বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম জীবনের কাব্যগ্রন্থ ‘শেষলেখা’র একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক ও মৃত্যুচেতনাভিত্তিক কবিতা হলো ‘রাহুর মতন মৃত্যু’। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়, যেখানে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর অবিনশ্বর জীবনবোধ, প্রেম এবং মৃত্যুর আপেক্ষিকতা অত্যন্ত তেজদীপ্ত ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | রাহুর মতন মৃত্যু |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষলেখা |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪১ (মৃতোত্তর প্রকাশিত) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও অন্তিম পর্যায়ের কবিতা (Philosophical and Final-phase Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘শেষলেখা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে রচিত কবিতার সংকলন। শারীরিক অসুস্থতা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কবির মন ছিল সৃষ্টিশীল, নির্ভীক এবং জীবনরসে পূর্ণ। ‘রাহুর মতন মৃত্যু’ কবিতায় কবি মৃত্যুকে কোনো পরম সত্য বা সর্বগ্রাসী মহাশূন্য হিসেবে স্বীকার করেননি। পুরাণ অনুযায়ী রাহু যেমন চাঁদকে গ্রাস করতে পারে না, কেবল সাময়িক ছায়া ফেলে, তেমনি মৃত্যুও জীবনের অমৃতকে গ্রাস করতে পারে না—এই অটল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসই এই কবিতার মূল সুর।
রাহুর মতন মৃত্যু – সম্পূর্ণ কবিতা
রাহুর মতন মৃত্যু
শুধু ফেলে ছায়া,
পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত
জড়ের কবলে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
প্রেমের অসীম মূল্য
সম্পূর্ণ বঞ্চনা করি লবে
হেন দস্যু নাই গুপ্ত
নিখিলের গুহা-গহ্বরেতে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সবচেয়ে সত্য ক’রে পেয়েছিনু যারে
সবচেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি,
অস্তিত্বের এ কলঙ্ক কভু
সহিত না বিশ্বের বিধান
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সব-কিছু চলিয়াছে নিরন্তর পরিবর্তবেগে
সেই তো কালের ধর্ম।
মৃত্যু দেখা দেয় এসে একান্তই অপরিবর্তনে,
এ বিশ্বে তাই সে সত্য নহে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
বিশ্বেরে যে জেনেছিল আছে ব’লে
সেই তার আমি
অস্তিত্বের সাক্ষী সেই,
পরম আমির সত্যে সত্য তার
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
রাহুর মতন মৃত্যু Romanized Version
Rahur moton mrityu
Shudhu fele chhaya,
Pare na korite grash jiboner shorgoiyo amrito
Jorer kobole
E kotha nishchit mone jani.
Premer oshimo muljo
Shompunno bonchona kori lobe
Heno doshyu nai gupto
Nikhiler guha-gohborete
E kotha nishchit mone jani.
Shobcheye sotyo kore peyechinu jare
Shobcheye mithya chhilo tari majhe chhodmobesh dhori,
Ostitver e kolonko kobhu
Shohito na bishwer bidhan
E kotha nishchit mone jani.
Shob-kichu chaliache nirontor poriborto-bege
Shei to kaler dhormo.
Mrittu dekha dey eshe ekantoi oporibortone,
E bishwe tai se sotyo nohe
E kotha nishchit mone jani.
Bishwere je jenechhilo ache bo’le
Sei tar ami
Ostitver shakkhi shei,
Porom amir sotye sotyo tar
E kotha nishchit mone jani.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রাহুর ছায়া ও জীবনের অমৃত:
“রাহুর মতন মৃত্যু / শুধু ফেলে ছায়া, /পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত…”— রাহু যেমন সূর্য বা চাঁদকে গ্রাস করতে গিয়ে কেবল সাময়িক আড়াল বা ছায়া ফেলে, মৃত্যুকেও কবি তেমনই বলেছেন। মৃত্যু জীবনের অস্তিত্ব বা তার স্বর্গীয় অমৃতকে চিরতরে মুছে ফেলতে পারে না।
- কালের পরিবর্তন ও মৃত্যুর অপরিবর্তন:
“সব-কিছু চলিয়াছে নিরন্তর পরিবর্তবেগে / সেই তো কালের ধর্ম। / মৃত্যু দেখা দেয় এসে একান্তই অপরিবর্তনে…”— মহাবিশ্বের নিয়ম হলো নিরন্তর পরিবর্তনশীলতা (যা কালের ধর্ম)। কিন্তু মৃত্যু হলো অপরিবর্তনশীল ও স্থবির, তাই পরিবর্তনশীল এই জীবন্ত বিশ্বে মৃত্যু কখনো পরম সত্য হতে পারে না।
- অস্তিত্বের সাক্ষী ও পরম আমি: কবিতার শেষাংশে কবি ঘোষণা করেন যে, এই বিশ্বকে যারা উপলব্ধি করেছে এবং যার অস্তিত্বের সাক্ষী এই ‘আমি’, সেই পরম আমির সত্যতাই চূড়ান্ত। মৃত্যু তার চেয়ে বড় কিছু নয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষলেখা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।