বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, সুরময় ও জীবনমুখী লিরিক কবিতা হলো ‘অনন্ত জীবন’। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় মানবজীবনের ক্ষুদ্রতা ও নশ্বরতার মাঝেও মহাবিশ্বের অনন্ত প্রবাহ, স্মৃতি, গান এবং সৃষ্টির চিরন্তন ধারাবাহিকতার এক অপূর্ব রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অনন্ত জীবন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | প্রভাতসংগীত |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৩ (১২৮৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও মরমিবাদী লিরিক কবিতা (Philosophical and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৮৩ সালে প্রকাশিত ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক নতুন মোড় পরিবর্তনকারী ও আলোকোজ্জ্বল সৃষ্টি। এই কাব্যের রচনার মাধ্যমেই কবির মনের সমস্ত জড়তা কেটে গিয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক নতুন আনন্দ এসেছিল। ‘অনন্ত জীবন’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে আমাদের জীবন, ছোট ছোট সুখ-দুঃখের স্মৃতি বা দুদিনের গান যতই নশ্বর মনে হোক না কেন, প্রকৃতির বৃহৎ ও অনন্ত ধারায় তার কিছুই হারিয়ে যায় না। নদীর ক্ষুদ্র কণা যেমন তিল তিল করে মহাদেশ গড়ে তোলে, মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা ও গানও তেমনি এক অনন্ত জীবনের মহাসাগর রচনা করে।
অনন্ত জীবন – সম্পূর্ণ কবিতা
অধিক করি না আশা, কিসের বিষাদ,
জনমেছি দু দিনের তরে–
যাহা মনে আসে তাই আপনার মনে
গান গাই আনন্দের ভরে।
এ আমার গানগুলি দু দণ্ডের গান
রবে না রবে না চিরদিন–
পুরব-আকাশ হতে উঠিবে উচ্ছ্বাস,
পশ্চিমেতে হইবে বিলীন।
তোরা-ফুল, তোরা পাখি, তোরা খোলা প্রাণ,
জগতের আনন্দ যে তোরা,
জগতের বিষাদ-পাসরা।
পৃথিবীতে উঠিয়াছে আনন্দলহরী
তোরা তার একেকটি ঢেউ,
কখন উঠিলি আর কখন মিলালি
জানিতেও পারিল না কেউ।
নাই তোর নাই রে ভাবনা,
এ জগতে কিছুই মরে না।
নদীস্রোতে কোটি কোটি মৃত্তিকার কণা
ভেসে আসে, সাগরে মিশায়–
জান না কোথায় তারা যায়!
একেকটি কণা লয়ে গোপনে সাগর
রচিছে বিশাল মহাদেশ,
না জানি কবে তা হবে শেষ!
মুহূর্তেই ভেসে যায় আমাদের গান,
জান না তো কোথায় তা যায়!
আকাশের সাগরসীমায়!
আকাশ-সমুদ্র তলে গোপনে গোপনে
গীতরাজ্য হতেছে সৃজন,
যত গান উঠিতেছে ধরার আকাশে
সেইখানে করিছে গমন।
আকাশ পুরিয়া যাবে শেষ,
উঠিবে গানের মহাদেশ।
নাই তোর নাই রে ভাবনা
এ জগতে কিছুই মরে না।
কাল দেখেছিনু পথে হরষে খেলিতেছিল
দুটি ভাই গলাগলি করি
দেখেছিনু জানালায় নীরবে দাঁড়ায়েছিল
দুটি সখা হাতে হাতে ধরি
দেখেছিনু কচি মেয়ে মায়ের বাহুতে শুয়ে
ঘুমায়ে করিছে স্তনপান,
ঘুমন্ত মুখের ‘পরে বরষিছে স্নেহধারা
স্নেহমাখা নত দু’নয়ান
দেখেছিনু রাজপথে চলেছে বালক এক
বৃদ্ধ জনকের হাত ধরি–
কত কী যে দেখেছিনু, হয়তো সে-সব ছবি
আজ আমি গিয়েছি পাসরি।
তা বলে নাহি কি তাহা মনে?
ছবিগুলি মেশেনি জীবনে?
স্মৃতির কণিকা তারা স্মরণের তলে পশি
রচিতেছে জীবন আমার–
কোথা যে কে মিশাইল, কেবা গেল কার পাশে
চিনিতে পারি নে তাহা আর।
হয়তো অনেকদিন দেখেছিনু ছবি এক
দুটি প্রাণী বাহুর বাঁধনে
তাই আজ ছুটাছুটি এসেছি প্রভাতে উঠি
সখারে বাঁধিতে আলিঙ্গনে।
হয়তো অনেক দিন শুনেছিনু, পাখি এক
আনন্দে গাহিছে প্রাণ খুলি,
সহসা রে তাই আজ প্রভাতের মুখ দেখি
প্রাণ মন উঠিছে উথুলি।
সকলি মিশেছে আসি হেথা,
জীবনে কিছু না যায় ফেলা
এই যে যা-کیছু চেয়ে দেখি [যা-কিছু চেয়ে দেখি]
এ নহে কেবলি ছেলেখেলা।
এই জগতের মাঝে একটি সাগর আছে
নিস্তব্ধ তাহার জলরাশি,
চারিদিক হতে সেথা অবিরাম অবিশ্রাম
জীবনের স্রোত মিশে আসি।
সূর্য হতে ঝরে ধারা, চন্দ্র হতে ঝরে ধারা,
কোটি কোটি তারা হতে ঝরে,
জগতের যত হাসি যত গান যত প্রাণ
ভেসে আসে সেই স্রোতোভরে–
মেশে আসি সেই সিন্ধু-‘পরে।
পৃথ্বী হতে মহাস্রোত ছুটিতেছে অবিরাম
সেই মহাসাগর-উদ্দেশে,
আমরা মাটির কণা জলস্রোত ঘোলা করি
অবিশ্রাম চলিয়াছি ভেসে–
সাগরে পড়িব অবশেষে।
জগতের মাঝখানে সেই সাগরের তলে
রচিত হতেছে পলে পলে
অনন্ত-জীবন মহাদেশ,
কে জানে হবে কি তাহা শেষ!
তাই বলি, প্রাণ ওরে, গান গা পাখির মতো,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ শোক ভুলি–
তুই যাবি, গান যাবে, একসাথে ভেসে যাবে
তুই আর তোর গানগুলি।
মিশিবি সে সিন্ধুজলে অনন্তসাগরতলে,
একসাথে শুয়ে রবি প্রাণ,
তুই আর তোর এই গান।
অনন্ত জীবন Romanized Version
Odhik kori na asha, kiser bishad,
Jonomechhi du diner tore–
Jaha mone ashe tai aponar mone
Gan gai anander bhore.
E amar ganguli du dondoner gan
Robe na robe na chirodin–
Purob-akash hote uthibo [uthibe] uchchhhash,
Pochhime-to hoibe bilino [bilin].
Tora-ful, tora pakhi, tora khola pran,
Jogoter anondo je tora,
Jogoter bishad-pasra.
Prithibite uthiache anondo-lohori
Tora tar ekekti dheu,
Kokhon uthili ar kokhon milali
Janite-o parilo na keu.
Nai tor nai re bhabona,
E jogote kichhui more na.
Nodi-srote koti koti mrittikar kona
Bhese ashe, sagore mishay–
Jan na kothay tara jay!
Ekekti kona loye gopone sagor
Rochiche bishal mohadesh,
Na jani kobe ta hobe shesh!
Muhurte-i bhese jay amader gan,
Jan na to kothay ta jay!
Akasher sagor-simay!
Akash-somudro tole gopone gopone
Gito-rajjo hoteche srijon,
Joto gan uthiteche dhorar akashe
Seikhane koriche gomon.
Akash puriya jabe shesh,
Uthibe ganer mohadesh.
Nai tor nai re bhabona
E jogote kichhui more na.
Kal dekhechinu pothe horoshe khelitechhi
Duti bhai golagoli kori
Dekhechinu janalay nirobe darayechhilo
Duti sokha hate hate dhori
Dekhechinu kochimeye mayer bahute shuye
Ghuma-ye koriche ston-pan,
Ghumonto mukher ‘ore [‘pore] boroshiche sneho-dhara
Snehamakha noto du’noyan
Dekhechinu rajpothe choleche balok ek
Briddho jonoker hat dhori–
Koto ki je dekhechinu, hoyto se-shob chhobi
Aj ami giyechhi pashori.
Ta bole nahi ki taha mone?
Chhobiguli mesheni jibone?
Sritir konika tara smoroner tole poshi
Rochitechhe jibon amar–
Kotha je ke mishailo, keba gelo kar pashe
Chinite pari ne taha ar.
Hoyto onekdin dekhechinu chhobi ek
Duti prani bahur bandhane
Tai ashi [tai aj] chutachuti eshechhi probhate uthi
Sokhare bandhite alingone.
Hoyto onek din shunechinu, pakhi ek
Anonde gahiache pran khuli,
Shohasa re tai aj probhater mukh dekhi
Pran mon uthiteche uthuli.
Sokoli misheche ashi hetha,
Jibone kichhu na jay fela
Ei je ja-kichhu cheye dekhi
E nohe kebuli chele-khela.
Ei jogoter majhe ekti sagor ache
Nistobdho tahar jolrashi,
Charidik hote setha obiram obishram
Jiboner srot mishe ashi.
Surjo hote jhore dhara, chandro hote jhore dhara,
Koti koti tara hote jhore,
Jogoter joto hashi joto gan joto pran
Bhese ashe shei srotobhore–
Meshe ashi shei shindhu-‘pore.
Prithbi hote mohasrot chutitechhe obiram
Sei mohashagor-uddeshe,
Amra matir kona jol-srot ghola kori
Obishram cholechhi bhese–
Sagore poribo obosheshe.
Jogoter majhane shei sagorer tole
Rochito hoteche pole pole
Ononto-jibon mohadesh,
Ke jane hobe ki taha shesh!
Tai boli, pran ore, gan ga pakhira moto [pakhi moto],
Khudro khudro dukkho shok bhuli–
Tui jabi, gan jabe, ekshathe bhese jabe
Tui ar tor ganguli.
Mishibi se shindhu-jole ononto-sagor-tole,
Ekshathe shuye robi pran,
Tui ar tor ei gan.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ক্ষুদ্র জীবনের আনন্দ ও সার্থকতা: কবি মনে করেন মানুষ দুদিনের জন্য পৃথিবীতে এসেছে, তাই অতিরিক্ত আশা বা বিষাদ না রেখে আনন্দের ভরে গান গাওয়া উচিত। আমাদের জীবন বা গান ক্ষণস্থায়ী হলেও তার আবেদন ফুরিয়ে যায় না।
- প্রকৃতিতে কিছুই হারিয়ে যায় না: নদীর জলের ক্ষুদ্র কণা যেমন সাগরে মিশে বিশাল মহাদেশ রচনা করে, তেমনি মানুষের জীবনের ছোট ছোট স্মৃতি, গান এবং অভিজ্ঞতাগুলোও মহাবিশ্বের অদৃশ্য ভান্ডারে জমা হয়ে অনন্ত জীবন গড়ে তোলে।
- স্মৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য যোগ: পথে চলতে গিয়ে দেখা দুই ভাইয়ের খেলা, মায়ের কোলে শিশুর স্তনপান কিংবা বৃদ্ধ পিতার হাত ধরে বালকের পথচলা—এই সাধারণ দৃশ্যগুলো মানুষের মনে কেবল ছবি হয়ে ভাসে না, বরং স্মৃতির কণিকা হিসেবে মানুষের জীবন ও সত্তাকে নির্মাণ করে।
- অনন্ত মহাসাগরে লয়: জীবনের সমস্ত সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না ও গান শেষ পর্যন্ত এক অবিরাম স্রোতে সেই নিস্তব্ধ মহাসাগরে গিয়ে মিশে যায়। তাই মৃত্যুকে ভয় না পেয়ে পাখির মতো গান গেয়ে জীবনকে উপভোগ করার শাশ্বত বাণী এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (প্রভাতসংগীত কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের অনন্ত জীবন কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 অনন্ত জীবন ananta jeeban [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অনন্ত-জীবন-ananta-jeeban-কবিতা-.gif)