আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতায় পারিবারিক সম্পর্ক, দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন এবং সাংসারিক বন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কবিতাটিতে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও জটিলতার সংঘাত ফুটে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সহজ অথচ গভীর জীবনবোধের মধ্য দিয়ে কবিতাটি দেখায়, কখনো কখনো পরিচিত সম্পর্ক ও পরিবেশের মধ্যেও মানুষ মানসিক অবকাশের অভাব অনুভব করে এবং নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ খোঁজে। ‘নিষ্কৃতি’ তাই কেবল বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং মানুষের মনোজগৎ, সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা এবং পারিবারিক জীবনের সূক্ষ্ম বাস্তবতা উপলব্ধির একটি কাব্যিক প্রকাশ।

পলাতকা কাব্যগ্রন্থের ‘নিষ্কৃতি’ কবিতা

মা কেঁদে কয়, “‘মঞ্জুলী মোর ঐ তো কচি মেয়ে,

     ওরি সঙ্গে বিয়ে দেবে?–বয়সে ওর চেয়ে

               পাঁচগুনো সে বড়ো;–

     তাকে দেখে বাছা আমার ভয়েই জড়সড়।

          এমন বিয়ে ঘটতে দেব নাকো।”

          বাপ বললে, “কান্না তোমার রাখো!

পঞ্চাননকে পাওয়া গেছে অনেক দিনের খোঁজে,

          জান না কি মস্ত কুলীন ও যে।

     সমাজে তো উঠতে হবে সেটা কি কেউ ভাব।

          ওকে ছাড়লে পাত্র কোথায় পাব।”

     মা বললে, “কেন ঐ যে চাটুজ্যেদের পুলিন,

               নাই বা হল কুলীন,–

       দেখতে যেমন তেমনি স্বভাবখানি,

       পাস করে ফের পেয়েছে জলপানি,

               সোনার টুকরো ছেলে।

   এক-পাড়াতে থাকে ওরা–ওরি সঙ্গে হেসে খেলে

মেয়ে আমার মানুষ হল; ওকে যদি বলি আমি আজই

               এক্‌খনি হয় রাজি।”

               বাপ বললে, “থামো,

               আরে আরে রামোঃ।

          ওরা আছে সমাজের সব তলায়।

          বামুন কি হয় পৈতে দিলেই গলায়?

দেখতে শুনতে ভালো হলেই পাত্র হল! রাধে!

          স্ত্রীবুদ্ধি কি শাস্ত্রে বলে সাধে।”

          যেদিন ওরা গিনি দিয়ে দেখলে কনের মুখ

                   সেদিন থেকে মঞ্জুলিকার বুক

          প্রতি পলের গোপন কাঁটায় হল রক্তে মাখা।

মায়ের স্নেহ অন্তর্যামী, তার কাছে তো রয় না কিছুই ঢাকা;

     মায়ের ব্যথা মেয়ের ব্যথা চলতে খেতে শুতে

ঘরের আকাশ প্রতিক্ষণে হানছে যেন বেদনা-বিদ্যুতে।

          অটলতার গভীর গর্ব বাপের মনে জাগে,–

                   সুখে দুঃখে দ্বেষে রাগে

            ধর্ম থেকে নড়েন তিনি নাই হেন দৌর্বল্য।

       তাঁর জীবনের রথের চাকা চলল

       লোহার বাঁধা রাস্তা দিয়ে প্রতিক্ষণেই,

কোনোমতেই ইঞ্চিখানেক এদিক-ওদিক একটু হবার জো নেই।

         তিনি বলেন, তাঁর সাধনা বড়োই সুকঠোর,

              আর কিছু নয়, শুধুই মনের জোর,

অষ্টাবক্র জমদগ্নি প্রভৃতি সব ঋষির সঙ্গে তুল্য,

         মেয়েমানুষ বুঝবে না তার মূল্য।

                   অন্তঃশীলা অশ্রুনদীর নীরব নীরে

                   দুটি নারীর দিন বয়ে যায় ধীরে।

                        অবশেষে বৈশাখে এক রাতে

         মঞ্জুলিকার বিয়ে হল পঞ্চাননের সাথে।

বিদায়বেলায় মেয়েকে বাপ বলে দিলেন মাথায় হস্ত ধরি

          “হও তুমি সাবিত্রীর মতো এই কামনা করি।”

               কিমাশ্চর্যমতঃপরং, বাপের সাধন-জোরে

আশীর্বাদের প্রথম অংশ দু-মাস যেতেই ফলল কেমন করে–

               পঞ্চাননকে ধরল এসে যমে;

               কিন্তু মেয়ের কপালক্রমে

ফলল না তার শেষের দিকটা, দিলে না যম ফিরে,

মঞ্জুলিকা বাপের ঘরে ফিরে এল সিঁদুর মুছে শিরে।

               দুঃখে সুখে দিন হয়ে যায় গত

স্রোতের জলে ঝরে-পড়া ভেসে-যাওয়া ফুলের মতো,

                   অবশেষে হল

          মঞ্জুলিকার বয়স ভরা ষোলো।

                   কখন শিশুকালে

          হৃদয়-লতার পাতার অন্তরালে

                   বেরিয়েছিল একটি কুঁড়ি

          প্রাণের গোপন রহস্যতল ফুঁড়ি;

                   জানত না তো আপনাকে সে,

শুধায় নি তার নাম কোনোদিন বাহির হতে খেপা বাতাস এসে,

     সেই কুঁড়ি আজ অন্তরে তার উঠছে ফুটে

                   মধুর রসে ভরে উঠে’।

                   সে যে প্রেমের ফুল

          আপনি রাঙা পাপড়িভারে আপনি সমাকুল।

          আপনাকে তার চিনতে যে আর নাইকো বাকি,

                   তাইতো থাকি থাকি

               চমকে ওঠে নিজের পানে চেয়ে।

আকাশপারের বাণী তারে ডাক দিয়ে যায় আলোর ঝরনা বেয়ে;

                  রাতের অন্ধকারে

        কোন্‌ অসীমের রোদনভরা বেদন লাগে তারে।

                  বাহির হতে তার

             ঘুচে গেছে সকল অলংকার;

        অন্তর তার রাঙিয়ে ওঠে স্তরে স্তরে,

         তাই দেখে সে আপনি ভেবে মরে।

                  কখন কাজের ফাঁকে

    জানলা ধরে চুপ করে সে বাইরে চেয়ে থাকে–

    যেখানে ওই শজনে গাছের ফুলের ঝুরি বেড়ার গায়ে

                  রাশি রাশি হাসির ঘায়ে

        আকাশটারে পাগল করে দিবসরাতি।

     যে ছিল তার ছেলেবেলার খেলাঘরের সাথি

              আজ সে কেমন করে

            জলস্থলের হৃদয়খানি দিল ভরে।

      অরূপ হয়ে সে যেন আজ সকল রূপে রূপে

              মিশিয়ে গেল চুপে চুপে।

                   পায়ের শব্দ তারি

     মরমরিত পাতায় পাতায় গিয়েছে সঞ্চারি।

                  কানে কানে তারি করুণ বাণী

                  মৌমাছিদের পাখার গুনগুনানি।

                 মেয়ের নীরব মুখে

         কী দেখে মা, শেল বাজে তার বুকে।

              না-বলা কোন্‌ গোপন কথার মায়া

মঞ্জুলিকার কালো চোখে ঘনিয়ে তোলে জলভরা এক ছায়া;

              অশ্রু-ভেজা গভীর প্রাণের ব্যথা

         এনে দিল অধরে তার শরৎনিশির স্তব্ধ ব্যাকুলতা।

                   মায়ের মুখে অন্ন রোচে নাকো–

কেঁদে বলে, “হায় ভগবান, অভাগীরে ফেলে কোথায় থাক।”

          একদা বাপ দুপুরবেলায় ভোজন সাঙ্গ করে

               গুড়গুড়িটার নলটা মুখে ধরে,

               ঘুমের আগে, যেমন চিরাভ্যাস,

          পড়তেছিলেন ইংরেজি এক প্রেমের উপন্যাস।

               মা বললেন, বাতাস করে গায়ে,

               কখনো বা হাত বুলিয়ে পায়ে,

          “যার খুশি সে নিন্দে করুক, মরুক বিষে জ্বরে

               আমি কিন্তু পারি যেমন ক’রে

             মঞ্জুলিকার দেবই দেব বিয়ে।”

বাপ বললেন, কঠিন হেসে, “তোমরা মায়ে ঝিয়ে

এক লগ্নেই বিয়ে ক’রো আমার মরার পরে,

     সেই কটা দিন থাকো ধৈর্য ধরে।”

এই বলে তাঁর গুড়গুড়িতে দিলেন মৃদু টান।

     মা বললেন, “‘উঃ কী পাষাণ প্রাণ,

     স্নেহমায়া কিচ্ছু কি নেই ঘটে।”

     বাপ বললেন, “আমি পাষাণ বটে।

ধর্মের পথ কঠিন বড়ো, ননির পুতুল হলে

     এতদিনে কেঁদেই যেতেম গলে।”

মা বললেন, “হায় রে কপাল। বোঝাবই বা কারে।

              তোমার এ সংসারে

     ভরা ভোগের মধ্যখানে দুয়ার এঁটে

     পলে পলে শুকিয়ে মরবে ছাতি ফেটে

          একলা কেবল একটুকু ঐ মেয়ে,

     ত্রিভুবনে অধর্ম আর নেই কিছু এর চেয়ে।

তোমার পুঁথির শুকনো পাতায় নেই তো কোথাও প্রাণ,

দরদ কোথায় বাজে সেটা অন্তর্যামী জানেন ভগবান।”

     বাপ একটু হাসল কেবল, ভাবলে, “মেয়েমানুষ

          হৃদয়তাপের ভাপে-ভরা ফানুস।

     জীবন একটা কঠিন সাধন–নেই সে ওদের জ্ঞান।”

এই বলে ফের চলল পড়া ইংরেজি সেই প্রেমের উপাখ্যান।

দুখের তাপে জ্বলে জ্বলে অবশেষে নিবল মায়ের তাপ;

                সংসারেতে একা পড়লেন বাপ।

          বড়ো ছেলে বাস করে তার স্ত্রীপুত্রদের সাথে

                   বিদেশে পাটনাতে।

          দুই মেয়ে তার কেউ থাকে না কাছে,

               শ্বশুরবাড়ি আছে।

             একটি থাকে ফরিদপুরে,

          আরেক মেয়ে থাকে আরো দূরে

          মাদ্রাজে কোন্‌ বিন্ধ্যগিরির পার।

     পড়ল মঞ্জুলিকার ‘পরে বাপের সেবাভার।

     রাঁধুনে ব্রাহ্মণের হাতে খেতে করেন ঘৃণা,

                   স্ত্রীর রান্না বিনা

               অন্নপানে হত না তার রুচি।

সকালবেলায় ভাতের পালা, সন্ধ্যাবেলায় রুটি কিংবা লুচি;

               ভাতের সঙ্গে মাছের ঘটা

               ভাজাভুজি হত পাঁচটা-ছটা;

               পাঁঠা হত রুটি-লুচির সাথে।

মঞ্জুলিকা দুবেলা সব আগাগোড়া রাঁধে আপন হাতে।

          একাদশী ইত্যাদি তার সকল তিথিতেই

               রাঁধার ফর্দ এই।

          বাপের ঘরটি আপনি মোছে ঝাড়ে

     রৌদ্রে দিয়ে গরম পোশাক আপনি তোলে পাড়ে।

     ডেস্কে বাক্সে কাগজপত্র সাজায় থাকে থাকে,

               ধোবার বাড়ির ফর্দ টুকে রাখে।

   গয়লানী আর মুদির হিসাব রাখতে চেষ্টা করে,

ঠিক দিতে ভুল হলে তখন বাপের কাছে ধমক খেয়ে মরে।

     কাসুন্দি তার কোনোমতেই হয় না মায়ের মতো,

               তাই নিয়ে তার কত

               নালিশ শুনতে হয়।

          তা ছাড়া তার পান-সাজাটা মনের মতো নয়।

     মায়ের সঙ্গে তুলনাতে পদেপদেই ঘটে যে তার ত্রুটি।

                   মোটামুটি–

          আজকালকার মেয়েরা কেউ নয় সেকালের মতো।

                   হয়ে নীরব নত,

          মঞ্জুলী সব সহ্য করে, সর্বদাই সে শান্ত,

                   কাজ করে অক্লান্ত।

              যেমন করে মাতা বারংবার

              শিশু ছেলের সহস্র আবদার

          হেসে সকল বহন করেন স্নেহের কৌতুকে,

              তেমনি করেই সুপ্রসন্ন মুখে

          মঞ্জুলী তার বাপের নালিশ দন্ডে দন্ডে শোনে,

                   হাসে মনে মনে।

          বাবার কাছে মায়ের স্মৃতি কতই মূল্যবান

সেই কথাটা মনে ক’রে গর্বসুখে পূর্ণ তাহার-প্রাণ।

          “আমার মায়ের যত্ন যে-জন পেয়েছে একবার

               আর-কিছু কি পছন্দ হয় তার।”

হোলির সময় বাপকে সেবার বাতে ধরল ভারি।

          পাড়ায় পুলিন করছিল ডাক্তারি,

               ডাকতে হল তারে।

          হৃদয়যন্ত্র বিকল হতে পারে

               ছিল এমন ভয়।

পুলিনকে তাই দিনের মধ্যে বারেবারেই আসতে যেতে হয়।

               মঞ্জুলী তার সনে

     সহজভাবেই কইবে কথা যতই করে মনে

          ততই বাধে আরো।

          এমন বিপদ কারো

               হয় কি কোনোদিন।

     গলাটি তার কাঁপে কেন, কেন এতই ক্ষীণ,

          চোখের পাতা কেন

        কিসের ভারে জড়িয়ে আসে যেন।

          ভয়ে মরে বিরহিণী

শুনতে যেন পাবে কেহ রক্তে যে তা’র বাজে রিনিরিনি।

     পদ্মপাতায় শিশির যেন, মনখানি তার বুকে

দিবারাত্রি টলছে কেন এমনতরো ধরা-পড়ার মুখে।

          ব্যামো সেরে আসছে ক্রমে,

     গাঁঠের ব্যথা অনেক এল কমে।

                   রোগী শয্যা ছেড়ে

          একটু এখন চলে হাত-পা নেড়ে।

                   এমন সময় সন্ধ্যাবেলা

     হাওয়ায় যখন যূথীবনের পরানখানি মেলা,

     আঁধার যখন চাঁদের সঙ্গে কথা বলতে যেয়ে

          চুপ ক’রে শেষ তাকিয়ে থাকে চেয়ে,

     তখন পুলিন রোগী-সেবার পরামর্শ-ছলে

          মঞ্জুলিরে পাশের ঘরে ডেকে বলে–

“জান তুমি তোমার মায়ের সাধ ছিল এই চিতে

                   মোদের দোঁহার বিয়ে দিতে।

                        সে ইচ্ছাটি তাঁরি

                   পুরাতে চাই যেমন করেই পারি।

এমন করে আর কেন দিন কাটাই মিছিমিছি।”

                   “না না, ছি ছি, ছি ছি।”

এই ব’লে সে মঞ্জুলিকা দু-হাত দিয়ে মুখখানি তার ঢেকে

                   ছুটে গেল ঘরের থেকে।

     আপন ঘরে দুয়ার দিয়ে পড়ল মেঝের ‘পরে–

ঝরঝরিয়ে ঝরঝরিয়ে বুক ফেটে তার অশ্রু ঝরে পড়ে।

     ভাবলে, “পোড়া মনের কথা এড়ায় নি ওঁর চোখ।

          আর কেন গো। এবার মরণ হ’ক।”

     মঞ্জুলিকা বাপের সেবায় লাগল দ্বিগুণ ক’রে

                   অষ্টপ্রহর ধরে।

আবশ্যকটা সারা হলে তখন লাগে অনাবশ্যক কাজে,

     যে-বাসনটা মাজা হল আবার সেটা মাজে।

                   দু-তিন ঘন্টা পর

     একবার যে-ঘর ঝেড়েছে ফের ঝাড়ে সেই ঘর।

          কখন যে স্নান, কখন যে তার আহার,

                   ঠিক ছিল না তাহার।

কাজের কামাই ছিল নাকো যতক্ষণ না রাত্রি এগারোটায়

     শ্রান্ত হয়ে আপনি ঘুমে মেঝের ‘পরে লোটায়।

          যে দেখল সে-ই অবাক হয়ে রইল চেয়ে,

                   বললে, “ধন্যি মেয়ে।”

     বাপ শুনে কয় বুক ফুলিয়ে, “গর্ব করি নেকো,

          কিন্তু তবু আমার মেয়ে সেটা স্মরণ রেখো।

                   ব্রহ্মচর্য- ব্রত

আমার কাছেই শিক্ষা যে ওর। নইলে দেখতে অন্যরকম হ’ত।

                   আজকালকার দিনে

               সংযমেরি কঠোর সাধন বিনে

               সমাজেতে রয় না কোনো বাঁধ,

     মেয়েরা তাই শিখছে কেবল বিবিয়ানার ছাঁদ।”

          স্ত্রীর মরণের পরে যবে

     সবেমাত্র এগারো মাস হবে,

          গুজব গেল শোনা

     এই বাড়িতে ঘটক করে আনাগোনা।

     প্রথম শুনে মঞ্জুলিকার হয় নিকো বিশ্বাস,

তার পরে সব রকম দেখে ছাড়লে নিশ্বাস।

          ব্যস্ত সবাই, কেমনতরো ভাব

     আসছে ঘরে নানা রকম বিলিতি আসবাব।

     দেখলে বাপের নতুন করে সাজসজ্জা শুরু,

          হঠাৎ কালো ভ্রমরকৃষ্ণ ভুরু,

        পাকাচুল সব কখন হল কটা,

     চাদরেতে যখন-তখন গন্ধ মাখার ঘটা।

     মার কথা আজ মঞ্জুলিকার পড়ল মনে

          বুকভাঙা এক বিষম ব্যথার সনে।

                   হ’ক না মৃত্যু, তবু

এ-বাড়ির এই হাওয়ার সঙ্গে বিরহ তাঁর ঘটে নাই তো কভু।

          কল্যাণী সেই মূর্তিখানি সুধামাখা

          এ সংসারের মর্মে ছিল আঁকা;

     সাধ্বীর সেই সাধনপুণ্য ছিল ঘরের মাঝে,

          তাঁরি পরশ ছিল সকল কাজে।

এ সংসারে তাঁর হবে আজ পরম মৃত্যু, বিষম অপমান–

          সেই ভেবে যে মঞ্জুলিকার ভেঙে পড়ল প্রাণ।

                   ছেড়ে লজ্জাভয়

                   কন্যা তখন নিঃসংকোচে কয়

                       বাপের কাছে গিয়ে,–

          “তুমি নাকি করতে যাবে বিয়ে।

আমরা তোমার ছেলেমেয়ে নাতনী-নাতি যত

          সবার মাথা করবে নত?

          মায়ের কথা ভুলবে তবে?

তোমার প্রাণ কি এত কঠিন হবে।”

               বাবা বললে শুষ্ক হাসে,

          “কঠিন আমি কেই বা জানে না সে?

আমার পক্ষে বিয়ে করা বিষম কঠোর কর্ম,

                   কিন্তু গৃহধর্ম

     স্ত্রী না হলে অপূর্ণ যে রয়

মনু হতে মহাভারত সকল শাস্ত্রে কয়।

          সহজ তো নয় ধর্মপথে হাঁটা,

এ তো কেবল হৃদয় নিয়ে নয়কো কাঁদাকাটা।

          যে করে ভয় দুঃখ নিতে দুঃখ দিতে

     সে কাপুরুষ কেনই আসে পৃথিবীতে।”

     বাখরগঞ্জে মেয়ের বাপের ঘর।

                 সেথায় গেলেন বর

বিয়ের কদিন আগে, বৌকে নিয়ে শেষে

          যখন ফিরে এলেন দেশে

ঘরেতে নেই মঞ্জুলিকা। খবর পেলেন চিঠি পড়ে

          পুলিন তাকে বিয়ে করে

     গেছে দোঁহা ফরাক্কাবাদ চলে,

     সেইখানেতে ঘর পাতবে ব’লে।

          আগুন হয়ে বাপ

     বারে বারে দিলেন অভিশাপ।

Amar Rabindranath Logo

 

 

Paltaka Kabbyogranther ‘Nishkriti’ Kobita — Rabindranath Tagore

Ma kende koy, “Manjuli mor oi to kochi meye,

Ori shonge biye debe? — boyoshe or cheye

Panchguno she boro; —

Take dekhe bachha amar bhoyei joroshoro.

Emon biye ghotote debo nako.”

Bap bolle, “Kanna tomar rakho!

Panchanonke paoya gechhe onek diner khonje,

Jano na ki mosto kulin o je.

Somaje to uthte hobe, sheta ki keu bhabo?

Oke chharle patro kothay pabo.”

Ma bolle, “Keno oi je Chattujjeder Pulin,

Nai ba holo kulin, —

Dekhte jemon temoni swabhavkhani,

Pass kore pher peyechhe jolpani,

Sonar tukro chhele.

Ek parate thake ora — ori shonge heshe khele

Meye amar manush holo; oke jodi boli ami aji

Ekkhoni hoy raji.”

Bap bolle, “Thamo,

Are are, Ramah!

Ora achhe somajer shob tolay.

Bamun ki hoy poite dilei golay?

Dekhte shunte bhalo holei patro holo! Radhe!

Stri-buddhi ki shastre bole shadhe.”

Jedin ora gini diye dekhle koner mukh,

Shedin theke Manjulikar buk

Proti poler gopon kantay holo rokte makha.

Mayer sneho antorjami, tar kachhe to roy na kichhui dhaka;

Mayer byatha, meyer byatha cholte, khete, shute,

Ghorer akash protikhone hanche jeno bedona-bidyute.

Atolotar gobhir gorbo baper mone jage, —

Sukhe-dukkhe, dweshe-rage,

Dhormo theke noren tini, nai hen dourbolyo.

Tar jiboner rother chaka cholol

Lohar bandha rasta diye protikhonei,

Konomotei inchikhane ek edik-odik ektu hobar jo nei.

Tini bolen, tar sadhona boroi sukothor,

Ar kichhu noy, shudhui moner jor,

Ashtabakra, Jamadagni probhriti shob rishir shonge tulya,

Meyemanush bujhbe na tar mulya.

Antoshshila oshrunodir nirob nire

Duti narir din boye jay dhire.

Obosheshe Boishakhe ek rate

Manjulikar biye holo Panchanoner sathe.

Bidaybelay meyeke bap bole dilen mathay hasta dhori,

“Hao tumi Sabitrir moto, ei kamona kori.”

Kim ashcharyam atahparam, baper sadhon-jore,

Ashirbader prothom angsho du-mash jetei pholol kemon kore —

Panchanonke dhorlo eshe Jome;

Kintu meyer kopal-krome

Pholol na tar shesh dikta, dilen na Jom phire,

Manjuli baper ghore phire elo sindur muchhe shire.

Dukkhe-sukhe din hoye jay got,

Sroter jole jhore-pora bheshe-jaoya phuler moto,

Obosheshe holo

Manjulikar boyosh bhora sholo.

Kokhon shishukale

Hridoy-lotar patar ontorale

Beriechhilo ekti kuri,

Praner gopon rohoshyotol phunri;

Janto na to aponake she,

Shudhay ni tar nam konodin bahir hote khepa batas eshe,

Shei kuri aj ontore tar uthchhe phute,

Modhur rose bhore uthe.

She je premer phul,

Aponi ranga paporibhare aponi somakul.

Aponake tar chinte je ar naiko baki,

Taito thaki thaki

Chomke othe nijer pane cheye.

Akashparer bani tare dak diye jay alor jhorna beye;

Rater andhokare

Kon oshimer rodan-bhora bedon lage tare.

Bahir hote tar

Ghuche gechhe shokol olongkar;

Ontor tar rangiye othe store store,

Tai dekhe she aponi bhebe more.

Kokhon kajer phanke

Janla dhore chup kore she baire cheye thake —

Jekhane oi sojne gachher phuler jhuri berar gaye

Rashi rashi hashir ghaye

Akashotare pagol kore diboshrati.

Je chhilo tar chelebেলার khelaghorer sathi,

Aj she kemon kore

Jol-stholer hridoykhani dil bhore.

Oroop hoye she jeno aj shokol rupe rupe

Mishiye gelo chupe chupe.

Payer shobdo tari

Mormorito patay patay giyechhe shonchari.

Kane kane tari korun bani,

Moumachhider pakhir gun-gunani.

Meyer nirob mukhe

Ki dekhe ma, shel baje tar buke.

Na-bola kon gopon kothar maya

Manjulikar kalo chokhe ghoniye tole jolbhora ek chhaya;

Ashru-bheja gobhir praner byatha

Enে dil odhore tar shorot-nishir stobdho byakulota.

Mayer mukhe onno roche nako —

Kende bole, “Hay Bhagoban, abhagire phele kothay thako.”

Ekoda bap dupurbela bhojon shango kore

Gur-guritar nolta mukhe dhore,

Ghumer age, jemon chirabhyas,

Porechhilen English ek premer uponyas.

Ma bollen, batas kore gaye,

Kokhono ba hat buliye paye,

“Jar khushi she ninde koruk, moruk bishe-jwore,

Ami kintu pari jemon kore

Manjulikar deboi debo biye.”

Bap bollen, kothin heshe, “Tomra maye-jhiye

Ek lognei biye koro amar morer pore,

Shei kota din thako dhoirjo dhore.”

Ei bole tar gur-gurite dilen mridu tan.

Ma bollen, “Uঃ, ki pashan pran,

Sneho-maya kichhui ki nei ghote?”

Bap bollen, “Ami pashan bote.

Dhormer poth kothin boro, nonir putul hole

Etodine kendei jetem gole.”

Ma bollen, “Hay re kopal! Bojhaboi ba kare?

Tomar e songsare

Bhara bhoger modhyokhane duyar ente

Pole pole shukiye morbe chhati phete,

Ekla kebol ektuku oi meye,

Tribhuvone odhormo ar nei kichhu er cheye.

Tomar punthir shukno patay nei to kothao pran,

Dorod kothay baje sheta antorjami janen Bhagoban.”

Bap ektu haslo kebol, bhablo, “Meyemanush

Hridoy-taper bhape-bhora phanus.

Jibon ekta kothin sadhon — nei she oder gyan.”

Ei bole pher cholol pora English shei premer upakhyan.

Dukkher tape jwole jwole obosheshe niblo mayer tap;

Songsare eka porlen bap.

Boro chhele bash kore tar stri-putroder sathe

Bideshe Patnate.

Dui meye tar keu thake na kachhe,

Shoshurbari achhe.

Ekti thake Faridpure,

Arek meye thake aro dure,

Madraje kon Bindhyogirir par.

Porlo Manjulikar opore baper sebabhar.

Randhune Brahmoner hate khete koren ghrina,

Strir ranna bina

Onnopane hoto na tar ruchi.

Shokalbelay bhater pala, shondhyabelay ruti kingba luchi;

Bhater shonge machher ghota,

Bhajabhuji hoto panchta-chhota;

Patha hoto ruti-luchir sathe.

Manjuli dubela shob agagora randhe apon hate.

Ekadashi ityadi tar shokol tithitei

Randhar forod ei.

Baper ghoroti aponi moche jhare,

Roudre diye gorom poshak aponi tole pare.

Desk-e, bakse kagojpotro sajay thake thake,

Dhobar barir forod tuke rakhe.

Goylani ar mudir hisab rakhte cheshta kore,

Thik dite bhul hole tokhon baper kachhe dhamok kheye more.

Kasundi tar konomotei hoy na mayer moto,

Tai niye tar koto

Nalish shunte hoy.

Ta chhara tar pan-sajata moner moto noy.

Mayer shonge tulonate pode podei ghote je tar truti.

Motamuti —

Ajkalakar meyera keu noy shekaler moto.

Hoye nirob not,

Manjuli shob shohyo kore, sorbodai she shanto,

Kaj kore oklanto.

Jemon kore mata barongbar

Shishu chheler sohosro abdar

Heshe shokol bohon koren sneher koutuke,

Temoni korei suprasanno mukhe

Manjuli tar baper nalish dondo dondo shone,

Hashe mone mone.

Babar kachhe mayer smriti kotoi mulyoban,

Shei kothata mone kore gorbo-sukhe purno tahar pran.

“Amar mayer jotno je-jon peyechhe ekbar,

Ar kichhu ki pochhondo hoy tar?”

Holi-r shomoy baper bat dhorlo bhari.

Paray Pulin korchhilo daktari,

Dakte holo tare.

Hridoy-jontr bikol hote pare,

Chhilo emon bhoy.

Pulin-ke tai diner moddhe bare barei ashতে jete hoy.

Manjuli tar shonge

Shohojbhabei koibe kotha, jotoi kore mone,

Totoi badhe aro.

Emon bipod karo

Hoy ki konodin?

Golati tar kanpe keno, keno etoi khin,

Chokher pata keno

Kisher bhare joriye ashe jeno.

Bhoye more birohini,

Shunte jeno pabe keu rokte je tar baje rinirini.

Podmopatay shishir jeno, monkhani tar buke

Dibaratri tolchhe keno emonotoro dhora-porar mukhe.

Byamo shere ashchhe krome,

Ganter byatha onek elo kome.

Rogi shojja chhere

Ektu ekhon chole hat-pa nere.

Emon shomoy shondhyabela,

Haoway jokhon juthibon-er pranokhani mela,

Andhar jokhon chander shonge kotha bolte giye

Chup kore shesh takiye thake cheye,

Tokhon Pulin rogi-sebar poramorsho-chhole

Manjulike pasher ghore deke bole —

“Jan tumi tomar mayer shadh chhilo ei chitte

Moder dujoner biye dite.

She ichchhati tari

Purate chai jemon korei pari.

Emon kore ar keno din katai michhimichhi?”

“Na na, chhi chhi, chhi chhi!”

Ei bole she Manjulika du-hat diye mukhkhani tar dheke

Chhute gelo ghorer theke.

Apon ghore duyar diye porlo mejher opore —

Jhorjhorie jhorjhorie buk phete tar ashru jhore pore.

Bhablo, “Pora moner kotha eray ni or chokh.

Ar keno go? Ebar moron hok.”

Manjuli baper sebaye laglo dwigun kore

Oshtoprohor dhore.

Aboshyokota shara hole tokhon lage anaboshyok kaje,

Je-bashonta maja holo abar sheta maje.

Du-tin ghonta por

Ekbar je-ghor jherechhe pher jhare shei ghor.

Kokhon je snan, kokhon je tar ahar,

Thik chhilo na tahar.

Kajer kamai chhilo nako jotokkhon na ratri egarotay

Shranto hoye aponi ghume mejher opore lotay.

Je dekhlo she-i obak hoye roilo cheye,

Bollo, “Dhonyi meye!”

Bap shune koy buk phuliye, “Gorbo kori neko,

Kintu tobu amar meye, sheta smoron rekho.

Brahmacharya-broto

Amar kachhei shikkha je or. Noile dekhte onnorokom hoto.

Ajkalakar dine

Songjomer-i kothor sadhon bine

Somajete roy na kono bandh,

Meyera tai shikhchhe kebol bibiyanar chhand.”

Strir moroner pore jobe

Shobemattra egaro mash hobe,

Gujob gelo shona

Ei barite ghotok kore anagona.

Prothom shune Manjulikar hoy niko bishwas,

Tar pore shob rokom dekhe chharlo nishwas.

Byasto shobai, kemonotoro bhab,

Ashchhe ghore nana rokom biliti asbab.

Dekhle baper notun kore sajsajja shuru,

Hotath kalo bhromor-krishno bhru,

Pakachul shob kokhon holo kota,

Chadorete jokhon-tokhon gondho makhar ghota.

Mar kotha aj Manjulikar porlo mone

Bukbhanga ek bishom byathar shonge.

Hok na mrityu, tobu

E-barir ei haowar shonge biroh tar ghote nai to kobhu.

Kalyani shei murtikhani sudha-makha

E songsarer morme chhilo anka;

Sadhbir shei sadhon-punyo chhilo ghorer majhe,

Tari porosh chhilo shokol kaje.

E songsare tar hobe aj porom mrityu, bishom opoman —

Shei bhebe je Manjulikar bhenge porlo pran.

Chhere lojja-bhoy,

Konya tokhon nihshongkocho koy

Baper kachhe giye —

“Tumi naki korte jabe biye.

Amra tomar chhelemeye, natni-nati joto,

Shobar matha korbe noto?

Mayer kotha bhulbe tobe?

Tomar pran ki eto kothin hobe?”

Baba bollo shushko hashe,

“Kothin ami, ke-i ba jane na she?

Amar pokkhe biye kora bishom kothor kormo,

Kintu grihodhormo

Stri na hole opurno je roy,

Manu hote Mahabharat, shokol shastre koy.

Shohoj to noy dhormopothe hanta,

E to kebol hridoy niye noyko kandakati.

Je kore bhoy dukkho nite, dukkho dite,

She kapurush keno-i ashe prithibite?”

Bakhraganj-e meyer baper ghor.

Sethay gelen bor

Biyer kodin age, bouke niye sheshe

Jokhon phire elen deshe,

Ghorete nei Manjulika. Khobor pelen chithi pore,

Pulin take biye kore

Geche donha Farakkabad chole,

Sheikhanete ghor patbe bole.

Agun hoye bap

Bare bare dilen abhishap.

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত