প্রভাত সংগীত কাব্যগ্রন্থের অনন্ত মরণ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক ও মরমিবাদী কবিতা হলো ‘অনন্ত মরণ’। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি জীবন ও মৃত্যুর গতানুগতিক ধারণাকে উল্টে দিয়ে দেখিয়েছেন যে মৃত্যু কোনো শেষ বা ভয়ংকর শূন্যতা নয়, বরং তা জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অনন্ত প্রাণের প্রসারের এক মহোৎসব।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅনন্ত মরণ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপ্রভাতসংগীত
প্রকাশের বছর১৮৮৩ (১২৮৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও মরমিবাদী লিরিক কবিতা (Philosophical and Mystical Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৮৩ সালে প্রকাশিত ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক বড় মোড় পরিবর্তনকারী সৃষ্টি। এই কাব্য রচনার মাধ্যমেই কবির ভেতরের সমস্ত জড়তা ও অন্ধকার কেটে গিয়ে এক নতুন আলোর উন্মেষ ঘটেছিল। ‘অনন্ত মরণ’ কবিতায় কবি মৃত্যুকে কোনো ভীতিকর সমাপ্তি হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, প্রতি পলকে পুরনো রূপের মৃত্যু এবং নতুন রূপের জন্ম—এই নিয়েই অনন্ত জীবন। মৃত্যুকে ভয় না করে তাকে প্রাণের পরিপূরক ও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক বাণী এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।

অনন্ত মরণ – সম্পূর্ণ কবিতা

কোটি কোটি ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে
বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে,
হাসে খেলে মৃত্যু চারিপাশে।
এ ধরণী মরণের পথ,
এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ।
যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল’ প্রাণ?
সে তো শুধু, পলক, নিমেষ।
অতীতের মৃত ভার পৃষ্ঠেতে রয়েছে তার,
না জানি কোথায় তার শেষ।
যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি,
মরিতেছি প্রতি পলে পলে,
জীবন্ত মরণ মোরা মরণের ঘরে থাকি
জানি নে মরণ কারে বলে।
একমুঠা মরণেরে জীবন বলে কি তবে,
মরণের সমষ্টি কেবল?
একটি নিমেষ তুচ্ছ শত মরণের গুচ্ছ,
নাম নিয়ে এত কোলাহল।
মরণ বাড়িবে যত জীবন বাড়িবে তত,
পলে পলে উঠিব আকাশে
নক্ষত্রের কিরণনিবাসে।
মরণ বাড়িবে যত কোথায় কোথায় যাব,
বাড়িবে প্রাণের অধিকার–
বিশাল প্রাণের মাঝে কত গ্রহ কত তারা
হেথা হোথা করিবে বিহার ।
উঠিবে জীবন মোর কত-না আকাশ ছেয়ে,
ঢাকিয়া ফেলিবে রবি শশী–
যুগ-যুগান্তর যাবে, নব নব রাজ্য পাবে
নব নব তারায় প্রবেশি।
কবে রে আসিবে সেই দিন
উঠিব সে আকাশের পথে,
আমার মরণ-ডোর দিয়ে
বেঁধে দেব জগতে জগতে।
আমাদের মরণের জালে
জগৎ ফেলিব আবরিয়া,
এ অনন্ত আকাশসাগরে
দশ দিক রহিব ঘেরিয়া।
জয় হোক জয় হোক মরণের জয় হোক–
আমাদের অনন্ত মরণ,
মরণের হবে না মরণ।
এ ধরায় মোরা সবে শতাব্দীর ক্ষুদ্র শিশু
লইলাম তোমার শরণ,
এসো তুমি এসো কাছে, স্নেহ-কোলে লও তুমি,
পিয়াও তোমার মাতৃস্তন,
আমাদের করো হে পালন।
আনন্দে পুরেছে প্রাণ, হেরিতেছি এ জগতে
মরণের অনন্ত উৎসব।
কার নিমন্ত্রণে মোরা মহাযজ্ঞে এসেছি রে,
উঠেছে বিপুল কলরব।
যে ডাকিছে ভালোবেসে, তারে চিনিস নে শিশু?
তার কাছে কেন তোর ডর?
জীবন যাহারে বলে মরণ তাহারি নাম,
মরণ তো নহে তোর পর।
আয়, তারে অলিঙ্গন কর্‌–

আয় তার হাতখানি ধর্‌।

অনন্ত মরণ Romanized Version

Koti koti chhoto chhoto moronere loye
Boshundhara chhuteche akashe,
Hashe khele mrittu charipashe.
E dhoroni moroner poth,
E jogot mrittur jogot.
Jototuku bortoman, tarei ki bol’ pran?
Se to shudhu, polok, nimesh.
Otit-er mrito bhar prishte-te royeche tar,
Na jani kothay tar shesh.
Joto borsho beche achhi toto borsho more gechi,
Moritechhi proti pole pole,
Jibonto moron mora moroner ghore thaki
Jani ne moron kare bole.
Ek-mutha moronere jibon bole ki tobe,
Moroner shomoshti kebol?
Ekti nimesh tuchchho soto moroner guchchho,
Nam niye eto kolahol.
Moron baribe joto jibon baribe toto,
Pole pole uthibo akashe
Nokkhotrer kiron-nibashe.
Moron baribe joto kothay kothay jabo,
Baribe praner odhikar–
Bishal praner majhe koto groho koto tara
Hetha hotha koribe bihar.
Uthibo jibon mor koto-na akash cheye,
Dhakiya feli-be robi shoshi–
Yugo-yugantor jabe, nobo nobo rajjo pabe
Nobo nobo taray probeshi.
Kobe re ashibe shei din
Uthibo se akasher pothe,
Amar moron-dor diye
Bendhe debo jogote jogote.
Amader moroner jale
Jogot felibo aboriya,
E ononto akash-sagore
Dosh dik rohibo gheriya.
Joy hok joy hok moroner joy hok–
Amader ononto moron,
Moroner hobe na moron.
E dhoray mora shobe shotabdir khudro shishu
Loilam tomar shoron,
Eso tumi eso kache, sneho-kole lao tumi,
Piyao tomar matrinston,
Amader koro he palon.
Anonde pureche pran, heritechhi e jogote
Moroner ononto utshob.
Kar nimontrone mora mohajogje eshechi re,
Utheche bipul kolorob.
Je dakiche bhalobese, tare chinis ne shishu?
Tar kache keno tor dor?
Jibon jahare bole moron tahari nam,
Moron to nohe tor por.
Ay, tare alingon kor–

Ay tar hatkhani dhor–

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রতি পলে মৃত্যুর উপস্থিতি:
“যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি, / মরিতেছি প্রতি পলে পলে, / জীবন্ত মরণ মোরা মরণের ঘরে থাকি / জানি নে মরণ কারে বলে।”
— মানুষ কেবল মৃত্যুর সময় মারা যায় না, বরং প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পলকে সে অতীতের মৃত্যুকে বহন করে বেঁচে থাকে। জীবন ও মরণ এখানে একই সূত্রে গাঁথা।
  • মরণের মধ্য দিয়ে প্রাণের বিশালতা:
“মরণ বাড়িবে যত জীবন বাড়িবে তত, / পলে পলে উঠিব আকাশে / নক্ষত্রের কিরণনিবাসে।”
— মৃত্যুর মধ্য দিয়েই প্রাণের সংকোচন ঘুচে যায় এবং তা মহাকাশ ও নক্ষত্রলোকে ছড়িয়ে পড়ে। মরণ বাড়লে প্রাণের অধিকারও বিশাল আকার ধারণ করে।
  • মৃত্যুকে বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন:
“জীবন যাহারে বলে মরণ তাহারি নাম, / মরণ তো নহে তোর পর। / আয়, তাই অলিঙ্গন কর্‌– / আয় তার হাতখানি ধর্‌।”
— কবিতার এই সমাপ্তি অংশটি অত্যন্ত গভীর। মৃত্যু কোনো ভয়ের বস্তু বা পর নয়, সে আমাদের আপন। তাই ভয়ের সমস্ত মোহ কাটিয়ে মৃত্যুকে ভালোবেসে আলিঙ্গন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন