মহুয়া কাব্যগ্রন্থের প্রত্যাশা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি আকুল, পেলব ও বিরহবিধুর রোমান্টিক লিরিক কবিতা হলো ‘প্রত্যাশা’। ঋতুচক্রের চিরন্তন আবর্তনে ফাল্গুনের পুষ্পিত উচ্ছ্বাস কীভাবে এক চির-অনাগত প্রেমাস্পদের জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা ও অমলিন জিজ্ঞাসায় রূপ নেয়, প্রাঙ্গণের শিরীষগাছের রূপকে এ কবিতায় তা অপরূপ গীতিময়তায় রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামপ্রত্যাশা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক ঋতু-বিরহের লিরিক কবিতা (Romantic Nature-Yearning Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির নবজাগরণকে মানুষের হৃদয়ের গভীর প্রেম ও আকুল প্রতীক্ষার সঙ্গে একাত্ম করেছেন। বসন্তের আগমনে প্রকৃতির প্রতিটি তরুশাখা যেমন নবকিশলয়ে ও ফুলে সেজে ওঠে এক অলৌকিক আনন্দের প্রত্যাশায়, মানবহৃদয়ও তেমনি অনন্তকালের পথ চেয়ে বসে থাকে প্রিয়তমের পদধ্বনির জন্য। কবি তাঁর গৃহপ্রাঙ্গণের শিরীষশাখাকে এই শাশ্বত প্রতীক্ষার জীবন্ত প্রতীক করেছেন। প্রতি বছর ফাল্গুন আসে, ফুল ফোটে, কিন্তু যার আসার কথা সে আসে না। অতীত, বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যতের ত্রিকালে বাঁধা এই একমুখী ব্যাকুলতাই কবিতাটির মূল মর্মবাণী।

সম্পূর্ণ কবিতা:

প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে

                  কী উচ্ছ্বাসে

       ক্লান্তিবিহীন ফুল-ফোটানোর খেলা।

            ক্ষান্তকূজন শান্ত বিজন সন্ধ্যাবেলা

প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরীষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি,

                  “এসেছে কি।’

আর বছরেই এমনি দিনেই ফাগুন মাসে

                  কী উল্লাসে

       নাচের মাতন লাগল শিরীষ-ডালে,

            স্বর্গপুরের কোন্‌ নূপুরের তালে।

প্রত্যহ সেই চঞ্চল প্রাণ শুধিয়েছিল, “শুনাও দেখি,

                  আসে নি কি।’

আবার কখন্‌ এমনি দিনেই ফাগুন মাসে

                  কী বিশ্বাসে

       ডালগুলি তার রইবে শ্রবণ পেতে

            অলখ জনের চরণশব্দে মেতে।

প্রত্যহ তার মর্মরস্বর বলবে আমায় দীর্ঘশ্বাসে,

                  “সে কি আসে।’

প্রশ্ন জানাই পুষ্পবিভোর ফাগুন মাসে

                  কী আশ্বাসে,

       হায় গো আমার ভাগ্যরাতের তারা,

            নিমেষগণন হয় না কি মোর সারা।

       প্রত্যহ বয় প্রাঙ্গণময় বনের বাতাস এলোমেলো,

                  “সে কি এল।’

 

Amar Rabindranath Logo

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Prangone mor shirish-shakhay Phagun mashe
Ki uchchhashe
Klantibihin phul-photanor khela.
Kkhantokujon shanto bijon shondhyabela
Prottaho shei phullo shirish proshno shudhay amay dekhi,
“Eshechhe ki.’
Ar bochhorei emni dinei Phagun mashe
Ki ullashe
Nacher maton laglo shirish-dale,
Sworgopurer kon nupurer tale.
Prottaho shei chonchol pran shudhiyechhilo, “Shunao dekhi,
Ashe ni ki.’
Abar kokhon emni dinei Phagun mashe
Ki bisshashe
Dalguli tar roibe shrobon pete
Olokh joner choronshobde mete.
Prottaho tar mormoroswor bolbe amay dirghosshashe,
“She ki ashe.’
Proshno janai pushpobibhor Phagun mashe
Ki ashwashe,
Hay go amar bhagyorater tara,
Nimeshgonon hoy na ki mor shara.
Prottaho boy prangonomoy boner batash elomelo,
“She ki elo.’

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রকৃতির পুষ্পোৎসব ও চিরন্তন জিজ্ঞাসা:
    “প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে / কী উচ্ছ্বাসে / ক্লান্তিবিহীন ফুল-ফোটানোর খেলা। / … প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরীষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি, / ‘এসেছে কি।'”
    — ফাল্গুনে শিরীষগাছের অফুরান ফুল ফোটানো কেবল প্রাকৃতিক শোভা নয়; তা প্রিয়তমকে অভ্যর্থনা জানানোর এক ব্যাকুল আয়োজন। শান্ত সন্ধ্যায় ক্লান্তিহীন ফুলগুলোর নীরব প্রশ্ন যেন কবির নিজেরই হৃদয়ের গোপন হাহাকার।
  • কালপ্রবাহে প্রতীক্ষার অবিচল ধারা:
    “আর বছরেই এমনি দিনেই ফাগুন মাসে … চঞ্চল প্রাণ শুধিয়েছিল, ‘শুনাও দেখি, আসে নি কি।’ / আবার কখন্‌ এমনি দিনেই ফাগুন মাসে / কী বিশ্বাসে / ডালগুলি তার রইবে শ্রবণ পেতে / অলখ জনের চরণশব্দে মেতে।”
    — গত বছরের “আসে নি কি” থেকে শুরু করে বর্তমানের “এসেছে কি” এবং ভবিষ্যতের “সে কি আসে”—প্রতীক্ষার এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে কাল পরিবর্তিত হলেও প্রিয়তমের জন্য হৃদয়ের তৃষ্ণা একবিন্দু মলিন হয় না। অদৃশ্য প্রেমিকের পদধ্বনি শোনার জন্য প্রকৃতি চিরকাল কান পেতে থাকে।
  • ভাগ্যতারার কাছে আকুল আর্তি:
    “হায় গো আমার ভাগ্যরাতের তারা, / নিমেষগণন হয় না কি মোর সারা। / প্রত্যহ বয় প্রাঙ্গণময় বনের বাতাস এলোমেলো, / ‘সে কি এল।'”
    — দীর্ঘ অপেক্ষার পল গুনতে গুনতে কবির জীবনপ্রহর ক্লান্ত। এলোমেলো দখিনা বাতাস এসে প্রাঙ্গণজুড়ে এক বিষাদময় আলোড়ন তোলে, আর রেখে যায় একটিমাত্র অসমাপ্ত প্রশ্ন—”সে কি এল।” এই অধরা প্রত্যাশাই প্রেমের শাশ্বত সৌন্দর্যকে মহিমান্বিত করেছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন