Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | কৃতজ্ঞ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক আত্মজৈবনিক লিরিক ও স্মৃতিচারণমূলক এলিজি (Reflective Romantic Elegy) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
বলেছিনু “ভুলিব না’ যবে তব ছলছল আঁখি
নীরবে চাহিল মুখে। ক্ষমা কোরো যদি ভুলে থাকি।
সে যে বহুদিন হল। সেদিনের চুম্বনের ‘পরে
কত নববসন্তের মাধবীমঞ্জরী থরে থরে
শুকায়ে পড়িয়া গেছে; মধ্যাহ্নের কপোতকাকলি
তারি ‘পরে ক্লান্ত ঘুম চাপা দিয়ে এল গেল চলি
কতদিন ফিরে ফিরে। তব কালো নয়নের দিঠি
মোর প্রাণে লিখেছিল প্রথম প্রেমের সেই চিঠি
লজ্জাভয়ে; তোমার সে হৃদয়ের স্বাক্ষরের ‘পরে
চঞ্চল আলোকছায়া কত কাল প্রহরে প্রহরে
বুলায়ে গিয়েছে তুলি, কত সন্ধ্যা দিয়ে গেছে এঁকে
তারি ‘পরে সোনার বিস্মৃতি, কত রাত্রি গেছে রেখে
অস্পষ্ট রেখার জালে আপনার স্বপনলিখন
তাহারে আচ্ছন্ন করি। প্রতিমুহূর্তটি প্রতিক্ষণ
বাঁকাচোরা নানা চিত্রে চিন্তাহীন বালকের প্রায়
আপনার স্মৃতিলিপি চিত্তপটে এঁকে এঁকে যায়,
লুপ্ত করি পরস্পরে বিস্মৃতির জাল দেয় বুনে।
সেদিনের ফাল্গুনের বাণী যদি আজি এ ফাল্গুনে
ভুলে থাকি, বেদনার দীপ হতে কখন নীরবে
অগ্নিশিখা নিবে গিয়ে থাকে যদি, ক্ষমা কোরো তবে।
তবু জানি, একদিন তুমি দেখা দিয়েছিলে বলে
গানের ফসল মোর এ জীবনে উঠেছিল ফলে,
আজও নাই শেষ; রবির আলোক হতে একদিন
ধ্বনিয়া তুলেছে তার মর্মবাণী, বাজায়েছে বীন
তোমার আঁখির আলো। তোমার পরশ নাহি আর,
কিন্তু কী পরশমণি রেখে গেছ অন্তরে আমার —
বিশ্বের অমৃতছবি আজিও তো দেখা দেয় মোরে
ক্ষণে ক্ষণে — অকারণ আনন্দের সুধাপাত্র ভ’রে
আমারে করায় পান। ক্ষমা কোরো যদি ভুলে থাকি।
তবু জানি একদিন তুমি মোরে নিয়েছিলে ডাকি
হৃদিমাঝে; আমি তাই আমার ভাগ্যেরে ক্ষমা করি —
যত দুঃখে যত শোকে দিন মোর দিয়েছে সে ভরি
সব ভুলে গিয়ে। পিপাসার জলপাত্র নিয়েছে সে
মুখ হতে, কতবার ছলনা করেছে হেসে হেসে,
ভেঙেছে বিশ্বাস, অকস্মাৎ ডুবায়েছে ভরা তরী
তীরের সম্মুখে নিয়ে এসে — সব তার ক্ষমা করি।
আজ তুমি আর নাই, দূর হতে গেছ তুমি দূরে,
বিধুর হয়েছে সন্ধ্যা মুছে-যাওয়া তোমার সিন্দুরে,
সঙ্গীহীন এ জীবন শূন্যঘরে হয়েছে শ্রীহীন,
সব মানি — সব চেয়ে মানি তুমি ছিলে একদিন।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বিস্মৃতির অনিবার্য জাল ও ক্ষমার প্রার্থনা:“সেদিনের চুম্বনের ‘পরে / কত নববসন্তের মাধবীমঞ্জরী থরে থরে / শুকায়ে পড়িয়া গেছে; … সেদিনের ফাল্গুনের বাণী যদি আজি এ ফাল্গুনে / ভুলে থাকি, … ক্ষমা কোরো তবে।”— কালস্রোতে স্মৃতি ক্রমশ ম্লান হয়। জীবনের বহু ঋতু ও অভিজ্ঞতার ভিড়ে প্রথম প্রেমের অক্ষরে আঁকা স্মৃতিলিপি অস্পষ্ট হয়ে আসে। এই অনিবার্য মানবিক দুর্বলতার জন্য কবি অপরাধবোধে কুণ্ঠিত না হয়ে প্রিয়ার কাছে বিনম্র ক্ষমা চেয়েছেন।
- পরশমণির দান ও সৃষ্টির প্রেরণা:“তবু জানি, একদিন তুমি দেখা দিয়েছিলে বলে / গানের ফসল মোর এ জীবনে উঠেছিল ফলে, / … তোমার পরশ নাহি আর, / কিন্তু কী পরশমণি রেখে গেছ অন্তরে আমার –“— শারীরিক সান্নিধ্য হারিয়ে গেলেও সেই প্রেম কবির আত্মায় রেখে গেছে এক অক্ষয় ‘পরশমণি’। তারই প্রেরণায় কবির কণ্ঠে সারা জীবন ধরে সুরের ধারা ও ‘গানের ফসল’ ফলেছে। সেই ভালোবাসার দৃষ্টিই কবিকে বিশ্বের মাঝে অকারণ আনন্দ ও অম্লান সুধার সন্ধান দিয়েছে।
- ভাগ্যের ক্ষমার্হতা ও চরম প্রাপ্তির স্বীকারোক্তি:“আমি তাই আমার ভাগ্যেরে ক্ষমা করি — / যত দুঃখে যত শোকে দিন মোর দিয়েছে সে ভরি / … সব মানি — সব চেয়ে মানি তুমি ছিলে একদিন।”— জীবন চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে, তৃষ্ণার পাত্র কেড়ে নিয়েছে, তীরের কাছে এসে তরী ডুবিয়েছে। কিন্তু নিয়তির এই সমস্ত আঘাত ও বঞ্চনাকে কবি হাসিমুখে ক্ষমা করে দেন এক অমোঘ সান্ত্বনায়—ভাগ্যের কাছে অন্য কোনো অভিযোগ নেই, কারণ একদা সে জীবনে পরম ভালোবাসার স্পর্শ এনে দিয়েছিল। শূন্য ঘরে নিঃসঙ্গ জীবনেও সবচেয়ে বড় সত্য এই যে, “তুমি ছিলে একদিন”।
![পূরবী কাব্যগ্রন্থের কৃতজ্ঞ কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 কৃতজ্ঞ kritogyo [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/কৃতজ্ঞ-kritogyo-কবিতা-.gif)