বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর, সুরময় ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘বিরহিণী’। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি জানলায় বসে থাকা এক বিরহিণী নারীর প্রতীক্ষা, কল্পনা এবং অনাগত ভবিষ্যতের এক স্বপ্নালু জগতের চমৎকার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বিরহিণী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও লিরিক কবিতা (Romantic and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক পরিণত ও সুরসমৃদ্ধ পর্বের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের নানা সূক্ষ্ম অনুভূতি, কল্পনা এবং মানবমনের রোমান্টিক আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘বিরহিণী’ কবিতায় কবি এমন এক নারীর কথা বলেছেন, যিনি দীর্ঘ তিন বছর ধরে জানলায় বসে উদাস নয়নে তাকিয়ে আছেন অজানার পানে। অতীত নয়, তাঁর সমস্ত মন মগ্ন ভাবীকালের স্বপ্ন ও প্রতীক্ষায়। কবিতার শেষাংশে কবি এক অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ মোচড় টেনেছেন, যা রবীন্দ্রকাব্যের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
বিরহিণী – সম্পূর্ণ কবিতা
তিন বছরের বিরহিণী জানলাখানি ধরে
কোন্ অলক্ষ্য তারার পানে তাকাও অমন করে।
অতীত কালের বোঝার তলায় আমরা চাপা থাকি,
ভাবী কালের প্রদোষ-আলোয় মগ্ন তোমার আঁখি।
তাই তোমার ওই কাঁদন-হাসির সবটা বুঝি না যে,
স্বপন দেখে অনাগত তোমার প্রাণের মাঝে।
কোন্ সাগরের তীর দেখেছ জানে না তো কেউ,
হাসির আভায় নাচে সে কোন্ সুদূর অশ্রু-ঢেউ।
সেখানে কোন্ রাজপুত্তুর চিরদিনের দেশে
তোমার লাগি সাজতে গেছে প্রতিদিনের বেশে।
সেখানে সে বাজায় বাঁশি রূপকথারই ছায়ে,
সেই রাগিণীর তালে তোমার নাচন লাগে গায়ে।
আপনি তুমি জানো না তো আছ কাহার আশায়,
অনামারে ডাক দিয়েছ চোখের নীরব ভাষায়।
হয়তো সে কোন্ সকালবেলা শিশির-ঝলা পথে
জাগরণের কেতন তুলে আসবে সোনার রথে,
কিম্বা পূর্ণ চাঁদের লগ্নে, বৃহস্পতির দশায়–
দুঃখ আমার, আর সে যে হোক, নয় সে দাদামশায়।
বিরহিণী Romanized Version
Tiner bochorer birohini janlakhani dhore
Kon olokkho tarar pane takao omon kore.
Otit kaler bojhar tolay amra chapa thaki,
Bhabi kaler prodosh-aloy mogno tomar ankhi.
Tai tomar oi kandon-hashir sobta bujhi na je,
Shopon dekhe onagoto tomar praner majhe.
Kon sagorer tir dekheche jane na to keu,
Hashir abhay nache se kon shudur oshru-dheu.
Sekhane kon rajputtur chirodiner deshe
Tomar lagi sajte geche protidiner beshe.
Sekhane se bajay bashi rupkothar-i chhaye,
Shei raginir tale tomar nachon lage gaye.
Apni tumi jano na to achho kahar ashay,
Onamare dak diyeche chokher nirob bhashay.
Hoyto se kon sokalbelay shishir-jhola pothe
Jagoroner keton tule ashibe shonar rothe,
Kimba purno chander logne, brihaspotir doshay–
Duhkho amar, ar se je hok, noy se dadamashay.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রতীক্ষা ও অনাগত ভবিষ্যৎ: বিরহিণী নারী অতীতকে পেছনে ফেলে ভাবীকালের আলোয় মগ্ন হয়ে আছেন। তাঁর জানলায় বসে থাকা এবং দূরের তারার পানে তাকিয়ে থাকার মাঝে লুকিয়ে আছে এক সুদূর প্রতীক্ষা।
- রূপকথার জগৎ ও কল্পনার রাজপুত্তুর: সেই নারী মনে মনে যে জগতের কল্পনা করেন, সেখানে কোনো রাজপুত্তুর রূপকথার ছায়ায় বাঁশি বাজায়, আর তাঁর তানে নারীর মনে নাচন লাগে। তিনি নিজেই জানেন না তিনি কার আশায় আছেন, কেবল চোখের নীরব ভাষায় অনামাকে ডেকে চলেছেন।
- “কিম্বা পূর্ণ চাঁদের লগ্নে, বৃহস্পতির দশায়– / দুঃখ আমার, আর সে যে হোক, নয় সে দাদামশায়।”— কবিতার শেষ চরণে কবি অত্যন্ত নাটকীয় ও হালকা চালের এক রসবোধ যুক্ত করেছেন। এতক্ষণ ধরে যে রাজপুত্তুর বা অনাগত ব্যক্তির আগমন নিয়ে রোমান্টিক জল্পনা চলছিল, কবি শেষ মুহূর্তে রসিকতা করে বলে ওঠেন যে সে যেই হোক না কেন, অন্তত দাদামশায় নয়! রবীন্দ্রকাব্যের গাম্ভীর্যের মাঝে এই ধরনের আকস্মিক ও কৌতুকপূর্ণ সমাপ্তি কবিতাটিকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।