পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের দেখা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর গদ্যকবিতা ও প্রকৃতিভিত্তিক সৃষ্টি হলো ‘দেখা’। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি শ্রাবণ মাসের আকাশ, মেঘের খেলা, রোদ ও হঠাৎ নামা বৃষ্টির রূপ এবং প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল দৃশ্যের মধ্য দিয়ে জীবনের সত্তর বছরের স্মৃতিরোমন্থন ও মুহূর্তকে ধরে রাখার এক গভীর দার্শনিক আকুতি প্রকাশ করেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামদেখা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনগদ্যকবিতা ও প্রকৃতিভিত্তিক লিরিক কবিতা (Prose Poem and Nature-oriented Lyrical Verse)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রসাহিত্যে গদ্যছন্দ বা মুক্তছন্দের বহুল ব্যবহারের জন্য পরিচিত। এসময়ের কবিতায় কবি প্রাত্যহিক জীবনের খুব সাধারণ দৃশ্য, প্রকৃতির নানা রূপ এবং বয়সের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘দেখা’ কবিতায় শ্রাবণের মেঘ ও রোদের লুকোচুরি এবং বৃষ্টির পসরা দেখার মধ্য দিয়ে জীবনের পার হয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে কবিতার ছন্দে অমর করে রাখার আনন্দ ও আকুতি প্রকাশিত হয়েছে।

দেখা – সম্পূর্ণ কবিতা

মোটা মোটা কালো মেঘ
ক্লান্ত পালোয়ানের দল যেন,
সমস্ত রাত বর্ষণের পর
আকাশের এক পাশে এসে জমল
ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে।
বাগানের দক্ষিণ সীমায় সেগুন গাছে
মঞ্জরীর ঢেউগুলোতে হঠাৎ পড়ল আলো,
চমকি উঠল বনের ছায়া।
শ্রাবণ মাসের রৌদ্র দেখা দিয়েছে
অনাহূত অতিথি,
হাসির কোলাহল উঠল
গাছে গাছে ডালে-পালায়।
রোদ-পোহানো ভাবনাগুলো
ভেসে ভেসে বেড়ালো মনের দূর গগনে।
বেলা গেল অকাজে।
বিকেলে হঠাৎ এল গুরু গুরু ধ্বনি,
কার যেন সংকেত।
এক মুহূর্তে মেঘের দল
বুক ফুলিয়ে হু হু করে ছুটে আসে
তাদের কোণ ছেড়ে।
বাঁধের জল হয়ে গেল কালো,
বটের তলায় নামল থম্‌থমে অন্ধকার।
দূর বনের পাতায় পাতায়
বেজে ওঠে ধারাপতনের ভূমিকা।
देखते দেখতে ঘনবৃষ্টিতে পাণ্ডুর হয়ে আসে
সমস্ত আকাশ,
মাঠ ভেসে যায় জলে।
বুড়ো বুড়ো গাছগুলো আলুথালু মাতামাতি করে
ছেলেমানুষের মতো;
ধৈর্য থাকে না তালের পাতায়, বাঁশের ডালে।
একটু পরেই পালা হল শেষ–
আকাশ নিকিয়ে গেল কে।
কৃষ্ণপক্ষের কৃশ চাঁদ যেন রোগশয্যা ছেড়ে
ক্লান্ত হাসি নিয়ে অঙ্গনে বাহির হয়ে এল।
মন বলে, এই আমার যত দেখার টুকরো
চাই নে হারাতে।
আমার সত্তর বছরের খেয়ায়
কত চল্‌তি মুহূর্ত উঠে বসেছিল,
তারা পার হয়ে গেছে অদৃশ্যে।
তার মধ্যে দুটি-একটি কুঁড়েমির দিনকে
পিچھے রেখে যাব
ছন্দে-গাঁথা কুঁড়েমির কারুকাজে,
তারা জানিয়ে দেবে আশ্চর্য কথাটি
একদিন আমি দেখেছিলেম এই সব-কিছু।

দেখা Romanized Version

Mota mota kalo megh
Klanto paloyaner dol jeno,
Shomosto rat borshoner por
Akasher ek pashe ese jomol
Ghesaghesi ko’re.
Baganer dokkhin simay segun gachhe
Monjorir deugulote hothat porlo alo,
Chomoke uthlo boner chhaya.
Shrabon maser roudro dekha diyechhe
Onahuto otithi,
Hashir kolahol uthlo
Gachhe gachhe dale-palay.
Rod-pohano bhavnagulo
Vese vese beralo moner dur gogone.
Bela gelo okaje.
Bikele hothat elo guru guru dhoni,
Kar jeno shongket.
Ek muhurte megher dol
Buk fuliye hu hu kore chhute ashe
Tader kon chhere.
Badher jol hoye gelo kalo,
Boter tolay namol thomthome ondhokar.
Dur boner patay patay
Beje othe dharapatoner vumika.
Dekhte dekhte ghonbrishtite pandur hoye ashe
Shomosto akash,
Math vese jay jole.
Buro buro gachhgulo aluthalu matamati kore
Chhelemanuser moto;
Dhoirjo thake na taler patay, basher dale.
Ektu porei pala holo shesh–
Akash nikiye গেল কে [nikiye gelo ke].
Krishnopokher krish chad jeno rogshejja chhere
Klanto hashi niye ongone bahir hoye elo.

Mon bole, ei amar joto dekhar tukro

Chai ne harate.

Amar sottor bochhorer kheyay

Koto cholti muhurto uthe bosechhilo,

Tara par hoye geche odrishye.

Tar modhye duti-ekti kuremir dinke

Pichhone rekhe jabo

Chhonde-gantha kuremir karukaze,

Tara janiye debe aschorjo kothati

Ekdin ami dekhechhem ei shob-kichhu.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য:
“মোটা মোটা কালো মেঘ / ক্লান্ত পালোয়ানের দল যেন, / সমস্ত রাত বর্ষণের পর / আকাশের এক পাশে এসে জমল / ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে।”
— শ্রাবণ মাসের মেঘ, রোদের লুকোচুরি, বনের ছায়া এবং হঠাৎ ঝেঁপে আসা বৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রকৃতির জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল রূপ নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
  • সময়ের বহমানতা ও স্মৃতি:
“আমার সত্তর বছরের খেয়ায় / কত চল্‌তি মুহূর্ত উঠে বসেছিল, / তারা পার হয়ে গেছে অদৃশ্যে।”
— কবির বয়স ও জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমার কথা এখানে ব্যক্ত হয়েছে। জীবনের অসংখ্য চলতি মুহূর্ত বা দিন জলের স্রোতের মতো অদৃশ্যে মিলিয়ে গেলেও কবি তার মধ্য থেকে কিছু টুকরো স্মৃতি বা অলস মুহূর্তকে ছন্দে ধরে রাখতে চেয়েছেন।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন