বিশ্বপ্রকৃতির চিরন্তন উৎসব ও অনন্ত প্রাচুর্যের বিপরীতে মানবাত্মার অপূর্ণতা এবং পরমতৃষ্ণার এক গভীর আর্তিপ্রধান উপাসনাগীতি “নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূজা পর্বের (ভক্তিগীতি উপ-পর্যায়) এই গানে ভক্ত তার আত্মাকে বিশ্বচরাচরের সহজিয়া নিয়মের সাথে তুলনা করেছে। নিখিল সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত ফুল ফুটছে, নদী সমুদ্রে ধাবিত হচ্ছে, পাখি আনন্দে গান গাইছে—তবুও মানুষের মন যেন এক ‘হৃদয়ভিক্ষু’ হয়ে দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকে। ঈশ্বরের সেই অফুরান অমৃতধারার সাথে নিজের চিত্তকে একীভূত করার এবং অনন্ত সভায় নিজের কণ্ঠ তুলে ধরার যে পরম আকুতি, তা গানটিতে এক নিবিড় ও সুরময় প্রার্থনার রূপ ধারণ করেছে।
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| শিরোনাম | নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে |
| পর্যায় | পূজা পর্যায় (গান সংখ্যা: ৩৫৯) |
| উপ-পর্যায় | ভক্তিগীতি / প্রার্থনা |
| রাগ | ইমন-বাউল |
| তাল | একতাল (১২ মাত্রা: ২+২+২+২+২+২) |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ২৯ আশ্বিন, ১৩২০ বঙ্গাব্দ |
| রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ) | ১৫ অক্টোবর, ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ |
| রচনাস্থান | শান্তিনিকেতন |
| স্বরলিপিকার | শুভোপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় (প্রচলিত সংস্করণ) |
| আকর গ্রন্থ | গীতবিতান (পূজা পর্যায়) ও স্বরবিতান |
| মূল উপজীব্য | আধ্যাত্মিক আর্তি, ভক্তের মধুর অভিমান, নিখিল প্রকৃতির সাথে আত্মার যোগ ও অহৈতুকী কৃপাপ্রার্থনা |
Table of Contents
নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে – গানের লিরিক্স
নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে
তারি মধু কেন মনমধুপে খাওয়াও না?
নিত্যসভা বসে তোমার প্রাঙ্গণে,
তোমার ভৃত্যের সেই সভায় কেন গাওয়াও না?।।
বিশ্বকমল ফুটে চরণচুম্বনে,
সে যে তোমার মুখে মুখ তুলে চায় উন্মনে,
আমার চিত্ত-কমলটিরে সেই রসে
কেন তোমার পানে নিত্য-চাওয়া চাওয়াও না?।।
আকাশে ধায় রবি-তারা-ইন্দুতে,
তোমার বিরামহারা নদীরা ধায় সিন্ধুতে,
তেমনি করে সুধাসাগর-সন্ধানে
আমার জীবনধারা নিত্য কেন ধাওয়াও না?।।
পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ,
তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ,
তেমনি করে আমার হৃদয়ভিক্ষুরে
কেন দ্বারে তোমার নিত্যপ্রসাদ পাওয়াও না?।।
Nityo Tomar Je Phul Phote – Ganer Lyrics
Nityo tomar je phul phote phulobone
Tari madhu keno monomodhupe khawao na?
Nityosobha bose tomar prangone,
Tomar bhrityer shei sobhay keno gawao na?
Bishwokomol phute choronchumbone,
She je tomar mukhe mukh tule chay unmone,
Amar chit-komoltire shei rose
Keno tomar pane nityo-chawa chawao na?
Akashe dhay robi-tara-indute,
Tomar biramhara nodira dhay sindhute,
Temni kore sudhasagor-shondhane
Amar jibondhara nityo keno dhawao na?
Pakhir konthe aponi jagao anondo,
Tumi phuler bokkhe bhoriya dao sugondho,
Temni kore amar hridoybhikkure
Keno dware tomar nityoprosad pawao na?
গানের মূল ভাব
“নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে” গানটির মূল নির্যাস হলো প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তি ও রূপের সাথে মানুষের সচেতন মনের বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং সেই ব্যবধান দূর করার আকুল মিনতি। বিশ্বচরাচর কোনো দ্বিধা ছাড়াই ঈশ্বরের নিয়ম ও প্রেমে সমর্পিত। ফুল ফুটলেই সুবাস ছড়ায়, বিশ্বকমল চরণে চুম্বন করে সূর্যের পানে চেয়ে থাকে, নদী বিশ্রামহীনভাবে ছুটে চলে সাগরের দিকে, এবং পাখি মনের আনন্দে কলরব করে।
কিন্তু মানুষের অহংকার ও সংস্কারাচ্ছন্ন মন সেই অবাধ আনন্দধারা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত থাকে। তাই ভক্তের মনে জেগে ওঠে এক মধুর ‘অভিমান’—ঈশ্বরের কাছে এক ব্যাকুল প্রশ্ন: সৃষ্টিজগতের সর্বত্র যখন আনন্দের মেলা, তখন এই ‘হৃদয়ভিক্ষু’ কেন তৃষ্ণার্ত থাকবে? নিজের ভেতরের ক্ষুদ্র চিত্ত-কমলটিকে বিশ্বকমলের মতো ঈশ্বরের মুখপানে তুলে ধরার এবং জীবনের সমস্ত কর্মধারাকে পরম সুধাসাগরে সমর্পণ করার আর্তিই গানটির মূল দার্শনিক সুর।
চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ
১. বিশ্বপ্রাঙ্গণের নিত্যসভা ও সেবকের অধিকার
- “নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে, তারি মধু কেন মনমধুপে খাওয়াও না? / নিত্যসভা বসে তোমার প্রাঙ্গণে, তোমার ভৃত্যের সেই সভায় কেন গাওয়াও না?…”গানটির সূচনাই হয় ঈশ্বরের সাথে ভক্তের এক গভীর আত্মিক অধিকারবোধ থেকে। মন যেন এক মৌমাছি (মনমধুপ), যে বিশ্বপ্রকৃতির সুধাপানের জন্য ব্যাকুল। নিখিল বিশ্ব যেখানে এক চিরন্তন আনন্দসভা, সেখানে একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য হয়েও কেন ভক্ত নিজের কণ্ঠ সেই মহাগানে মেলাতে পারছে না—এই প্রশ্ন কোনো বিদ্রোহ নয়, বরং পরম নির্ভরতার আর্তি।
২. বিশ্বকমল বনাম চিত্ত-কমল
- “বিশ্বকমল ফুটে চরণচুম্বনে, সে যে তোমার মুখে মুখ তুলে চায় উন্মনে / আমার চিত্ত-কমলটিরে সেই রসে কেন তোমার পানে নিত্য-চাওয়া চাওয়াও না?…”এক অনুপম রূপক। সমগ্র দৃশ্যমান বিশ্ব হলো এক প্রস্ফুটিত পদ্ম (বিশ্বকমল), যা পরমেশ্বরের চরণে স্থান পেয়ে একমনে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সাধক চায় তার অন্তরের নিজস্ব পদ্মটিও (চিত্ত-কমল) যেন পার্থিব মোহ ভুলে কেবল সেই পরম সত্যের দিকেই অনিমেষ চেয়ে থাকে।
৩. মহাজাগতিক প্রবাহ ও জীবনের সুধাসন্ধান
- “আকাশে ধায় রবি-তারা-ইন্দুতে, তোমার বিরামহারা নদীরা ধায় সিন্ধুতে / তেমনি করে সুধাসাগর-সন্ধানে আমার জীবনধারা নিত্য কেন ধাওয়াও না?…”মহাজাগতিক গতির সাথে মানবজীবনের সামঞ্জস্যের আকাঙ্ক্ষা। সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলী অনন্ত আকাশে অবিরাম ধাবমান; নদী ক্লান্তিহীনভাবে সমুদ্রে বিলীন হয়। তেমনি মানুষের জীবনপ্রবাহও যেন পার্থিব ক্ষুদ্রতায় আটকে না থেকে অনন্ত সুধাসাগরের (ঈশ্বর) দিকে প্রবহমান হয়।
৪. পাখির আনন্দ, ফুলের সুবাস ও হৃদয়ভিক্ষু
- “পাখির কণ্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ, তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ / তেমনি করে আমার হৃদয়ভিক্ষুরে কেন দ্বারে তোমার নিত্যপ্রসাদ পাওয়াও না?…”আত্মসমর্পণের চরম পরাকাষ্ঠা। পাখি কিংবা ফুল নিজের চেষ্টায় গান গায় না বা সুবাস তৈরি করে না; ঈশ্বরই তাদের ভেতর সেই আনন্দ ও সৌরভ সঞ্চার করেন। সেই একই কৃপায় তিনি যেন ভক্তের কাঙাল হৃদয়কে তাঁর দ্বারের নিত্যপ্রসাদ দিয়ে পূর্ণ করে তোলেন।
বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন
গানটিতে দৃশ্যমান পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী আশ্বাসের অবসান ঘটে এক আত্মিক তৃষ্ণার শূন্যতায়। জাগতিক কোনো সান্ত্বনা যখন মানুষকে শান্তি দিতে পারে না, তখন আশাহীন নয়ন বাইরের আকর্ষণ থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্তরের অন্ধকারের দিকে তাকায়। এই আশাহীন দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে নিজেকে রিক্ত ও ‘ভিক্ষুক’ মনে করার চরম একাকীত্ব। চেনা পৃথিবীর সমস্ত আয়োজনের কাছ থেকে এই মানসিক বিদায়ের আঘাত ভক্তকে রিক্ত করে দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেই পরমেশ্বরের দ্বারে দাঁড়িয়ে নিত্যপ্রসাদ পাওয়ার শেষ আশার আলোটি প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
- সমান্তরাল চিত্রকল্প (Parallelism): গানটিতে প্রতিটি পদে প্রকৃতির পূর্ণতার পাশাপাশি মানুষের আত্মিক অপূর্ণতাকে সমান্তরালে স্থাপন করা হয়েছে (ফুল বনাম মনমধুপ, নদী বনাম জীবনধারা, পাখি বনাম হৃদয়ভিক্ষু)।
- রূপক ও সমাসবদ্ধ পদ: ‘মনমধুপ’, ‘বিশ্বকমল’, ‘চিত্ত-কমল’, ‘সুধাসাগর’, এবং ‘হৃদয়ভিক্ষু’—রবীন্দ্র-কাব্যের এই বিশিষ্ট পদযোজনা আধ্যাত্মিক ভাবকে এক অসাধারণ চিত্ররূপময়তা দান করেছে।
- অনুপম অনুপ্রাস ও অন্ত্যমিল: ‘খাওয়াও না-গাওয়াও না’, ‘চাওয়াও না-ধাওয়াও না’, এবং ‘আনন্দ-সুগন্ধ’-র মতো ছান্দিক অন্ত্যমিল বাণীর আবেদনকে অত্যন্ত মধুর করেছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা
- ইমন-বাউলের সুরসংমিশ্রণ: উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ধ্রুপদী ভাবগম্ভীর রাগ ‘ইমন’-এর সাথে বাংলার লোকায়ত ‘বাউল’ সুরের মাটির টান ও সারল্য এখানে একাকার হয়েছে। ইমনের আলোকময় বিস্তারের সাথে বাউলের আর্তি গানটির ভাবকে শাস্ত্রীয় কঠোরতা থেকে মুক্ত করে এক অন্তরঙ্গ প্রার্থনায় রূপ দিয়েছে।
- একতালের ধীর ও সুললিত লয়: বারো মাত্রার একতালের শান্ত প্রবাহ ভক্তের আত্মনিবেদনের নিবিষ্টতাকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখে।
- কণ্ঠস্বরের আর্তি: রাগাশ্রয়ী মীড় ও কোমল স্পর্শ সুরের প্রতিটি বাঁকে না-পাওয়ার যে ব্যাকুলতা ফুটিয়ে তোলে, তা পরিবেশনায় এক গভীর ধ্যানমগ্ন আবেশ রচনা করে।
শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯১৩ সালের অক্টোবর মাসে (২৯ আশ্বিন, ১৩২০ বঙ্গাব্দ) কবি শান্তিনিকেতনে এই গানটি রচনা করেন। এটি ছিল তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঠিক পূর্ববর্তী সময়, যখন তাঁর চিত্ত সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক সমর্পণ ও পরমাত্মার উপাসনায় সমাহিত ছিল।
- আধুনিক রূপায়ণ ও কবির সুমন: রবীন্দ্রসংগীতের ধ্রুপদী ধারার পাশাপাশি আধুনিক যুগে বিশিষ্ট শিল্পী কবির সুমনের ভরাট, গম্ভীর ও দরদি কণ্ঠে গানটি এক অনন্য মাত্রা লাভ করেছে। তাঁর সংবেদনশীল গায়কী গানটির আর্তি ও আকুলতাকে আধুনিক শ্রোতাদের হৃদয়ে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে পৌঁছে দিয়েছে। গানটির এই বিশিষ্ট পরিবেশনাটি ইউটিউবে কবির সুমনের কণ্ঠে শোনা যায়।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
“নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে” শান্তিনিকেতনের মন্দির উপাসনা, ব্রাহ্ম সমাজের প্রার্থনা এবং মার্জিত আত্মশুদ্ধিমূলক আসরে নিয়মিত গীত হয়। মানুষের অন্তর্লীন একাকীত্ব ও আধ্যাত্মিক শুষ্কতা দূর করতে এবং নিখিল বিশ্বের অনন্ত সৌন্দর্য ও আনন্দের সাথে মানবাত্মার মেলবন্ধন ঘটাতে এই গানটি বাংলা সংগীত সাহিত্যের এক চিরন্তন পথপ্রদর্শক।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (অখণ্ড সংস্করণ), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ।
- স্বরবিতান (রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপি গ্রন্থমালা), বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- রবীন্দ্র-জীবনী (দ্বিতীয় খণ্ড), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।
- সারেগামা বাংলা রবীন্দ্রসংকলন আর্কাইভ (কবির সুমনের ‘সঞ্চয়ন’ অ্যালবাম)।

![পরাজয় সঙ্গীত paraajay sangeet [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরাজয় সঙ্গীত paraajay sangeet [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পরাজয়-সঙ্গীত-paraajay-sangeet-কবিতা--1024x536.gif)







![সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘পরশ পাথর’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরশ পাথর [ কাব্যগ্রন্থ : সোনার তরী ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/03/পরশ-পাথর-1024x536.gif)
