রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অন্তিম পর্বের কাব্যসংকলন পরিশেষ–এ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কবি মিলন, দায়, আত্মসমর্পণ ও সমন্বয়ের ভাষা খুঁজেছেন। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “মিলন (২)” কবিতাটি বিশেষভাবে স্মরণীয়—কারণ এটি রচিত হয়েছে শ্রীমতী ইন্দিরা মৈত্রের বিবাহ-উপলক্ষে। এখানে প্রেম কেবল আবেগ নয়; তা হয়ে ওঠে উড্ডয়ন থেকে অবতরণের, অসীম থেকে সীমার—অর্থাৎ সংসারের—এক সুরেলা যাত্রা।
Table of Contents
মিলন ২ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রীমতী ইন্দিরা মৈত্রের বিবাহ-উপলক্ষে
সেদিন উষার নববীণাঝংকারে
মেঘে মেঘে ঝরে সোনার সুরের কণা।
ধেয়ে চলেছিলে কৈশোরপরপারে
পাখিদুটি উন্মনা।
দখিন বাতাসে উধাও ওড়ার বেগে
অজানার মায়া রক্তে উঠিল জেগে
স্বপ্নের-ছায়া-ঢাকা।
সুরভবনের মিল’নমন্ত্র লেগে
কবে দুজনের পাখায় ঠেকিল পাখা।
কেটেছিল দিন আকাশে হৃদয় পাতি
মেঘের রঙেতে রাঙায়ে দোঁহার ডানা।
আছিলে দুজনে অপারে ওড়ার সাথী,
কোথাও ছিল না মানা।
দূর হতে এই ধরণীর ছবিখানি
দোঁহার নয়নে অমৃত দিয়েছে আনি —
পুষ্পিত শ্যামলতা।
চারিদিক হতে বিরাটের মহাবাণী
শুনাল দোঁহারে ভাষার অতীত কথা।
মেঘলোকে সেই নীরব সম্মিলনী
বেদনা আনিল কী অনির্বচনীয়।
দোঁহার চিত্তে উচ্ছ্বসি উঠে ধ্বনি —
“প্রিয়, ওগো মোর প্রিয়।’
পাখার মিল’ন অসীমে দিয়েছে পাড়ি,
সুরের মিল’নে সীমারূপ এল তারি,
এলে নামি ধরা-পানে।
কুলায়ে বসিলে অকূল শূন্য ছাড়ি,
পরানে পরানে গান মিলাইলে গানে।

উষা, মেঘ ও পাখি : মিলনের রূপকভাষা
কবিতার সূচনায় ভোরের উষা, মেঘ আর সোনার সুর—এই ত্রয়ীর মধ্যে দিয়ে কবি মিলনের শুভক্ষণকে গীতল রূপ দেন। কৈশোর পেরোনো দুটি পাখির উন্মনা উড্ডয়ন প্রেমের প্রথম বিস্ময়; দখিন বাতাসে ভেসে ওঠা অজানার মায়া রক্তে জাগিয়ে তোলে স্বপ্ন। এখানে ‘পাখা-পাখার স্পর্শ’ প্রেমের স্বাভাবিক টান—যা কোনো নিষেধ মানে না।
অসীমের আহ্বান ও ভাষাতীত উপলব্ধি
দূর থেকে পৃথিবীকে দেখা—শ্যামলতা, পুষ্পিত দৃশ্য—দোঁহারের চোখে অমৃত হয়ে আসে। চারদিক থেকে বিরাটের মহাবাণী শোনা যায়—যে বাণী ভাষার অতীত। এই স্তবকে মিলন মানে কেবল ব্যক্তিগত অনুভব নয়; তা এক বিশ্বজনীন সম্মিলন। মেঘলোকে নীরব যে মিলন, তার বেদনা অনির্বচনীয়—কিন্তু সেই বেদনাই উচ্ছ্বাসে রূপ নেয়: “প্রিয়, ওগো মোর প্রিয়।”
অসীম থেকে সীমায় : সংসারের অবতরণ
কবিতার শেষভাগে মিলনের দর্শন স্পষ্ট হয়। পাখার মিলনে অসীমে পাড়ি দেওয়া প্রেম সুরের মিলনে সীমারূপ পায়—অর্থাৎ সংসার। অকূল শূন্য ছেড়ে কূলে বসা মানে দায়িত্বের গ্রহণ; পরানে পরানে গান মিলিয়ে নেওয়া মানে সহযাত্রা। প্রেম এখানে অবিমিশ্র আবেগে স্থির থাকে না—সে রূপ নেয় জীবনের দৈনন্দিন সুরে।
দার্শনিক তাৎপর্য
“মিলন (২)” আমাদের শেখায়—
- প্রেমের পূর্ণতা উড্ডয়নে নয়, অবতরণে
- অসীমের স্বপ্ন সীমার সংসারে সুর হয়ে বাঁচে
- মিলন মানে দ্বন্দ্বহীন সহযাত্রা ও দায়গ্রহণ
এটি রবীন্দ্রনাথের পরিণত উপলব্ধি—প্রেম যখন দায়িত্বে রূপ নেয়, তখনই তা স্থায়ী।
“মিলন (২)” পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের এক আশীর্বাদ-গীতল রচনা। বিবাহ-উপলক্ষে রচিত এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেমকে উড়ান থেকে জীবনের পথে নামিয়ে আনেন—যেখানে গান মিলিয়ে চলে প্রাণে প্রাণে। শেষ পর্যন্ত মিলন এখানে সুরের সমন্বয়—অসীমের স্বপ্ন আর সীমার সত্যের একত্র সঙ্গীত।

![আকন্দ akondo [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আকন্দ akondo [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/আকন্দ-akondo-কবিতা--1024x536.gif)


![আশ্রমবালিকা ashrambalika [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 আশ্রমবালিকা ashrambalika [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/আশ্রমবালিকা-ashrambalika-কবিতা--1024x536.gif)
![স্পাই spai [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 স্পাই spai [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/স্পাই-spai-কবিতা--1024x536.gif)
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘সন্ধ্যা এল চুল এলিয়ে’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সন্ধ্যা এল চুল এলিয়ে [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/সন্ধ্যা-এল-চুল-এলিয়ে-1024x576.gif)
![মুক্তিপাশ কবিতা [ Muktipash Kobita ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুক্তিপাশ কবিতা [ Muktipash Kobita ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মুক্তিপাশ-কবিতা-Muktipash-Kobita--1024x576.gif)
![রাজপথের কথা ছোটগল্প [গল্পগুচ্ছ ] Rajpother Kotha রাজপথের কথা rajpother kotha [ ছোটগল্প, গল্পগুচ্ছ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/রাজপথের-কথা-1024x536.gif)