শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থের সমুখে শান্তিপারাবার কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণচেতনার এক পরম শান্ত, সমাহিত ও অমর প্রার্থনা-কবিতা হলো ‘সমুখে শান্তিপারাবার’। জীবনের ওপারে অপেক্ষমাণ অনন্ত শান্তির সমুদ্রে তরণী ভাসানোর আহ্বানে মৃত্যুভয় জয় করে পরমসত্তার কোলে চিরযাত্রার নির্ভরতা এ কবিতায় এক অপার্থিব রূপ পেয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামসমুখে শান্তিপারাবার
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ লেখা
প্রকাশের বছর১৯৪১ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনপারলৌকিক প্রার্থনা ও মহাপ্রয়াণের লিরিক (Elegy / Mystic Departure Hymn)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৪১ সালে কবির মহাপ্রয়াণের পর প্রকাশিত মরণোত্তর কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ লেখা’-র অন্তর্গত এই অমর কবিতাটি রচিত হয়েছিল মূলত কবির জীবদ্দশাতেই (১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে, ‘ডাকঘর’ নাটকের অমল চরিত্রের স্মৃতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এবং পরবর্তীতে কবির অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মহাপ্রয়াণের পর এই গানটি গীত হয়)। এখানে মৃত্যুকে কোনো ভয়ংকর সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়নি; মৃত্যু এক পরম শান্তিসমুদ্র বা ‘শান্তিপারাবার’। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া ও কোলাহল অবসানে জীবাত্মা আহ্বান জানায় পরম কর্ণধারকে—যাতে তিনি এই যাত্রায় তরণী ভাসিয়ে দেন এবং কোল পেতে পথিককে গ্রহণ করেন। পার্থিব নশ্বর বন্ধন ক্ষয় হয়ে যাওয়া এবং অসীমের ধ্রুবতারার আলোয় ‘মহা অজানা’র সঙ্গে নির্ভীক আত্মিক পরিচয়ে বিলীন হয়ে যাওয়াই এই সৃষ্টির মূল সুর।

সম্পূর্ণ কবিতা:

সমুখে শান্তিপারাবার,
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।
তুমি হবে চিরসাথি,
লও লও হে ক্রোড় পাতি,
অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার।
মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা তোমার দয়া
হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার।
হয় যেন মর্ত্যের বন্ধন ক্ষয়,
বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়,
পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয়
মহা অজানার।
Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Shomukhe shantiparabar,
Bhashao toroni he kornodhar.
Tumi hobe chirosathi,
Low low he kror pati,
Oshimer pothe jwolibe jyoti dhrubotarokar.
Muktidata, tomar khoma tomar doya
Hobe chiropatheyo chirojatrar.
Hoy jeno mortter bondhon khoy,
Birat bisho bahu meli loy,
Pay ontore nirbhoy porichoy
Moha ojanar.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • শান্তির সাগরে অন্তিম তরণী:
    “সমুখে শান্তিপারাবার, / ভাসাও তরণী হে কর্ণধার। / তুমি হবে চিরসাথি, / লও লও হে ক্রোড় পাতি,”
    — সংসারসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে আত্মার সামনে এখন উন্মুক্ত এক অসীম শান্তিসিন্ধু। এই যাত্রার কাণ্ডারি কোনো মানব নয়, স্বয়ং ঈশ্বর বা পরমচৈতন্য। কোনো দ্বিধা বা শঙ্কা না রেখে কবি তাঁর চরণে নিজেকে নিঃশেষে সমর্পণ করেছেন।
  • অনন্তের পথে পাথেয়:
    “অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার। / মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা তোমার দয়া / হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার।”
    — অনন্তের দীর্ঘ যাত্রাপথে পথ দেখাবে সত্যের ধ্রুবতারা। আর সেই পরপারের যাত্রায় পার্থিব কোনো ধন-দৌলত নয়, একমাত্র সঞ্চয় ও সম্বল হবে পরমপিতার ক্ষমা ও করুণা।
  • বন্ধনক্ষয় ও মহা অজানাকে আলিঙ্গন:
    “হয় যেন মর্ত্যের বন্ধন ক্ষয়, / বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়, / পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয় / মহা অজানার।”
    — জীবনের সমস্ত পার্থিব মায়া ও বন্ধনের অবসান কামনায় এই সমাপ্তি। বিশ্বপ্রকৃতি যেন তার পরম স্নেহের বাহু বাড়িয়ে এই ক্লান্ত আত্মাকে আপন করে নেয়। মৃত্যু কোনো অন্ধকারের রূপ নয়, বরং ভয়হীন চিত্তে ‘মহা অজানা’র অনন্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে পরম আত্মীয়তার যোগসূত্র।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন