প্রশান্তির জগতে নিয়ে যায়।

গানের মূল তথ্য

| গানের নাম | দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে |

| গীতিকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| পর্যায় ও নম্বর | পূজা পর্যায় (১৯) |

| রাগ ও তাল | ইমন ও ত্রিতাল |

| স্বরলিপিকার | ইন্দিরা দেবী ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| রচনাকাল ও স্থান | ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ (১৩২০ বঙ্গাব্দ), শান্তিনিকেতন |

গানের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

এই অসামান্য গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩২০ বঙ্গাব্দে) শান্তিনিকেতনের প্রশান্ত পরিবেশে রচনা করেছিলেন। গানটি গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ে সংকলিত ৬২৯টি ভক্তিমূলক গানের মধ্যে অন্যতম। পূজা পর্বের গানগুলোতে কবি ঈশ্বরপ্রেম, শ্রদ্ধা এবং পরম পুরুষের প্রতি তর্পণের জন্য জ্ঞান ও মুক্তির প্রার্থনা করেছেন। কবির এই গানগুলোকে প্রার্থনা, বিরহ, দুঃখ, আত্মবোধন প্রভৃতি ভাগে বিভাজিত করা গেলেও, এর প্রতিটি ছত্রে এক অচ্ছেদ্য প্রেম বিদ্যমান।

রবীন্দ্রনাথের মতে, একদিকে যা পূজা, অন্যদিকে সেটাই প্রেম। এরা যেন একই বৃন্তের দুটি ফুল, সহযোগী এবং আলিঙ্গনাবদ্ধ। এই গানেও ঈশ্বর প্রেমের পাশাপাশি মানুষের অন্তরের চিরন্তন বিরহ ও আকুলতা এমনভাবে মিশে আছে যে, একে প্রকৃত অর্থে কেবল ভক্তিগীতি বা কেবল প্রেমের গান হিসেবে আলাদা করা কঠিন। মনের ভেতর স্রষ্টার চরণধ্বনি শোনার এক গভীর ব্যাকুলতা থেকেই কবি এই সুরের জাল বুনেছেন।

গানের সঠিক লিরিক ও কথা

দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার লিরিক্স বাংলা সংস্করণ

দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে

আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে।

বাতাস বহে মরি মরি, আর বেঁধে রেখো না তরী

এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয়মাঝারে।

তোমার সাথে গানের খেলা দূরের খেলা যে,

বেদনাতে বাঁশি বাজায় সকল বেলা যে।

কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি

আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে।

Dariye Acho Tumi Amar Romanized Version

Dariye acho tumi amar ganer opare

Amar surguli pay choron, ami pai ne tomare.

Batas bohe mori mori, ar bedhe rekho na tori

Eso eso par hoye mor hridoymajhare.

Tomar sathe ganer khela durer khela je,

Bedonate bashi bajay sokol bela je.

Kobe niye amar bashi bajabe go apni asi

Anondomoy nirob rater nibir adhare.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

গানটির সুর হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত সুপরিচিত ‘ইমন’ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ‘ত্রিতাল’-এর মাধ্যমে গীত হয়। রাগ ইমনের শান্ত, গম্ভীর ও করুণ রস গানের আধ্যাত্মিক আর্তি ও আকুলতাকে আরও গভীর করে তোলে। ধ্রুপদী অঙ্গের সুর বিন্যাস থাকার কারণে এই গান গাওয়ার সময় এক ধরণের ধ্যানমগ্ন আবহ তৈরি হয়, যা মনকে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে এক ঐশ্বরিক আলোর দিকে নিয়ে যায়।

গানের মূল ভাবটি আবর্তিত হয়েছে ঈশ্বরের সাথে মানুষের দূরত্বের বেদনা এবং মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে। কবি এখানে অনুভব করেছেন যে তাঁর সৃষ্ট সুর স্রষ্টার চরণ স্পর্শ করতে পারলেও, তিনি নিজে সেই পরমেশ্বরকে ছুঁতে পারছেন না। এই দূরত্ব ঘোচানোর জন্য তিনি স্রষ্টাকে অনুরোধ করেছেন তরী বা নৌকা ভাসিয়ে সরাসরি তাঁর হৃদয়মাঝারে এসে ধরা দিতে। দিনের আলোয় যে গানের খেলা কেবল দূরের মনে হয়, নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে পরম সত্তা নিজে এসে সেই শূন্যতা পূরণ করবেন, এই আশাবাদই গানে মূর্ত হয়েছে।

এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর রূপকধর্মী সহজ শব্দচয়ন এবং রাগাশ্রয়ী সুরের গাম্ভীর্য। এখানে আলো, ধূলি, ঘাস কিংবা তরীর মতো সাধারণ জাগতিক অনুষঙ্গকে কবি আধ্যাত্মিক সাধনার স্তরে উন্নীত করেছেন। সুরের গুরু বা সৃষ্টিকর্তার কাছে এই আত্মনিবেদন কেবল একটি গান নয়, বরং এটি মানবাত্মার চিরন্তন মুক্তির এক কাব্যিক ও সাঙ্গীতিক প্রার্থনা।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক, স্বরলিপি এবং ভাবার্থ সংক্রান্ত তথ্যসমূহ রবীন্দ্র-রচনাবলী (গীতবিতান, পূজা পর্যায়), বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড প্রকাশিত প্রামাণ্য স্বরলিপি গ্রন্থমালা এবং শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

 

 

মন্তব্য করুন