Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | শালিখ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পুনশ্চ |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক নিসর্গ-লিরিক (Psychological Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
শালিখটার কী হল তাই ভাবি।
একলা কেন থাকে দলছাড়া।
প্রথম দিন দেখেছিলেম শিমুল গাছের তলায়,
আমার বাগানে,
মনে হল একটু যেন খুঁড়িয়ে চলে।
তার পরে ওই রোজ সকালে দেখি–
সঙ্গীহারা, বেড়ায় পোকা শিকার ক’রে।
উঠে আসে আমার বারান্দায়–
নেচে নেচে করে সে পায়চারি,
আমার ‘পরে একটুকু নেই ভয়।
কেন এমন দশা।
সমাজের কোন্ শাসনে নির্বাসনের পালা,
দলের কোন্ অবিচারে
জাগল অভিমান।
কিছু দূরেই শালিখগুলো
করছে বকাবকি,
ঘাসে ঘাসে তাদের লাফালাফি,
উড়ে বেড়ায় শিরীষ গাছের ডালে ডালে–
ওর দেখি তো খেয়াল কিছুই নেই।
জীবনে ওর কোন্খানে যে গাঁঠ পড়েছে
সেই কথাটাই ভাবি।
সকালবেলার রোদে যেন সহজ মনে
আহার খুঁটে খুঁটে
ঝরে-পড়া পাতার উপর
লাফিয়ে বেড়ায় সারাবেলা।
কারো উপর নালিশ কিছু আছে
মনে হয় না একটুও তা।
বৈরাগ্যের গর্ব তো নেই ওর চলনে,
কিম্বা দুটো আগুন-জ্বলা চোখ।
কিন্তু ওকে দেখি নি তো সন্ধেবেলায়–
একলা যখন যায় বাসাতে ডালের কোণে,
ঝিল্লি যখন ঝিঁ ঝিঁ করে অন্ধকারে,
হাওয়ায় আসে বাঁশের পাতার ঝর্ঝরানি।
গাছের ফাঁকে তাকিয়ে থাকে
ঘুমভাঙানো
সঙ্গীবিহীন সন্ধ্যাতারা।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- দলছুট নিঃসঙ্গতা ও মানবিক কল্পনা:“সমাজের কোন্ শাসনে নির্বাসনের পালা, / দলের কোন্ অবিচারে / জাগল অভিমান। / কিছু দূরেই শালিখগুলো / করছে বকাবকি, / … ওর দেখি তো খেয়াল কিছুই নেই।”— একটি পাখির নির্জন আচরণে কবি মানবসমাজের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও বর্জনের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। মানুষের সমাজে যেমন নিয়মভাঙা বা শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিকে সমাজ একঘরে করে দেয়, এই পাখিটির ক্ষেত্রেও দলের কোনো অবিচার বা অভিমান কাজ করেছে কি না, কবি তা মমতাভরে ভেবেছেন।
- সহজ চলন ও নালিশহীন আত্মমর্যাদা:“কারো উপর নালিশ কিছু আছে / মনে হয় না একটুও তা। / বৈরাগ্যের গর্ব তো নেই ওর চলনে, / কিম্বা দুটো আগুন-জ্বলা চোখ।”— পাখিটির আচরণে কোনো উগ্র ক্রোধ, ক্ষোভ কিংবা অহংকারী ত্যাগের আড়ম্বর নেই। সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সকালের রোদে ঝরা পাতার ওপর আহার খুঁজে ফেরে। এই নালিশহীন নির্লিপ্ততাই তার নিঃসঙ্গতাকে এক শান্ত আত্মমর্যাদা দান করেছে।
- সন্ধ্যার অন্ধকার ও একাকী তারার প্রতীক:“কিন্তু ওকে দেখি নি তো সন্ধেবেলায়– / একলা যখন যায় বাসাতে ডালের কোণে, / … গাছের ফাঁকে তাকিয়ে থাকে / ঘুমভাঙানো / সঙ্গীবিহীন সন্ধ্যাতারা।”— দিনের কোলাহলে নিঃসঙ্গতাকে আড়াল করা গেলেও রাতের আঁধারে তা গভীর হয়। বাঁশপাতার ঝরঝরানি আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মাঝে ডালের কোণে একাকী আশ্রয় নেওয়া শালিখটির দিকে চেয়ে থাকে আকাশের একাকী সন্ধ্যাতারা। সৃষ্টির এই চিরন্তন নিঃসঙ্গতাকে এক সূত্রে গেঁথে কবিতাটি শেষ হয়।