আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

পূরবী কাব্যগ্রন্থের ‘স্বপ্ন’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর রোমান্টিক ও দর্শনমূলক কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’। এই কবিতায় জাগতিক বাস্তবতার চেয়ে স্বপ্ন বা কল্পনার জগতকে অধিকতর সত্য ও শাশ্বত বলে দাবি করা হয়েছে এবং বস্তুগত না-পাওয়ার বেদনাকে স্বপ্নের মাঝেই পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য
বিষয়বিবরণ
কবিতার নামস্বপ্ন
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপূরবী
প্রকাশের বছর১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপ্রেম, দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক গীতি-কবিতা (Romantic, Philosophical and Psychological Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯২৫ সালে রচিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের প্রেমের এক অনন্য দলিল, যেখানে তাঁর বিদেশভ্রমণের (বিশেষ করে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে সাক্ষাতের) গভীর প্রভাব রয়েছে। ‘স্বপ্ন’ কবিতায় কবি শারীরিক বা বাহ্যিক উপস্থিতির চেয়ে মানসিক বা আধ্যাত্মিক সংযোগকে বড় করে দেখেছেন। প্রিয় মানুষের বাহ্যিক রূপ সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় বা হারিয়ে যায়, কিন্তু মনের গভীরে স্বপ্নে যে রূপটি আঁকা থাকে, তা মৃত্যুঞ্জয়ী। তাই কবির কাছে জাগতিক পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার বেদনায় বোনা স্বপ্নই প্রকৃত সত্য, যা নশ্বর পৃথিবীতে অমরত্বের স্বাদ দেয়।

স্বপ্ন – সম্পূর্ণ কবিতা

তোমায় আমি দেখি নাকো, শুধু তোমার স্বপ্ন দেখি —

তুমি আমায় বারে বারে শুধাও, “ওগো, সত্য সে কি?’

কী জানি গো, হয়তো বুঝি

তোমার মাঝে কেবল খুঁজি

এই জনমের রূপের তলে আর-জনমের ভাবের স্মৃতি।

হয়তো হেরি তোমার চোখে

আদিযুগের ইন্দ্রলোকে

শিশুচাঁদের পথ-ভোলানো পারিজাতের ছায়াবীথি।

এই কূলেতে ডাকি যখন সাড়া যে দাও সেই ওপারে,

পরশ তোমার ছাড়িয়ে কায়া বাজে মায়ার বীণার তারে।

হয়তো হবে সত্য তাই,

হয়তো তোমার স্বপন, আমার আপন মনের মত্ততাই।

আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে।

যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে।

সেই তুমি আর নও তো বাঁধন,

স্বপ্নরূপে মুক্তিসাধন,

ফুলের সাথে তারার সাথে তোমার সাথে সেথায় মেলা।

নিত্যকালের  বিদেশিনী,

তোমায় চিনি, নাই বা চিনি,

তোমার লীলায় ঢেউ তুলে যায় কভু সোহাগ, কভু হেলা।

চিত্তে তোমার মূর্তি নিয়ে ভাবসাগরের খেয়ায় চড়ি।

বিধির মনের কল্পনারে আপন মনে নতুন গড়ি।

আমার কাছে সত্য তাই,

মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই।

আপনি তুমি দেখেছ কি আপন-মাঝে সত্য কী যে।

দিতে যদি চাও তা কারে, দিতে কি তাই পারো নিজে।

হয়তো তারে দুঃখদিনে

অগ্নি-আলোয় পাবে চিনে,

তখন তোমার নিবিড় বেদন নিবেদনের জ্বালবে শিখা।

অমৃত যে হয় নি মথন,

তাই তোমাতে এই অযতন;

তাই তোমারে ঘিরে আছে ছলন-ছায়ার কুহেলিকা।

নিত্যকালের আপন তোমায় লুকিয়ে বেড়ায় মিথ্যা সাজে,

ক্ষণে ক্ষণে ধরা পড়ে শুধু আমার স্বপন-মাঝে।

আমি জানি সত্য তাই —

মরণ-দুঃখে অমর জাগে, অমৃতেরই তত্ত্ব তাই।

পুষ্পমালার গ্রন্থিখানা অনাদরে পড়ুক ছিঁড়ে,

ফুরাক বেলা, জীর্ণ খেলা হারাক হেলাফেলার ভিড়ে।

ছল করে যা পিছু ডাকে

পিছন ফিরে চাস নে তাকে,

ডাকে না যে যাবার বেলায় যাস নে তাহার পিছে পিছে।

যাওয়া- আসা-পথের ধুলায়

চপল পায়ের চিহ্নগুলায়

গ’নে গ’নে আপন মনে কাটাস নে দিন মিছে মিছে।

কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা;

স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা।

নিত্য প্রাণের সত্য তাই —

প্রাণ দিয়ে তুই রচিস যারে, অসীম পথের পথ্য তাই।

 

Romanized Version

Tomay ami dekhi nako, shudhu tomar swopno dekhi —
Tumi amay bare bare shudhao, “Ogo, shotyo she ki?’
Ki jani go, hoyto bujhi
Tomar majhe kebol khunji
Ei jonomer ruper tole ar-jonomer bhaber smriti.
Hoyto heri tomar chokhe
Adijuger indroloke
Shishuchnander poth-bholano parijater chhayabithi.
Ei kulete daki jokhon shara je dao shei opare,
Porosh tomar chariye kaya baje mayar binar tare.
Hoyto hobe shotyo tai,

Hoyto tomar swopon, amar apon moner mottotai.

Ami boli swopno jaha tar cheye ki shotyo achhe.
Je tumi mor durer manush shei tumi mor kachher kachhe.
Shei tumi ar now to bnadhon,
Swopnorupe muktishadhon,
Phuler shathe tarar shathe tomar shathe shethay mela.
Nityokaler bideshini,
Tomay chini, nai ba chini,
Tomar lilay dheu tule jay kobhu shohag, kobhu hela.
Chitte tomar murti niye bhabshagorer kheyay chori.
Bidhir moner kolponare apon mone notun gori.
Amar kachhe shotyo tai,
Mon-bhorano paway bhora baire-pawar byarthotai.
Apni tumi dekhechho ki apon-majhe shotyo ki je.
Dite jodi chao ta kare, dite ki tai paro nije.
Hoyto tare dukkhodine
Ogni-aloy pabe chine,
Tokhon tomar nibir bedon nibedoner jwalbe shikha.
Omrito je hoy ni mothon,
Tai tomate ei ojoton;
Tai tomare ghire achhe chholon-chhayar kuhelika.
Nityokaler apon tomay lukiye beray mithya shaje,
Khone khone dhora pore shudhu amar swopon-majhe.
Ami jani shotyo tai —
Moron-dukkhe omor jage, omriteri tottwo tai.
Pushpomalar gronthikhana onadore poruk chhnire,
Phurak bela, jirno khela harak helaphelar bhire.
Chhol kore ja pichhu dake
Pichhon phire chash ne take,
Dake na je jabar belay jash ne tahar pichhe pichhe.
Jawa- asha-pother dhulay
Chopol payer chinhogulay
Go’ne go’ne apon mone katash ne din michhe michhe.
Ki hobe tor bozhai kore byartho diner aborjona;
Swopno shudhui morte omor, ar shokoli birombona.
Nityo praner shotyo tai —
Pran diye tui rochish jare, oshim pother pothyo tai.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
  • স্বপ্নের শ্বাশত সত্যতা:
    “আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে। / যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে।”
    — জাগতিক জীবনে যে মানুষটি ধরাছোঁয়ার বাইরে, স্বপ্নে সে-ই সবচেয়ে আপন ও কাছের। কবির কাছে বস্তুগত বাস্তবতার চেয়ে অন্তরের এই স্বপ্ন বা কল্পনাই হলো পরম সত্য। শারীরিক দূরত্ব এই স্বপ্নের কাছে হার মানে।
  • অরূপের সন্ধান ও প্রাপ্তির পূর্ণতা:
    “আমার কাছে সত্য তাই, / মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই।”
    — বাইরের পৃথিবীতে বা বাস্তব জীবনে প্রিয় মানুষকে পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে কবির কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ, সেই না-পাওয়ার শূন্যতাটুকু কবি আপন মনের মাধুরী দিয়ে পূরণ করে নিয়েছেন। বিধাতার সৃষ্টিকে তিনি নিজের কল্পনায় নতুন করে গড়েছেন।
  • মর্ত্যে অমরত্বের সাধনা:
    “কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা; / স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা।”
    — প্রতিদিনের জাগতিক জীবনের তুচ্ছ হিসাব-নিকাশ আর ব্যর্থ দিনের আবর্জনা বয়ে বেড়ানোর কোনো অর্থ নেই। পৃথিবীতে নশ্বর জিনিসের ভিড়ে মানুষের এই গভীর স্বপ্ন বা ভাবগত প্রেমই একমাত্র অমর। কবি তাই প্রাণ দিয়ে যাকে রচনা করেন, তাকেই অসীম পথের একমাত্র সম্বল বলে মনে করেছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও আপনার দেওয়া পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস অনুযায়ী উপস্থাপিত হয়েছে। (বি.দ্র. পাঠের সাবলীলতা ও প্রামাণ্য রূপ বজায় রাখতে আপনার প্রদত্ত শিরোনাম ও টেক্সটের ভেতরের ইংরেজি অংশ পরিহার করে মূল প্রামাণ্য রূপটি তুলে ধরা হয়েছে)।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত