বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ (১৯৩২) কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও মানবিক কবিতা হলো ‘ছোটো প্রাণ’। এই কবিতায় এক ঝঞ্ঝামুখর রাতে ঘুমন্ত শিশুর শান্ত ও সমাহিত মুখের দিকে তাকিয়ে কবি পৃথিবীর রূঢ়তা, ক্ষমতার দম্ভ এবং নিরীহ জীবনের ওপর নিয়তির নিষ্ঠুর আঘাত নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামছোটো প্রাণ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনজীবনমুখী, মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকধর্মী কবিতা (Life-affirming and Psychological Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে রচিত ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, মৃত্যুচেতনা এবং মানুষের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। ‘ছোটো প্রাণ’ কবিতায় এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে চারদিকের প্রলয়ংকরী রূপের বিপরীতে একটি ছোট শিশুর নিশ্চিন্ত ঘুমের দৃশ্য কবির মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। কবি আক্ষেপ করেন যে, মানুষের দম্ভ, যুদ্ধ বা ক্ষমতার লোভে যে ধ্বংসলীলা চলে, সেখানে শক্তিশালীদের আঘাত বা সংঘাত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এই নিরীহ, ছোট ছোট প্রাণ, যারা কেবল একটু শান্তিতে পৃথিবীর বুকে বাঁচতে চায়, তাদের ওপর কেন প্রকৃতির বা নিয়তির এই নির্মম আঘাত নেমে আসে, তা কবির কাছে এক বিস্ময়।

ছোটো প্রাণ – সম্পূর্ণ কবিতা

 

ছিলাম নিদ্রাগত,

      সহসা আর্তবিলাপে কাঁদিল

           রজনী ঝঞ্ঝাহত।

      জাগিয়া দেখিনু পাশে

           কচি মুখখানি সুখনিদ্রায়

               ঘুমায়ে ঘুমায়ে হাসে।

           সংসার-‘পরে এই বিশ্বাস

                 দৃঢ় বাঁধা স্নেহডোরে

           বজ্র-আঘাতে ভাঙে তা কেমন ক’রে।

      সৈন্যবাহিনী বিজয়কাহিনী

           লিখে ইতিহাস জুড়ে।

      শক্তিদম্ভ জয়স্তম্ভ

           তুলিছে আকাশ ফুঁড়ে।

           সম্পদসমারোহ

      গগনে গগনে ব্যাপিয়া চলেছে

           স্বর্ণমরীচিমোহ।

      সেথায় আঘাতসংঘাতবেগে

           ভাঙাচোরা যত হোক

                 তার লাগি বৃথা শোক।

      কিন্তু হেথায় কিছু তো চাহে নি এরা।

           এদের বাসাটি ধরণীর কোণে

                 ছোটো-ইচ্ছায় ঘেরা।

           যেমন সহজে পাখির কুলায়

                 মৃদুকণ্ঠের গীতে

      নিভৃত ছায়ায় ভরা থাকে মাধুরীতে।

      হে রুদ্র, কেন তারো ‘পরে বাণ হানো,

           কেন তুমি নাহি জানো

      নির্ভয়ে ওরা তোমারে বেসেছে ভালো,

           বিস্মিত চোখে তোমারি ভুবনে

                 দেখেছে তোমার আলো।

Amar Rabindranath Logo

Romanized Version
Chhilam nidragoto,
Shohosha artobilape knadilo
Rojoni jhonjhahoto.
Jagiya dekhinu pashe
Kochi mukhkhani shukhonidray
Ghumaye ghumaye hashe.
Shongshar-‘pore ei bishwash
Driro bnada snehodore
Bojro-aghate bhange ta kemon ko’re.
Shoinyobahini bijoykahini
Likhe itihash jure.
Shoktidombho joystombho
Tulichhe akash phunre.
Shompodshomaroh
Gogone gogone byapiya cholechhe
Swornomorichimoho.
Shethay aghatshongghatbege
Bhangachora joto hok
Tar lagi britha shok.
Kintu hethay kichhu to chahe ni era.
Eder bashati dhoronir kone
Chhoto-ichchhay ghera.
Jemon shohoje pakhir kulay
Mridukonther gite
Nibhrito chhayay bhora thake madhurite.
He rudro, keno taro ‘pore ban hano,
Keno tumi nahi jano
Nirbhoye ora tomare beshechhe bhalo,
Bishmito chokhe tomari bhubone

Dekhechhe tomar alo.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • নির্দোষ প্রাণের প্রশান্তি ও বিশ্বাস:
“জাগিয়া দেখিনু পাশে / কচি মুখখানি সুখনিদ্রায় / ঘুমায়ে ঘুমায়ে হাসে… সংসার-‘পরে এই বিশ্বাস / দৃঢ় বাঁধা স্নেহডোরে”
— ঝঞ্ঝামুখর রাতেও একটি শিশুর নিশ্চিন্ত ঘুম ও হাসি প্রমাণ করে পৃথিবীর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার কথা। এই স্নেহের বন্ধন এতই পবিত্র যে, তা কোনো বজ্রাঘাতে বা বিপদে ভাঙা উচিত নয়।
  • ক্ষমতার দম্ভ বনাম নিরীহ জীবন:
“সৈন্যবাহিনী বিজয়কাহিনী / লিখে ইতিহাস জুড়ে… সেথায় আঘাতসংঘাতবেগে / ভাঙাচোরা যত হোক / তার লাগি বৃথা শোক।”
— পৃথিবীতে যারা ক্ষমতার অহংকারে যুদ্ধ করে ইতিহাস লেখে বা সম্পদের মোহে মত্ত থাকে, তাদের পতন বা ধ্বংসের জন্য কবির কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছোট প্রাণগুলোর চাওয়া অত্যন্ত সামান্য, পাখির বাসার মতোই শান্ত ও সাধারণ।
  • নিয়তির প্রতি কবির জিজ্ঞাসা:
“হে রুদ্র, কেন তারো ‘পরে বাণ হানো, / কেন তুমি নাহি জানো / নির্ভয়ে ওরা তোমারে বেসেছে ভালো,”
— কবি রুদ্র বা নিয়তির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, কেন এই নিরীহ ও নির্দোষ ছোট প্রাণগুলোর ওপর সে নির্মম আঘাত হানে? অথচ এই শিশুরাই ঈশ্বরের সুন্দর ভুবনকে ভালোবেসেছে এবং নির্ভয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে। এদের প্রতি এই কাঠিন্য তাই কবির কাছে অন্যায় ও বেদনাদায়ক মনে হয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

মন্তব্য করুন